সরাসরি পরীক্ষার মাধ্যমে ফলাফল এসেছে এমন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাগুলোর মধ্যে এবারের ফল আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
করোনাভাইরাসের মহামারী ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষা নিতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত যে মূল্যায়ন ফল ঘোষণা করা হয়েছিল, তাতে ফেল করেনি কেউ।
ওই ফলাফল বাদ দিলে বাংলাদেশে আগে কখনো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ৯৫ শতাংশ ছাড়ায়নি।
২০২১ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, এটাও রেকর্ড।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে ভালো ফল করেছে এইচএসসি ও সমমানের শিক্ষার্থীরা। তবে তা দ্বাদশ শ্রেণি পেরুনো ১৩ লাখ ৬ হাজার ৭১৮ জন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের জন্য কতটা ভালো হল- তা নিয়ে সংশয় আছে বিশেষজ্ঞদের।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং সব বিষয়ের পরীক্ষা না হওয়ার বিষয়টি এবার ‘ভালো’ ফলাফল পেতে ভূমিকা রেখেছে। তবে সেজন্য এই শিক্ষার্থীদের স্নাতক পর্যায়ে গিয়ে ভুগতে হতে পারে।
শিখন ঘাটতি নিয়ে পরীক্ষা দিয়েও ‘বেশ ভাল’ ফল
কোভিড মহামারীর কারণে ২০২০ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে পরীক্ষা না নিয়ে ‘অটোপাস’ দিলেও এবার সরাসরি মূল্যায়ন করেই শিক্ষার্থীদের পরের ধাপে পাঠাতে চেয়েছে সরকার।
সে কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার অপেক্ষায় চলে যায় আট মাস। স্বাভাবিক সময়ের এপ্রিলের এই পরীক্ষা এবার শুরু হয় গত ২ ডিসেম্বর।
তবে মহামারীর কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ছিল নড়েবড়ে।
একাদশ ও দ্বাদশের বড় সময় জুড়ে তাদের পড়তে হয়েছে অনলাইনে, যে মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থীই শিখন কার্যক্রমের বাইরে ছিল বলে বিভিন্ন জরিপে এসেছে।
গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর তারা ক্লাসে যাওয়ার সুযোগ পায় আড়াই মাসের কম সময়। পড়ালেখার ঘাটতির কথা বিবেচনায় নিয়ে সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করে আনা হয়।
সেই সিলেবাসে গ্রুপভিত্তিক তিনটি নৈর্বাচনিক বিষয়ে ছয়টি পত্রে এইচএসসি পরীক্ষা হয় এবার; সময় কমিয়ে আনা হয় দেড় ঘণ্টায়।
বাংলা ও ইংরেজির মতো আবশ্যিক বিষয়গুলোর পরীক্ষা এবার নেওয়া হয়নি। তার বদলে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে সেসব বিষয়ের মূল্যায়ন করে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল তৈরি করা হয়েছে।
রোববার প্রকাশিত সেই ফলাফল দেখা যায়, পাসের হার ৯৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষার্থী।
গত বছরের পরীক্ষাহীন শতভাগ পাসের হিসাব বাদ দিলে গত ১০ বছরে সর্বোচ্চ পাসের হার ছিল ২০১২ সালে, ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ। আর এর আগে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬১ হাজার ৮০৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল গত বছর।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম মনে করেন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হলেও ভালো ফল করায় শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় ‘উদ্দীপনা’ আসবে।
“যারা মেধাবী, তারা ঠিকই ভালো ফলাফল করেছে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেবে, তারা জানে পরীক্ষায় কী ধরনের প্রশ্ন আসবে। যারা পড়ালেখার মধ্যে রয়েছে, তারা এগিয়েই যাবে। তাদের কোনো সমস্যা হবে না।”
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুনও মনে করেন, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে তিনটি বিষয়ের দুটি করে পত্রের পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করেছে।
