সমগ্র বিশ্বকে জরুরিভিত্তিতে টিকার আওতায় আনার জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অথচ এখনো বিশ্বের বড় অংশজুড়ে হয় আংশিক ভাবেই টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে অথবা আদৌ টিকা দেওয়া হয়নি। এদিকে কোভিড-১৯-এর আরো মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী প্রজাতি দেখা দেওয়ার সব রকম আশংকাই বিরাজ করছে। অধিকতরও সংক্রমণক্ষম এবং টিকারোধী কোভিড ভাইরাসের মিউটেশন বিশ্বকে অসহায় ভাবে বিশ্বমারি-সূচনার প্রাথমিক দিনগুলোর দিকে ঠেলে দেবে।
এর মধ্যেও চলতি বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের মধ্যে গোটা বিশ্বকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার কাজটি উচ্চাভিলাষী, তবে অর্জনযোগ্য।
উইলসন সেন্টারের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গ্লোবাল হেলথ সিকিউরিটি কনসোর্টিয়াম (জিএইচএসসি) মে মাসে বিশ্বব্যাপী টিকা দেওয়ার তৎপরতাকে সফল করার একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করে।
প্রয়োজন রয়েছে এমন সব দেশে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে তা হবে এই সমস্যার সমাধানের কেবল অর্ধেক মাত্র। টিকা দেওয়ার সঠিক অবকাঠামো না থাকায় সরবরাহকৃত টিকা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
জিএইচএসসি টিকাদান সংক্রান্ত একটি মডেল প্রকাশ করেছ। এতে দেখা যায়, জরুরিভিত্তিতে টিকার প্রয়োজন রয়েছে এমন সব দেশে কৌশলগত টিকা দেওয়ার জন্য দৈনিক টিকাদান সক্ষমতা ৫০ বা ৬০ লাখ থেকে উন্নীত করে ২০২২ সালের মার্চ মাসের মধ্যে এক কোটি ৪০ লাখে নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য বাড়তি ৬০০ থেকে ৮০০ কোটি পাউন্ড স্টারলিং (৭০ হাজার ৯৬০ কোটি থেকে প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা) তহবিল বরাদ্দের প্রয়োজন পড়বে। এটা কেবল কৌশলগত বিনিয়োগ নয় বরং বিশ্বব্যাপী টিকার সম-বিতরণেও সহায়তা করবে। এ সমস্যা সমাধানের জরুরি পদক্ষেপ না নিলে বিশ্বজুড়ে টিকা দেওয়ার সময়সীমা আরো পিছিয়ে যাবে। এরচেয়েও খারাপ কথা হলো, অগুনিত সংখ্যক টিকা নষ্ট হয়ে যাবে।
টিকাদানের জন্য নীতি পরিবর্তনের বিষয়টি চারটি ‘এস’(s)’এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এর প্রথমটি হলো সেটিং বা বিন্যাস। এরপর আসছে স্টাফিং বা কর্মী নিয়োগ, সিসটেমাইজেশন বা পদ্ধতি গ্রহণ এবং স্ট্র্যাটেজিক কম্যুনিকেশন বা কৌশলগত যোগাযোগ।
প্রথমত, পুরোমাত্রায় টিকা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের জন্য দেশগুলোকে টিকা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ভৌত বিন্যাসের প্রাপ্যতা আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি টিকা দেওয়ার স্থানগুলোতে টিকা নিয়ে যাওয়ার উপযোগী অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। এ সপ্তাহে জিএইচএসসি’র প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ বিষয়টি কি করে অর্জন করা যাবে সে সংক্রান্ত আরো বিবরণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইসরাইলের মতো দেশে এ তৎপরতা অনুশীলনের ফলে যে শিক্ষা লাভ করা হয়েছে তাও প্রকাশ করা হয়েছে।
বর্ধিত অনেক টিকাকেন্দ্র আরও কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। কেবল টিকাদানে সক্ষম ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া নয় বরং টিকাকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা করা, রোগী-নিবন্ধন তৎপরতা এবং সহযোগিতা চালানো, উপাত্তের যোগান দেওয়া, যন্ত্রপাতির তদারকি এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার মতো দায়িত্ব পালনে পারঙ্গমদের নিয়োগ দিতে হবে।
