দুনিয়ার জ্বালানি তেলের চাহিদার ১০ শতাংশ মেটানোর মতো পর্যাপ্ত তেল উত্তোলন করে রাশিয়া। ১৯৯০-র দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর তেল বিক্রির টাকাতেই বেশির ভাগ খাদ্যপণ্য আমদানি করেছে দেশটি।
তবে সে ছবি পাল্টে গেছে। আজ রাশিয়া শস্য থেকে পনির পর্যন্ত প্রায় সব খাদ্যপণ্যে স্বনির্ভর। রেলপথে শস্য পরিবহনে রাশিয়ার প্রধান সংস্থা রাসাগ্রোট্রান্স জানাচ্ছে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার আমদানি করা গমের তিন ভাগের এক ভাগ, এশিয়ার ১০ শতাংশ এবং বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ গমের চাহিদা হালে মেটায় রাশিয়া। মার্কিন কৃষি দপ্তরের পরিসংখ্যান থেকেই এ চিত্র পাওয়া গেছে।
রাশিয়ার কৃষি উৎপাদন ১৯৯১ সালের পর বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ । একই সময়ে রপ্তানি তিনগুণের বেশি বেড়ে গত বছর ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০১৯ সালের পর অর্থের হিসাবে এটা বেড়েছে পাঁচগুণ। রাশিয়ার রপ্তানি করা সব কৃষিপণ্যের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে শস্য। রাশিয়ার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি কৃষিপণ্য আমদানিকারক দেশ দুটি হলো মিশর এবং তুরস্ক।
রুশ কৃষিমন্ত্রী দিমিত্রি পাত্রুশেভকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই কৃষিপণ্য রপ্তানি মূল্য আরো ৫০ শতাংশ বাড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রুশ নিরাপত্তা পরিষদের সচিব এবং পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র নিকোলাই পাত্রুশেভের ছেলেই হলেন কৃষিমন্ত্রী দিমিত্রি। এছাড়া, রপ্তানি চাহিদা পূরণ করতে শস্য উৎপাদন ২০২৫ সালের মধ্যে ১৪ কোটি টনে নিয়ে যাওয়ার জন্যও রুশ কৃষিমন্ত্রীকে অবিরাম চাপে রাখা হয়েছে।
শ্রমিক ঘাটতি এবং খারাপ আবহাওয়ায় ফসলহানির কারণে শস্য রপ্তানির অস্থায়ী লক্ষ্যমাত্রা ২০২১ সালে ১২ কোটি ৭০ লাখ টনে নামিয়ে আনতে বাধ্য হবে রাশিয়া। ২০২৫ সালে শস্য-রপ্তানির যে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে তা অর্জন করা কতোটা কষ্টসাধ্য সে কথাই ফুটে উঠেছে এতে।
রাশিয়া আগেও পড়শি দেশগুলোর বিরুদ্ধে খাদ্যপণ্যকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ২০১৫ সালে তুর্কি বাহিনী রুশ জঙ্গি বিমানকে ভূপাতিত করলে তুরস্কে কয়েকটি কৃষিপণ্য রপ্তানির ওপর বাধা-নিষেধ আরোপ করে মস্কো। আঙ্কারা বিরোধী কয়েকটি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এটি আরোপ করা হয়। তুরস্কের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার গ্যাস ইউরোপে রপ্তানি করতে সম্মত হলে দু ‘বছর পর তুরস্কের উপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এর আগে, রাশিয়াকে এমন সুযোগ দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল বুলগেরিয়া। তুরস্ক ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি রুশ গম আমদানিকারী দেশ হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালে ইরানের ওপর আবার মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বলবত করার আগে, তেলের বদলে পণ্য চুক্তি করে রাশিয়া। এর আওতায় ইরানের তেলের বদলে গম রপ্তানিতে সম্মত হয় দেশটি।

কালাশনিকভ রাইফেল
