Loading...

‘কাজীদাকে মনে হয়েছিল মেজর জেনারেল রাহাত খান’

| Updated: January 20, 2022 17:06:00


কাজী আনোয়ার হোসেন (১৯৩৬-২০২২) কাজী আনোয়ার হোসেন (১৯৩৬-২০২২)

পারিবারিক পরিমন্ডলের কারণে জন্মের পর থেকে বইয়ের মাঝেই বড় হয়েছি। বড়দের বইপড়ায়ও  ইঁচড়ে পাকা ছিলাম আমি। আর তাই ক্লাস ফোরে থাকতেই পরিচয় মাসুদ রানার সাথে। মামার বাড়ি গিয়ে হঠাৎ একটি বই হাতে পাই। নাম ছিল সম্ভবত নিরাপদ কারাগার ( দুই খণ্ডে লেখা মাসুদ রানা সিরিজের ৯৯ ও ১০০তম বই)। পড়ে কতটুকু কী বুঝেছিলাম মনে নেই, মনে দাগ কেটে ছিল। সে সময় এতটুকুই।

বাবা প্রিয়লাল দাস ছিলেন বইয়ের মানুষ। তাঁর শিক্ষকতার নেশা তো ছিল অকৃত্রিম। পেশায় বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতাকে। এছাড়াও কিছুদিন প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সাহার প্রকাশনা সংস্থা পুথিঘর লিমিটেডের বড় পদেও করেছেন। এসব কারণেই ছেলেবেলা থেকে বইই নিত্যসঙ্গী। নববর্ষ বা পূজা বা জন্মদিন যা উপলক্ষই হোক, আমরা দুই ভাই সবসময় বইই উপহার পেয়েছি। তবে সেগুলোর কোনটাই সেবা প্রকাশনীর নয়।

সেবার সাথে পরিচয় ক্লাস ফোরে, তাও মাসুদ রানা দিয়ে। এরপর ১৯৮৩ সাল। ক্লাস ফাইভের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। মামার বাড়ি গেছি আবার বেড়াতে। গিয়েই চিকেন পক্সে আক্রান্ত হলাম। ফলে ঘরবন্দি অনেকদিনের জন্যে। বন্দি ঘরে এক আলমারী বই যার বেশিরভাগই সেবা প্রকাশনীর। আমাদের জন্য তখনো ওগুলো নিষিদ্ধ। বড় দুই মামাতো বোন মলিদি ও নেলীদি  কিন্তু সেই বইগুলোর পোকা। তাঁদের প্রশ্রয়েই প্রায় তিন সপ্তাহের আটকে পড়া জীবনে আমার সঙ্গী হয়ে গেল মাসুদ রানা। গোগ্রাসে গিলেছি বইগুলো। পড়েছি ধ্বংস পাহাড়, স্বর্ণমৃগ, বিপজ্জনকসহ আরো অনেকগুলো রানা।

বড়ভাই কৌশিকও বইপড়ায় রীতিমত পাগল ছিল। আর মাসুদ রানারও ভীষণ ভক্ত ।  সেসময়ে নারায়ণগঞ্জের দুই নম্বর রেল গেট এলাকায় আন্তর্জাতিক বইঘর নামে একটা দোকানে পেপারব্যাক বই ভাড়া দিতো- এক টাকায় একদিনের জন্য। আমরা তখন জামতলায় থাকি। বাসা তখন বেশ দূরেই ঐ বই ভাড়া নেয়ার দোকানটা। তারপরও কৌশিক সেখান থেকে নিয়মিত বই নিয়ে আসতো। বাসা আসা পর্যন্ত অপেক্ষাটা অনেক বড় ছিল ওর কাছে। তাই রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতে আসতেই পড়তো। এতে যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে  তা ওর মাথায় ছিল না। বাসায় বিচারও এসেছিল সেজন্যে। ভাই ক্লাস নাইনে উঠে এইটের বিজ্ঞান বইয়ের মাঝখানে সুন্দর করে কেটে খোঁপ তৈরি করেছিল- সেবা প্রকাশনীর তথা মাসুদ রানার বইয়ের সাইজে। উদ্দেশ্য, মা-বাবার চোখ এড়ানো। বুদ্ধিটা পরবর্তীতে আমারও বেশ কাজে লেগেছে!

বাবা-মা শুরুতে মাসুদ রানাকে ঠিকভাবে গ্রহণ করেননি।  অভিযোগ ছিল বড়দের বই  এখনই কেন পড়ব? তবে একদিন সাহস করে বাবাকে বলেছিলাম আমি কি কি শিখেছি। মাসুদ রানার সাথে ঘুরেছি পুরো বিশ্ব --ভূগোল থেকে বিজ্ঞান।  ভালোবাসা থেকে জীবনবোধ কিংবা সাধারণ জ্ঞানের সব খুঁটিনাটি -- সবকিছুর উৎস আমার এই মাসুদ রানা! পরবর্তীতে কুয়াশাও।  স্কুলে যা শিখেছি তাঁর থেকে অনেক বেশি শিখেছি সেবা প্রকাশনীর বইয়ে। অনুবাদ-ভাবানুবাদ- ওয়েস্টার্ন সিরিজ এমনকি তিন গোয়েন্দাও আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। সে হিসেবে কাজীদা আমার শিক্ষকও বটে। পরবর্তীতে  আমার বাবা-মা সুন্দর মেনে নিয়েছিলেন।

ক্লাস এইটে থাকতে অনেক চেষ্টা করে সেবা প্রকাশনীর ল্যান্ডফোনে কল করেছিলাম। কাজীদার সাথে কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাঁকে আমি বয়স বাড়িয়ে বলেছিলাম কলেজে পড়ি।  উনি বুঝতে পেরেছিলেন হয়তো যে আসেলে আমি মাধ্যমিকের গণ্ডিও পার হইনি তখনো। উপদেশ দিয়েছিলেন সব ধরণের বই পড়ার সাথে সাথে নিজের পড়ালেখাটাও ঠিকমতো করতে। গম্ভীর গলার কাজীদাকে মনে হয়েছিল মেজর জেনারেল রাহাত খান আর নিজেকে মাসুদ রানা।

স্বপ্নের নায়ক তো আর হওয়া যায় না। তবে মনে মনে আমাদের দেশীয় স্বপ্নের নায়কের ৫ফিট ১১ ইঞ্চির অবয়ব তৈরি হয়ে গেছে মনে কাজীদার জাদুকরী কথনে। সোহানা, সোহেল, রূপা, সলিল, গিলটি মিয়ারা আমাদের আশেপাশেই আছে সবসময়।… 

জগতের নিয়মে গতকাল বুধবার চলে গেলেন কাজী আনোয়ার হোসেন, আমাদের কাজীদা। মাসুদ রানার স্রষ্টা, সেবা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা। সরাসরি পরিচিত না হয়েও বড় আপন ছিলেন তিনি। অতল শ্রদ্ধা।

লেখক রঙ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী।

soumik1972@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic