সহকারী পুলিশ সুপার (এসএসপি) ফাতেমা এবং পুলিশের একই পদবীর আরও তিনজনসহ বিভিন্ন বাহিনীর মোট ১০ জন আর্মি অ্যাভিয়েশন স্কুলে গত জুলাই মাসের প্রথম দিকে এই প্রশিক্ষণ শুরু করেন।
এদের মধ্যে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে বিষয় ভিত্তিক পরীক্ষায় নয় কোর্সমেটকে পেছনে ফেলে প্রথম হয়েছেন ফাতেমা তুজ জোহরা। এ প্রশিক্ষণ চলবে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর।
ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া সবাই এককভাবে রানওয়ে ঘিরে উড়োজাহাজ চালানোর প্রাথমিক পর্ব শেষ করেছেন। প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে একাই সফলতার সঙ্গে আকাশেও উড়েছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় সে অভিজ্ঞতা স্মরণ করে ফাতেমা বলেন “যখন বলা হলো আপনাকে প্রশিক্ষক ছাড়া একাই এই বিমান নিয়ে শূন্যে উড়তে হবে। চ্যালেঞ্জ সামনে এসে গেল।
“আত্মবিশ্বাস আর কমিটমেন্ট নিয়ে চার সিটের ওই প্রশিক্ষণ বিমানটি নিয়ে আমি উড়লাম, ঠিকমতো নামলাম। অনেক বড় স্বস্তি পেলাম। সে এক আলাদা অনুভুতি, ভাষায় বলা যাবে না।”
প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই ১০ জনের মধ্যে আমি একাই নারী। আর নারী হিসাবে এখানে আলাদা কোনো সুযোগ নেই। সব কিছুই প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে আসতে হচ্ছে।
“প্রতিটি পদে এগুচ্ছি আর মনে হচ্ছে এখানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত, এর চেয়ে ভাল কিছু আর হতে পারে না।”
পুলিশের এভিয়েশন উইংয়ে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পেয়ে চিন্তা করার সময় নেননি বলেও জানান একমাত্র এ নারী সদস্য।
“যখন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অ্যাভিয়েশন উইংয়ে যোগ দিতে ইচ্ছুকদের নাম চাওয়া হয় তখন আমি পাঁচ মিনিটি সময়ও ব্যয় করিনি এটা চিন্তা করার জন্য, মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।”
৩৬তম বিসিএস উত্তীর্ণ পাবনার মেয়ে ফাতেমার বাবা অবসর নিয়েছেন, মা গৃহিনী। তাদেরসহ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে সদ্য পাস করা ভাইয়ের সঙ্গেই থাকেন ফাতেমা।
“আমার এই ছোট্ট পরিবারের সদস্যরা প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করছেন। প্রশিক্ষণে কতটুকু অগ্রসর হলাম সেটা নিয়ে তাদের জানার আগ্রহের কারণে আমার পথ চলা সহজ হচ্ছে।”
শুরু থেকেই পুলিশে আসার স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘লাঠি নিয়ে চোরের পেছনে ছোটা’ তার অপছন্দ। পুলিশে যোগ দিয়ে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে চান নবীন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
ফাতেমা বলেন “অপরাধ দমনে সামাজিক সচেতনতা হচ্ছে সবচেয়ে বড় জিনিস। একটা চোরকে ধরলাম আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠালাম, আবার ধরলাম জেলে পাঠালাম, এসব থেকে বের হয়ে সামগ্রিকভাবে সচেতনতা তৈরি করা…
“প্রিভেনটিভ কাজ করার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে একটা উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়।”
অপরাধের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে সুস্থ সমাজ গঠনের দিকে সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশার পাশাপাশি পুলিশের সেবামূলক কাজকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ফাতেমা তুজ জোহরার।
বিমান বা হেলিকপ্টার চালিয়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে চান তিনি। এই শিক্ষা দিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষকে যে, সেবা দেওয়া যায় সেটাই প্রমাণ করতে চান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
“কোনো দুর্গম এলাকায় কেউ বিপদে পড়েছেন, অগ্নিদগ্ধ কাউকে ঢাকায় আনা দরকার- এসব সেবামূলক কাজ করার সুযোগ খুব কম লোকের থাকে। আমি সেটা করতে চাই।”
পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, বাংলাদেশ পুলিশের অ্যাভিয়েশন উইংয়ের জন্য রাশিয়া থেকে দুটি আধুনিক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
“এ বছরের শেষের দিকে এই উইংটি পুরোপুরি ‘অপারেশনে’ যেতে পারবে বলে আশা করছি,” - বলেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) কামরুজ্জামান।
সোমবার পুলিশ সদর দপ্তরে আর্মি অ্যাভিয়েশন গ্রুপ কমান্ডার মেজর জেনারেল আই কে এম মোস্তাহসিনুল বাকীর নেতৃত্বে আর্মি অ্যাভিয়েশন স্কুলের একটি প্রতিনিধিদল পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন।
এসময় আইজি বলেন, অ্যাভিয়েশন উইং চালুর ফলে বাংলাদেশ পুলিশ ‘ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রে’ সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে।
“বাংলাদেশ পুলিশের নবগঠিত অ্যাভিয়েশন উইং দুর্গম অঞ্চলে দ্রুত যোগাযোগ, গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা, তল্লাশি অভিযান এবং উদ্ধার কার্যক্রমে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।”
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বাংলাদেশ পুলিশের একটি ইউনিট হলেও ২০১৩ সালের শুরু থেকে সেখানে দুটি হেলিকপ্টার রয়েছে। রয়েছে পৃথক অ্যাভিয়েশন উইং।
পুলিশ সদর দপ্তর দুটি হেলিকপ্টার কেনার মাধ্যমে নতুন এই অ্যাভিয়েশন উইং খুলতে যাচ্ছে। তবে এর নেতৃত্বে কে থাকবেন সে ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি বলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে।