‘ব্রিটেনকে নিজ কুৎসিত অতীতের মুখোমুখি হতে হবে’


সৈয়দ মূসা রেজা | Published: February 17, 2022 16:21:57 | Updated: February 18, 2022 11:17:37


ডেভিড ওলুসোগা

ব্রিটেনের ইতিহাসের অন্ধকার কুৎসিত দিককে আলোয় নিয়ে আসার সাধনা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে করছেন ইতিহাসবিদ এবং সম্প্রচারক ডেভিড ওলুসোগা। মানুষের কাছে নিজ দেশ ব্রিটেনের অন্ধকার ইতিহাস তুলে ধরার নিরলস প্রচেষ্টায় সম্প্রতি সুফল দিতে শুরু করেছে। আরো মানুষ মনোযোগ এখন এদিকে তাকাতে শুরু করেছে। ওলুসোগাকে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের নারী সাংবাদিক ডিজাইরি ইবেকওয়ে সম্প্রতি একটি নিবন্ধ লিখেছেন। ইবকেওয়ে দৈনিকটির লন্ডনস্থ অডিও দলের একজন সংবাদ সহকারী। এর আগে ব্রডকাস্ট ম্যাগাজিনের প্রতিবেদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ছাড়া, ইবকেওয়ে দ্য ইকোনমিস্টের একটি ফেলোশিপও সম্পন্ন করেন। পূর্ব লন্ডনে বেড়ে উঠেছেন ইবকেওয়ে এবং ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঘটনাটি গত ডিসেম্বরের। কালো মানুষের জীবনের মূল্য আছে বা ব্ল্যাক লাইভ মেটারের চার বিক্ষোভকারীকে ব্রিটিশ আদালত বেকুসর খালাস দেয়। ১৭ শতকের দাস ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কোলস্টোনের মূর্তিকে ২০২০-এর ১৭ জুন ভাঙচুরের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছিল। ডেভিড ওলুসোগা ব্রিটিশ আদালতে ইতিহাসবিদ হিসেবে সাক্ষ্য দেন। তাঁরই সাক্ষ্যের বদৌলতে মুক্তি পায় চার বিক্ষোভকারী।

ইতিহাসবিদ ওলুসোগা কাজের কেন্দ্রবিন্দু হলো বর্ণবাদ, দাসপ্রথা এবং সাম্রাজ্য। দাস ব্যবসায়ীর মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনায় আসামীদের পক্ষে আদালত সাক্ষ্য দেওয়াকে নিজের কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি।সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে তিনি খোলাখুলি বলেন, আমি ইতিহাসের এইসব অধ্যায় নিয়েই সোচ্চার।

দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের ব্রিস্টল নগরে বসান হয়েছিল কোলস্টোনের মূর্তি। বিক্ষোভকারীরা এ মূর্তিকে ভাঙচুর করে এবং উপড়ে ফেলে। ব্রিস্টলে বিচার চলাকালে দাস ব্যবসায় কোলস্টোনের জঘন্য ভূমিকার কথা তুলে ধরেন ৫২ বছর বয়সি ওলুসোগা। আফ্রিকার মুক্ত মানুষগুলোকে দাস হিসেবে বেঁচে দেওয়ায় মাধ্যমে কী ভাবে এ দাস ব্যবসায়ীর নির্মমতার শিকার তারা হয়েছে সে কথাও জুরিদের শোনান ওলুসোগা।

এ চাঞ্চল্যকর মামলার প্রতি অনেকেই আগ্রহী চোখে তাকিয়ে ছিলেন। মামলার বায়কে কোনো কোনো ব্রিটেনবাসী সতর্কতার সাথে স্বাগত জানান। আর অনেকেই এ রায়কে হাঁফ ছেড়ে গ্রহণ করেন। এ মামলার মধ্য দিয়ে আবারো ওঠে আসে ওলুসোগার নাম। ব্রিটিশ সমাজে তাঁর কর্মতৎপরতার প্রভাব কতো গভীরে গেছে তাই প্রমাণিত হলো আবারো।