এই মূল্যায়নকে ‘মন্দের ভাল’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “অটোপাস না দিয়ে এটা করাতে শিক্ষার্থীদের ভালো হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি ফলাফলের প্রতিফলন হয়নি।”
২০২০ সালের এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা যে এবার ভর্তি পরীক্ষায় সমস্যায় পড়েছিল, সে কথা তুলে ধরেন সাবেক এই শিক্ষক।
তিনি বলেন, “গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে অনেক আশা নিয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল, কিন্তু কোথাও চান্স পায়নি- এমন অনেকে আছে। এবারও হয়ত সেটা হবে। এই ফলাফল সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে না।
“শিক্ষার্থীরা তাদের ফলাফলের ভিত্তিতে যে আশাটা নিয়ে যাবে, সেটা তখন থমকে যাবে। আমি বলব, যেটাই হয়েছে, তাদের এখন ভালো করে পড়তে হবে ভর্তি পরীক্ষার জন্য।”
এবার হলিক্রস কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী সুমাইয়া ফারহানা ইসলাম বললেন, পরীক্ষার ফলাফলে তিনি সন্তুষ্ট। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত।
“অ্যাডমিশন টেস্টের জন্য রেজাল্ট অনেক বড় বিষয়। সে হিসেবে ভালোই হয়েছে। কিন্তু আমাদের পড়ালেখা অনেক কম হয়েছে, সেক্ষেত্রে সিলেবাসটা কী হবে তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।”
সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষা হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিতেও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নিতে অনুরোধ করে আসছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।
তবে মাউশির সাবেক মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুন মনে করেন, এতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন বোঝাই যাবে না।
“যে মেধাবী, ভর্তি পরীক্ষায় তাকে সুযোগ দেওয়া উচিত। মেধাবীরাই এগিয়ে যাবে।”
উচ্চ মাধ্যমিকে যে ঘাটতি হয়েছে শিক্ষার্থীদের, উচ্চ শিক্ষায় গিয়ে সে ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
ফাহিমা খাতুন বলেন, “পরীক্ষার পরে শিক্ষার্থীরা যে সময়টা বসে ছিল, সে সময়টাতে কলেজগুলো অতিরিক্ত কোর্স নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা যেহেতু পরীক্ষা ও ফলভিত্তিক সবকিছু চিন্তা করি, তাই এভাবে কোনো প্রোগ্রাম নেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা অংশ নেয় না।
“এই ক্ষতিটা মেনে নিয়েই শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যেতে হবে।”
কী করা উচিত?
মাউশির সদ্যবিদায়ী মহাপরিচালক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুকও মনে করেন, যে বিষয়গুলোর পরীক্ষা নেওয়া হয়নি, সেখানে এক ধরণের ঘাটতি থেকে যাবে।
“সেটা মেইকআপ করতেই হবে। আমার মনে হয়, সেল্ফ লার্নিংয়ের মাধ্যমেই তারা ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবে। শিক্ষার মূল বিষয়টা জ্ঞান অর্জন। যে সীমাবদ্ধতাগুলো আছে, সেটা শিক্ষার্থীরা নিজেরাই পূরণ করতে পারবে, এটা এমন কিছু নয়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তারিক আহসানও বলছেন, সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা ও প্রস্তুতির জন্য লম্বা সময় পাওয়ায় এবারের ফল ভাল হয়েছে।
তবে বাংলা, ইংরেজিসহ যে বিষয়গুলোর পরীক্ষা নেওয়া হয়নি, সে বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ‘গ্যাপ’ থেকে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
