Loading...

‘ঈশ্বরই শুধু প্রেসিডেন্টের পদ থেকে আমাকে সরাতে পারবেন’

ব্রাজিলের গণতন্ত্রকে অগ্নিপরীক্ষায় ঠেলে দিয়েছেন জাইর বোলসোনারো


| Updated: October 04, 2021 16:43:28


- সাও পাওলোর রাজপথে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর কুশপুত্তলিকা দাহ করছেন বিক্ষোভকারীরা - সাও পাওলোর রাজপথে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর কুশপুত্তলিকা দাহ করছেন বিক্ষোভকারীরা

ভড়কে দেওয়া এবং কেলেঙ্কারিকে জাইর বোলসোনারো দীর্ঘদিন ধরেই নিজ অস্ত্রাগারের প্রিয় অস্ত্র হিসেবে খাটিয়ে আসছেন। ব্রাজিলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে জ্বালাময়ী করে তোলার জন্য এই দুই অস্ত্র ব্যবহারে পিছুপা হন না তিনি। সম্প্রতি এ অস্ত্রদ্বয়ের ঝনঝনানি ঘনঘন শোনা যাচ্ছে। অস্ত্র প্রয়োগ হচ্ছে সুনির্দিষ্টভাবে। সাথে বিষ ফোঁড়ের মতো যোগ হয়েছে তাঁর অন্ধ সমর্থকদের ঘনঘন সমাবেশ ও বিক্ষোভ। সব মিলিয়ে ব্রাজিলের গণতন্ত্রে বয়ে যাচ্ছে উদ্বেগের উত্তাল ঢেউ।

জুলাই মাসে তিনি হুংকার দিলেন, ব্রাজিলের ইলেক্ট্রনিক নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। কাগজের রশিদ ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। না হলে আগামী বছর “কোনো নির্বাচনই হবে না।” তাঁর দাবি, ভোট জালিয়াতি ঠেকাতেই এ পথে নামতে হবে। কিন্তু ব্রাজিলের শীর্ষ নির্বাচনী আদালত বারবার ইলেক্ট্রনিক ভোট ব্যবস্থার নিশ্ছিদ্র কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। সুপ্রিম কোর্টের সাথে এ নিয়ে টানাপড়েনের সময় তিনি “সংবিধানের সীমা ছাড়িয়ে”গিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার  হুমকি দেন। সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভের শেষ নেই। আগ্নেয়াস্ত্রকে কেন্দ্র করে আইন শিথিল করার মতো বোলসোনারোর প্রিয় বিষয়গুলো দৃঢ় হাতে রুখে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। পরিকল্পিত ভাবে “ভুয়া খবর” ছড়ানোর বিরুদ্ধে তদন্তে প্রেসিডেন্ট এবং তার এক ছেলেকেও জড়াতে পিছু পা হয়নি দেশটির সর্বোচ্চ আদালত।

সাও কার্লোসের ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মারিয়া দো সোকোররো বলেন, “বোলসোনারো সীমা ডিঙ্গিয়েছেন। তবে, সাও পাওলোতে তাঁর বিক্ষোভগুলো প্রমাণ করছে যে বোলসোনারবাদ আন্দোলনের রাজনৈতিক পেশীশক্তি আছে। এ ছাড়া, অনেকে যা ভাবেন  ব্রাজিলে রক্ষণশীলতার অবস্থান তার চেয়েও বেশি।”

প্রেসিডেন্টের গণতন্ত্র-বিরোধী হাঙ্গামা ভোটারদের কাছে তাঁকে আরো বেশি জনপ্রিয় করে তোলেনি। তিনি সেই ২০ ভাগ কট্টর সমর্থকদের আস্থার বলয়েই আটকে আছেন। সাবেক ছত্রীসেনা (প্যারাট্রুপার) বোলসোনারোকে ২০১৮-এর নির্বাচনের অজ্ঞাতকুলশীল প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দিয়েছিল ব্রাজিলের প্রতাপশালী ব্যবসায়িক সম্প্রদায়। সাম্প্রতিক ক্রিয়াকলাপের জেরে এই সম্প্রদায়ের বড় অংশের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তাঁর।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারোর সমর্থনে রাজপথে এক নারী