ব্রিটেনের সবচেয়ে খ্যাতিমান গণইতিহাসবিদ আদালতে যে সব কথা বলেন তার সঙ্গে নিজ কাজের মিল আছে। মিল আছে প্রায়ই সে সব বিষয়কে ইতিহাস খুঁড়ে বের করে আনেন তিনি। দীর্ঘদিন আগেই ভুলে যাওয়া বা ধামাচাপা দেওয়া বা চাপা পড়ে যাওয়া অন্যায় অবিচারের ঘটনা ও কাহিনি তুলে আনেন তিনি। এ কাহিনি প্রকাশ করেন সবার জন্য দ্বার অবারিত এমন গণ-মাধ্যমেই।

দাসপ্রথা নিয়ে বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন তাঁর সর্বশেষ টিভি অনুষ্ঠান ওয়ান থাউজেন্ড ইয়ারস অব স্লেভারিতে। স্মিথসোনিয়ান চ্যানেল সম্প্রতি এটি প্রচার করেছে। এতে তিনি তুলে ধরেন সিনেটর কোরি বুকার এবং অভিনেতা ডেভিড হেয়ারউডের মতো জন নন্দিত ব্যক্তিত্বদের দৃষ্টিভঙ্গি।

ওলুসোগার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রকল্পগুলোর একটি হলো ব্ল্যাক অ্যান্ড ব্রিটিশ : এ ফরগটেন হিস্টোরি। বিবিসি থেকে ধারাবাহিক ভাবে প্রচারিত হয়েছে অনুষ্ঠানটি। পুস্তাকাকারেও আকারে বের হয়েছে। কালো মানুষ এবং ব্রিটেনের মধ্যে বহুকালের এবং অনেক টানাপড়েনের সম্পর্ককে এখানে দেখানো হয়। অনুষ্ঠানে এমন সব কালো সম্প্রদায়কে নিয়ে আসা হয় যারা ব্রিটেনে সেই রোমান যুগ থেকেই বসবাস করছে।

ওলুসোগা নিজের তৎপরতার কথা বলতে যেয়ে জানান, ইতিহাসের যে প্রসঙ্গে নিয়ে আমরা কথা বলি না তাতেই আমার আগ্রহ। হাজারবার বলা হয়েছে ইতিহাসের এমন সব কাহিনি আবারো বলার কোনো আগ্রহ একেবারেই নেই। ইতিহাসের যেসব কেচ্ছা কেউ বলেন নি আমি তার কথাই বলতে চাই।

ওলুসোগার জন্ম লাগোসে। তিনি অর্ধ-নাইজেরিয়। তাঁর বাবা নাইজেরিয়ীয় এবং মা সাদা-ব্রিটিশ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর পাশে নাইজেরিয়ার সেনাদের লড়াইয়ের গল্প মায়ের মুখেই শিশুকালে শুনেছেন। এতে তাঁর মধ্যে ইতিহাসের প্রতি আগ্রহের জন্ম নেয়। কালো এবং ব্রিটেনের মধ্যে বিরাজমান সম্পর্ক বোঝার চেষ্টার বীজও এ ভাবেই বোনা হয় তার মনে। তিনি বলেন, এখন আমি যা করি তার অনেকটাই উপলব্ধির সেই মুহূর্ত থেকেই করছি। শিশু অবস্থায় ব্রিটেনে চলে আসেন তিনি। মা এবং পরিবারের অন্যান্য শিশুদের সাথে বেড়ে ওঠেন উত্তরপূর্ব ইংল্যান্ডে। ব্ল্যাক অ্যান্ড ব্রিটিশ বইতে তিনি ১৯৭০ এবং ১৯৮০এর দশকে দেশটির বর্ণ-উত্তেজনার কথা বলেছেন। বলেছেন তাঁর পরিবার কী ভাবে বর্ণবাদী আচরণের অসহায় শিকার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের ঘর-বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়।