“মহামারীর এই পরিস্থিতির জন্য আসলে কেউ তৈরি ছিল না। এটা পূরণের জন্য টারশিয়ারি এডুকেশনে একটি প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া জরুরি। এই ব্যাচটির জন্য একটি ফাউন্ডেশন প্রগ্রামের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার।”
আর সেজন্য সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার আহবান জানিয়ে গোলাম ফারুক বলেন, “যে জায়গাগুলোতে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি হয়েছে, ভর্তি পরীক্ষার সময় সে দিকগুলোতে বিশেষভাবে নজর দিলে শিক্ষার্থীরা তাদের ঘাটতি পূরণের সুযোগ পাবে।
“যে সময়ে যে লার্নিংটা দরকার, সেটা না হলে ভবিষ্যত বা অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ারে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করে। বাস্তবে যখন সে সমস্যায় পড়বে, তখন জীবনের প্রয়োজনে যে সেল্ফ লার্নিংয়ের মাধ্যমে ঘাটতি মেটাবে।”
এই অধ্যাপক বলেন, “যারা মেধাবী তারা তাদের নিজেদের আগ্রহেই এগিয়ে যায়। কিন্তু যারা পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল, তাদের ঘাটতি পূরণে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের প্রয়োজন।”
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নানও মনে করেন, যে বিষয়গুলোর পরীক্ষা হয়নি, সেখানে ঘাটতি থেকেই যাবে।
“এই ক্ষতিটা পূরণ করতে হবে। আর সেজন্য একটি ‘স্পেশাল প্রসেস’ বের করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বোর্ড কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় যারাই করুক সেটা করতেই হবে। এই সমস্যাটা আমাদের একার হয়নি, সারা দুনিয়ার হয়েছে। এমন একটি সমাধানের পথ বের করতে হবে, যেন আমাদের শিক্ষার্থীরা উপকৃত হয়।”
বিদেশে পড়া অভিজ্ঞতা তুলে ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য বলেন, “আমরা দেখেছি, যারা যে বিষয়ে দুর্বল ছিল, তাদের সেই বিষয়ের মিডেল কোর্স নিতে হয়েছে। দেশের কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও এটা আছে। তাহলে কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া যায়।”
তবে এ পরিস্থিতিতে এবার সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
“আমাদের দেশে ভর্তির যে প্রক্রিয়া, এটা কোনো দেশে নেই। আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা দেশের বাইরে পড়তে গেলে তাদের ভাষাগত দক্ষতা, অ্যানালিটিকাল দক্ষতা বাড়াতে হয়। তারা জিআরই, আইইএলটিস, জিম্যাট দেয়। তারা কী ভর্তি পরীক্ষা দেয়? আমাদের দেশের ভর্তি পরীক্ষা বাস্তবসম্মত নয়।”
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ২০২১ সালের উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ করেন। পরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলন করে এবারের ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। সেখানে তিনিও ‘সাবজেক্ট ম্যাপিং’ এবং সংক্ষিপ্ত সিলেবাসকে রেকর্ড পাসের অনুঘটক হিসাবে দেখার কথা বলেন।
যেসব বিষয়ে এবার পরীক্ষা নেওয়া হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে এসএসসি ও জেএসসির ওই বিষয়ের ফলাফল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে সাবজেক্ট ম্যাপিং।
“সে কারণে তাদের আগের যে নম্বর সেটি এসেছে। হয়ত কম বিষয়ের পরীক্ষা, কম সিলেবাসে পরীক্ষা, কাজেই আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি ভালো প্রস্তুতি নিতে পেরেছে। কাজেই তারা অনেক বেশি ভালো ফলাফল করেছে,” বলেন দীপু মনি।
তবে এই ‘ভালো’ ফলে যারা খারাপের শঙ্কা দেখছেন, তাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “ভালো ফলাফলে আমরা এত অসন্তুষ্ট হই কেন? আমি আসলে এটা বুঝি না। আমরা কি চাই না, আমাদের সন্তানেরা ভালো করুক?
”এমন কি কোনো দিন আসবে না, যেদিন আমাদের কেউ অনুত্তীর্ণ থাকবে না? সবাই ভালো করবে, সবাই উত্তীর্ণ হবে। এটা কেন? এই মানসিকতা কেন?”