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কর্তারা বলছেন, গণবিক্ষোভের মধ্য দিয়ে নিজ ক্ষমতাকেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন তিনি। ব্রাজিলের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কর্ম সম্পর্কে ফিরবেন তিনি। তবে বিরোধীদের ভাবনা ভিন্ন। তাদের আশংকা হলো, আগামী বছরের নির্বাচনের ফলকে মোকাবেলা করার ভূমি তৈরি করছেন প্রেসিডেন্ট। এমনকি তিনি হয়ত অভ্যুত্থানের চেষ্টা করবেন।

“ব্রাজিলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোলসোনারোর জন্য খুব যুতসই মনে হচ্ছে না। ২০২২-র নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থী হয়ে উঠছেন লুলা। এ প্রবণতা বজায় থাকলে ভোটে জালিয়াতি হয়েছে বলে চিৎকারকে দ্বিগুণ করবেন বোলসোনারো। সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে তাঁর ঘাঁটিকে ব্যবহারের চেষ্টার কৃপণতা করবেন না।” 

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর তাঁর সমর্থকরদের ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলে হামলা প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে গেটেলিও ভার্গাস ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক মাতিয়াস স্পেকটর আরো বলেন, “ট্রাম্পপন্থীদের সৃষ্ট ৬ জানুয়ারির মতো পরিস্থিতি দেখা দেওয়াও অসম্ভব নয়।”

তিনি আরো যোগ করেন, “আগামী দিন, সপ্তাহ এবং মাসগুলিতে অর্থনীতি আরো বেহাল হচ্ছে আর ব্রাজিলও নির্বাচনী চক্রের নিকটবর্তী হচ্ছে, উগ্রপন্থী বোলসোনারোরও আবার ক্ষমতা সওয়ার হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে।”

কর্তৃত্ববাদী হঠকারিতা: পেশাগত জীবনের প্রায় প্রতি ঘাটেই বিতর্কে জড়িয়েছেন বোলসোনারো। ১৯৮০-র দশকে তরুণ কর্মকর্তা থাকার সময়ই বেতন এবং সেনাদের থাকার পরিবেশ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। এরপরের দুইটি বছর তাকে সামরিক কারাগারে কাটাতে হয়। ব্রাজিলের সংসদের নিম্নকক্ষে সাত মেয়াদে সদস্য ছিলেন তিনি। অকথ্য ভাষা ব্যবহার এবং সহযোগীদের অবমাননাকর কথা বলায় বারবার তার বক্তব্যকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ তে এক নারী সহযোগীর বিরুদ্ধে তিনি বলেন, ওই নারী এতোই “কুৎসিত”যে কেউ তাকে ধর্ষণও করতে চাইবে না।

প্রেসিডেন্ট হিসেব কখনোই নিজ কর্তৃত্ববাদী প্রবৃত্তিকে রাখঢাকের মধ্যে পুষে রাখার চেষ্টাই করেননি তিনি। ১৯৬৪-৮৫ সময়কালে ব্রাজিলের সামরিক স্বৈরশাসনের দিনগুলো নিয়ে বারবার প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠেছেন । কংগ্রেস এবং সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে এক সমাবেশেও গতবছর যোগ দিতে তিলমাত্র দ্বিধা দেখা যায়নি তাঁর। ব্রাজিলে তাঁর এমন সব ক্রিয়াকলাপকে হিটলারের উত্থানকালীন উইমারের জার্মানির সময়কালের সাথে তুলনা করেন দেশটির এক বিচারক।।

বিরোধী রাজনীতিবিদরা বলছেন, প্রেসিডেন্টের মতলব পরিষ্কার। “বোলসোনারো...গর্বের সঙ্গে বলেন আগামী নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া হবে না।”এ কথা জানান মধ্য-ডান সিটিজেন পার্টির সিনেটর আলসান্দ্রো ভিয়েরা। তিনি আরো বলেন, “নিজ দায়িত্ব এড়াতেই বিচার ও আইন বিভাগের ওপর হামলা করছেন, একই সাথে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথ খুলে দিচ্ছেন।”