নিজ শৈশবের পরিস্থিতি তুলে ধরতে যেয়ে ওলুসোগা ব্ল্যাক অ্যান্ড ব্রিটিশ বইয়ের মুখবন্ধে বলেন, ব্রিটিশ শব্দটির বিপরীত শব্দ প্রশ্নাতীত ভাবেই ছিলো কালো। কালো ব্রিটিশ শব্দগুচ্ছের সঙ্গে আজ আমরা খুব পরিচিত হলেও সে সময়ে তা খুবই কম শোনা যেত। তিনি নিজের বেড়ে ওঠার সময়ের ইতিহাস শোনাতে যেয়ে বলেন, আমার প্রজন্মের প্রায় প্রতিটি কালো বা মিশ্র-বর্ণের মানুষের কাছে জাতিগত সহিংসতার একাধিক ঘটনা শোনা যাবে। এ গল্পগুলো অপমান হওয়া থেকে শুরু করে (বর্ণবাদের জেরে) হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হওয়া পর্যন্ত নানা কিছু রয়েছে। তিনি আরো বলেন, এ সব কাহিনি এখনো দগদগে ঘায়ের মতোই কাঁচা, মনের গভীরে তরতাজা হয়ে আছে। এ গুলো খুবই ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক চেনাশোনার বাইরে খুব কমই শোনানো হয়। মুখে মুখে চলে আসা বিংশ শতাব্দীর জাতিগত সহিংসতার এই ইতিহাস কখনো হয়নি সংগৃহীত বা সংকলিত। কিন্তু এখনো এ সব গল্প-কাহিনি প্রচলিত আছে। আর সংগৃহীত বা সংকলিত না হওয়াই সবচেয়ে জঘন্য।

সে রকম পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়ের জীবনে তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে বন্ধুর সময়। সেখানে এক প্রিয় শিক্ষক এবং টেলিভিশন দেখার ফলে ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসা গভীর হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়েই লেখাপড়া করেন। পরে স্বেচ্ছাতেই শিক্ষাবিদ হওয়ার বদলে টেলিভিশনের চাকরিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন ওলুসোগা।

টানা ১৫ বছর টেলিভিশন অনুষ্ঠান প্রযোজনা করার পর নিজেই ক্যামেরার সামনে উপস্থিত হতে শুরু করেন তিনি। হালে এ হাউজ থ্রো টাইম নামের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছেন তিনি। এটিও বই আকারে পাওয়া যায়। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ব্রিটিশ একটি বাড়ি এবং তার অধিবাসীদের শতকের পর শতক জুড়ে গল্প শোনানো হয়।

বইটির মুখবন্ধে তিনি বলেন, আমাদের ঘরবাড়িগুলো ভালোভাবে পরিচিত এবং তবুও তাদের ইতিহাস আমাদের কাছ রয়েছে লুকানো। এই একই জায়গায় আগে যারা জীবন-যাপন করেছে তাদের সম্পর্কে আরো জানো এ কথাটি বলছে আমাদের ঘরবাড়িগুলো। বইটির সূচনায় আর সে সব কথা বলেন তা হলো, নতুন বাড়িতে ওঠার পরই আমরা তাকে আমাদের রুচি-অভিরুচির আদলে সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা যতই চেষ্টা করি না আগে যারা এখানে বসবাস করেছে তাদের জীবন-যাপনের ধারা পুরোপুরি মুছে দিতে সক্ষম হই না। তিনি আরো বলেন যে, ঘরবাড়ি আমাদের তুলনায় অনেক বেশি নমনীয়। ঘরবাড়ির মর্যাদা এবং ভূমিকার পরিবর্তন ঘটে। এমনকি মৃত বাড়িকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা যায়।

ইতিহাসের ক্ষেত্রে তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯এ তাঁকে অর্ডার অব দি ব্রিটিশ এমপায়ার পদকে ভূষিত করা হয়। এ পদকের সঙ্গে এমন এক সাম্রাজ্য জড়িত যা কিনা নিজেই রক্তপাত এবং সহিংসতায় জড়িত তাই এ পদক গ্রহণে তাঁর মধ্যে দেখা গেছে প্রাথমিক অনীহা।

ওলুসোগার ঢংয়ের প্রশংসা জানিয়ে ইমেইল করেছেন ওম্যান অ্যান্ড পাওয়ারএর লেখক এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্রুপদী ইতিহাসের অধ্যাপক মেরি বিয়ার্ড। ব্রিটেনের অন্যতম বহুল পরিচিত ইতিহাসবিদ মেরি বলেন, সরাসরি গল্প পরিবেশন করার এবং ভিন্ন দৃষ্টিতে কোনো বিষয় দেখতে মানুষকে উজ্জীবিত করার মতো বিরল গুণ রয়েছে ওলুসোগার।