বিশ্লেষকরা বলেন, এসব আলাদা আলাদা ঘটনার পর রাশিয়ার কৃষিশিল্পে ব্যাপকতা এবং উচ্চাভিলাষের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। পশ্চিমের সাথে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার পর থেকেই চীনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে রাশিয়া। গুরুত্বপূর্ণ একটি পাইপলাইনের নির্মাণ সেখানে শুরু করেছে। ভবিষ্যতের বিশাল খাদ্য-বাজার হিসেবে চীনকে বিবেচনা করছে রাশিয়া। জনসংখ্যা, ভৌগলিক নৈকট্য এবং দেশটির পূর্বগামী রেলপথগুলোসহ অবকাঠামো উন্নয়নের উপস্থিতিকে হিসেবে নিয়েই এ বিবেচনা করছে মস্কো। আপাতত চীনের বাজারে রাশিয়ার উপস্থিতি এখনো তুলনামূলক ভাবে ছোট। চীনের শস্যের মান এবং ২০২০ সালে আমদানি কমে যাওয়ায় এরকমটি হয়েছে।
রুশ গ্যাজপ্রম ব্যাংকের সাতিনকো বলেন, “রাশিয়া সব সময়ই চীনের উপর নির্ভর করে। বেইজিংকে কৃষিসহ সামগ্রিক ব্যবসায় প্রধান অংশীদার হিসেবেই মনে করে মস্কো। চীনের বাজারটি বেশ চমকপ্রদ এবং মস্কো এ বাজার জয় করতে চায়। পণ্য উৎপাদনকারী সব দেশই এখানে একে অন্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অস্ট্রেলিয়া এবং ইউক্রেনও চীনের বাজার নিয়ে নেমেছে প্রবল প্রতিযোগিতায়।”
বিশ্বব্যাপী গমের বাজারের নেতৃত্বে রয়েছে রাশিয়া। পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাজার সুরক্ষিত করা এবং পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টাও করছে দেশটি। টিএস লোমবার্ডের পুঁজি বিনিয়োগ সংক্রান্ত গবেষণাকারী মাদিনা ক্রসতালেভা বলেন, “পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার চেয়ে ভবিষ্যত বাজার খুঁজে বের করেই এখন রাশিয়ার কাজে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গম সরবরাহ করে পররাষ্ট্র বা বিদেশি নীতির ক্ষেত্রে কিছু অর্জন করার চেয়ে বরং বিদেশের বাজারে ঢোকাই বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”
পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ দেখতে পাচ্ছেন যে তেল খাতের আয় কমে যাওয়ার ঘাটতি খানিকটা পুষিয়ে দিচ্ছে রাশিয়ার শস্য আয়। এ সত্ত্বেও রাশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির মোট দেশীয় উৎপাদন বা জিডিপির ১৫ শতাংশের যোগানদার তেল এবং গ্যাস খাত। অন্যদিকে জিডিপির মাত্র ৪ শতাংশ পাওয়া যায় কৃষি থেকে।
বর্তমানে রুশ বাজেটের এক তৃতীয়াংশ যোগায় তেল এবং গ্যাস রাজস্ব। তবে সাম্প্রতিক দামের ওঠানামায় রাশিয়াসহ অন্যান্য তেল উত্তোলনকারীদেরকে তিক্ত অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য যুদ্ধের সাথে যোগ হয়েছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিমুখী প্রবণতা। আর এই দুইয়ের যোগফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বাধ্য হচ্ছে রাশিয়াও। এটিই যখন প্রেক্ষাপট তখন কূটনীতির কার্যকর নতুন অস্ত্র হয়ে উঠছে খাদ্য ।
আফ্রিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো অঞ্চলগুলোতে দ্রুত জনসংখ্যা বাড়ছে আর এসব অঞ্চলকে খাদ্য সরবরাহের নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছে মস্কো। ২০৫০ সালের মধ্যে বাড়তি দুইশ কোটি মানুষের বেশির ভাগই বসবাস করবে পৃথিবীর এ সব প্রান্তে।
রাশিয়া এবং ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফসাগ্রোর প্রধান নির্বাহী আদ্রে গুরিয়েভ বলেন, বাড়তি এ চাহিদা মেটানোর মতো ভালো অবস্থানে আছে রাশিয়া। তিনি আরো বলেন, “রাশিয়ার জমি, পানি, বন্দর, রেলওয়ে সবই আছে। অন্য কোনো দেশেরই এমন বিশাল সম্ভাবনা নেই।”
তিনি এরপর বলেন, “রাশিয়া যদি রকেট এবং উপগ্রহ নির্মাণ প্রতিযোগিতায় নাও জয়ী হতে পারে তারপরও রাশিয়ার কৃষিপণ্য বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে পারবে।” এখানেই না থেমে যোগ করলেন, “বিশ্ব রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আর কালাশনিকভই পাবে না বরং সবুজ ভূমি, নীল পানি এবং বিশুদ্ধ খাদ্যও পাবে।”
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]