ব্রাজিলের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের মধ্য-ডান রাজনীতিবিদ কিম কাতাগুরিও অভ্যুত্থানের কথারই প্রতিধ্বনি করেন। জানান, তিনিও বিশ্বাস করেন বোলসোনারো অভ্যুত্থানেরই প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি মনে করেন, “প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়মুক্তি হারানোর পরই অপরাধের দায়ে তাঁর বিচার হবে সে কথা বোলসোনারোর জানা আছে। বোলসোনারোর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিশ্বমারির সময়ে অপরাধতুল্য অবহেলা এবং আইনপ্রণেতা থাকাকালীন দুর্নীতি কেলেঙ্কারির দায়ে তাঁর বিচার হবে।”

১৯৯১ এবং ২০১৯-এর মধ্যবর্তী পর্যায়ে ফেডারেল আইনপ্রণেতা থাকার সময় সরকারি তহবিলে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। অবশ্য এ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বোলসোনারো। 

কাতাগুরি আরো বলেন, “অভ্যুত্থান সফল হবে কিনা সেটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়।”তার তিন পূর্বসূরি -- মিশেল টিমার, দিলমা রুসেফ এবং লুলা -- প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ত্যাগের পরই তদন্তের মুখে পড়েছেন। বোলসোনারোও স্বীকার করেছেন যে গ্রেফতার হওয়া “হয়ত তাঁর কপালে”রয়েছে।

বেশিরভাগ বিশ্লেষকই ধারণা করেন, ব্রাজিলের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বোলসোনারোর তেমন দহরম-মহরম নেই। নিজের হঠকারী তৎপরতায় এসব প্রতিষ্ঠানকে তাই মাঠে নামাতে পারবেন না। সুপ্রিম কোর্টতো তাঁর বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে রেখেছে। দেশটির সংবাদ মাধ্যম মুক্ত অবস্থা বজায় রাখতে পেরেছে এবং তাঁর সমালোচনাও কঠোর ভাবেই করছে।

সরকারকে সমর্থন দিয়ে মোটা বাজেট আদায়ের জটিল ভারসাম্যের কাজটি করছেন ব্রাজিলের কংগ্রেস নেতারা। তবে পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের খায়েশ বলকিয়ে উঠলে রাশ টানতেও দ্বিধা করেন না তাঁরা। দ্রুততম সময়ের মধ্যে রঙ বদলাতে পটু হিসেবে কুখ্যাতির টোপরটি পড়েছেন ব্রাজিলের রাজনীতিবিদরা। নির্বাচনী বিপর্যয়ের দুর্দিনে বোলসোনারোর পাশে এসব রাজনীতিবিদরা থাকবেন – এ কথা বিশ্বাস করার মতো মানুষ ব্রাজিলে বেশি পাওয়া যাবে না। সেনা এবং পুলিশ কর্তাদের থেকে শুরু করে সাধারণ সৈন্য পর্যন্ত সবার মধ্যেই বোলসোনারোর প্রতি অনুগত পাওয়া যাবে। কিন্তু এরপরও বোলসোনারোর সামরিক হঠকারিতায় তাল মেলানোর খোয়াব দেখেন না শীর্ষ অবস্থানের সেনা কর্তারা।

দেশটির প্রাক্তন এক সেনাপতি বলেন, “বহু দশক ধরেই ব্রাজিলে পুরো গণতন্ত্র এবং পূর্ণ স্বাধীনতা বিরাজ করছে। এ সময়ে কি সেনাবাহিনী কোনো অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে? কঠোর, অনুপযুক্ত এবং আগ্রাসী কথা বলছেন প্রেসিডেন্ট...তিনি কেশে সামান্য ইঙ্গিত করলেই কী ব্রাজিলের সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে? না, এটা মোটেও মেনে নেওয়া যায় না”

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like

Filter By Topic