২০১৯এ তিনি পরিবেশন করেন প্রামাণ্যচিত্র আনরিমেমবার্ড। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন ব্রিটিশ সংসদের কালো সদস্য ডেভিড ল্যামি। প্রথম মহাযুদ্ধে নিহত আফ্রিকা এবং এশিয়ার সেনাদের প্রতি বর্ণ-বৈষম্য আচরণকে এতে তুলে ধরা হয়। এরই জেরে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকার প্রকাশ্য মাফ চাইতে বাধ্য হয়।

ব্রিটেনে ইতিহাসের প্রথম কালো নারী অধ্যাপক ওলিভেট ওটেলে ইউরোপ ও ব্রিটিশ সমাজে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের একটি প্রবণতার বিষয়ে তুলে ধরেন। নিজ বই আফ্রিকান ইউরোপিয়ান : অ্যান আনটোল্ড হিস্টোরিতে এ প্রবণতার বিবরণ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ব্রিটিশ এবং ইউরোপের ইতিহাসে কালোদের অভিজ্ঞতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর কৃতিত্বের অংশবিশেষ তিনি ওলুসোগাকেই দেন।

এমন পরিবর্তনে বিস্মিত বোধ করছেন ওলুসোগা। তিনি বলেন, বেতার ও টেলিভিশনে ইতিহাসের এ সব কাহিনি বলার জন্য গোটা পেশা-জীবন জুড়ে লড়াই করেছি। আমার চারপাশের দুনিয়া বদলে গেছে বলেই আমি মনে করছি। মানুষ এখন শোনার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠছে।

২০২০এ আমেরিকায় জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ব্ল্যাক লাইভস মেটার বা কালো জীবনে মূল্য আছে আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় ব্রিটেনের গণ-ইতিহাসে কী থাকা উচিত তা নিয়ে ঘোরতর বিতর্কের অবতারণা হয়। ব্রিটিশ রক্ষণশীল দাতব্য সংস্থা ন্যাশনাল ট্রাস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে তাদের কোনো কোনো স্থাপনার সঙ্গে উপনিবেশবাদ এবং দাসপ্রথার সম্পর্ক ছিল সে বিষয় তুলে ধরা হলো। কিন্তু এত করেও বিতর্ক এড়ানো গেল না। রক্ষণশীল রাজনীতিবিদের কেউ কেউ এবং ডান-সংবাদ মাধ্যম এ প্রতিবেদনকে ফালতু বলে চালিয়ে দেয়।

ওলুসোগা বলেন, এ বিতর্ক প্রমাণ করছে ব্রিটিশ জনগোষ্ঠীর কেউ কেউ দেশটির ইতিহাসের কুৎসিত অংশকে অস্বীকার করছে। অতীতকে ভর করে ব্রিটিশ জনগোষ্ঠীর কোনো কোনো মানুষ বলতে চায়, আমরা জাদুময় একটি দ্বীপের জাদুমাখা মানুষের দল, যারা সব সময় ইতিহাসের সঠিক সড়ক ধরে এগিয়ে গেছি।

তিনি আরো বলেন, শুধুমাত্র নিজেদের অতীতের ইতিবাচক গল্পগুলো আপনি যদি নিজেকে বলতে চান, তাহলে এর অর্থ হচ্ছে অতীত নিয়ে আপনি কখনো সৎ থাকছেন না। এরপর তিনি বলেন, "এবং এটিই এখন ব্রিটেনের সমস্যা।


ব্ল্যাক অ্যান্ড ব্রিটিশ বইয়ের প্রচ্ছদ

ওলুসোগার সাড়া জাগান বই ব্ল্যাক অ্যান্ড ব্রিটিশ ২০১৬ সালের নভেম্বরে প্রথম প্রকাশিত হয়। এ বইয়ের উপসংহারে একই বছরের আগস্টে প্রকাশিত দেশটির সমতা এবং মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। এতে স্বীকার করা হয়েছে, ইংল্যান্ডে এবং ওয়েলসে সাদার তুলনায় কালো মানুষের খুন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে দ্বিগুণ।

Share if you like