এ সব প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসা-কর্মীদের টিকা তৎপরতার অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে নিয়ে আসতে হবে। প্রশিক্ষণরত চিকিৎসা-কর্মি বাহিনীর মোতায়েন ত্বরান্বিত করতে হবে। আর স্বেচ্ছাসেবীদেরকে কার্যকর এবং সময়মতও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
কোটি কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার মতো জটিল প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সতর্কভাবে সমন্বয়ের প্রয়োজন। কার্যকরভাবে প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।
টিকা দেওয়া সংক্রান্ত সব তথ্যের সঠিক পদ্ধতিকরণের ফলে গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত বা ডাটা পাওয়া যাবে। এতে সরকারগুলো টিকা দেওয়ার কাজের কতোটা উন্নতি ঘটছে তার ওপর নির্ভুল ভাবে নজর রাখতে পারবে। একই সাথে কবে টিকা দেওয়া হলো সে তারিখও সঠিকভাবে জানতে পারবে, কখন টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে এমনকি বুস্টার ডোজের প্রয়োজন দেখা দেবে তাও যথাযথ ভাবে জানতে পারবে।
এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা। সতর্কতার সঙ্গে উপাত্ত যোগাড় করছে দেশটি এবং টিকা দেওয়ার কাজের ওপর নজর রাখতে তা সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহারও করছে। সেনেগালসহ আফ্রিকার অন্যান্য দেশও তাদের চলমান টিকা অভিযানের ওপর নজর রাখতে এবং এ ধরণের অভিযানের পরিকল্পনা করতে ডিজিটাল সাজ-সরঞ্জাম মোতায়েন করছে। তাদের নির্ভরযোগ্য এবং সহজে ব্যবহার যোগ্য নথিপত্র টিকা দেওয়ার প্রমাণ তুলে ধরছে।
একই সাথে গুরত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, মানুষ যদি টিকা নিতে আগ্রহী না হয় তবে এ সব অবকাঠামোগত নিরেট উপাদানের নিছক জলাঞ্জলি ঘটবে। আর এখানেই কৌশলগত যোগাযোগ এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় নামে।
কেন্দ্রিয়ভাবে পরিচালিত জাতীয় প্রচার অভিযান মূল হিসেবে কাজ করবে। এর মধ্য দিয়ে টিকার কার্যকারিতা, টিকার গুরুত্ব এবং কোভিড-১৯’এর বিরুদ্ধে টিকার ভূমিকা সংক্রান্ত ধারাবাহিক বার্তা দেওয়া হবে এবং এ সব তথ্য চাইলেই সহজেই মিলবে।
স্পষ্টভাবেই অনেক কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। এ সব কাজের মধ্যে সমন্বয় কী করে ঘটানো যাবে? স্বাস্থ্যখাতের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সমন্বয়ের লক্ষ্যে বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে ৬০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি জি-২০ জোটের পক্ষ থেকে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। একই সাথে, কেন্দ্রিয়ভাবে তহবিলের যোগান দেওয়ার এবং অর্থ ছাড় করার প্রয়োজন রয়েছে।
জি-২০ জোটের জন্য এটা বিশাল সমস্যা হয়ে দেখা দেবে। তবে এ সমস্যার মোকাবেলা করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি আর কিছুই নয়। সফল ভাবে টিকাদানের ওপর নির্ভর করে পাশ্চাত্যে আমরা আমাদের অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থাকে আবার খুলে দিতে শুরু করেছি। কোভিড-১৯ নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকার গোটা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে যদি না বিশ্বের বাদবাকি অঞ্চলেও অনুরূপ অগ্রগতি না হয়।
ভাইরাসের হাত থেকে সব দেশ নিরাপত্তা অর্জন না করলে একক ভাবে কোনো দেশ নিরাপদ থাকতে পারবে না। বিশ্বে টিকা সরবররাহ করার তৎপরতা চলছে, কিন্তু টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎপর না হলে গোটা তৎপরতাই বানচাল হওয়ার ঝুঁকিও থাকছে।
[টনি ব্লেয়ার যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ফাইনান্সিয়াল টাইমসে (এফটি) প্রকাশিত তাঁর লেখাটি বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা। দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এফটির কিছু প্রতিবেদন ও নিবন্ধ পুন:প্রকাশে চুক্তিবদ্ধ]
