হ্যান্ডশেকের শুরু হয়েছিল যেভাবে


শবনম জাবীন জেবা | Published: May 18, 2022 15:04:48 | Updated: May 18, 2022 19:41:14


হ্যান্ডশেকের শুরু হয়েছিল যেভাবে

বন্ধুর সাথে হঠাৎ দেখা হয়েছে বা সদ্য ঘরে ফেরা মানুষটার ঝুলিতে কোনো এক বিশেষ সফলতা উঁকি দিচ্ছে বা পরিচিত মানুষের সাথে কুশলাদি বিনিময় - এসবের ক্ষেত্রে অভিবাদন শুরু হয় হাতে হাত মিলিয়ে অর্থাৎ হ্যান্ডশেক বা করমর্দন করে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া বা অটোয়া থেকে অস্ট্রিয়া, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তেই হাতে হাত মিলিয়ে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানানোর রীতিতে নেই কোনো ভিন্নতা।

হ্যান্ডশেক সকলের সংস্কৃতির সাথে এতোটাই মিশে রয়েছে যে এ নিয়ে গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ডে রীতিমত একখানা রেকর্ডও তৈরি হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট, ১৯০৭ সালের ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নতুন বর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় উপলক্ষে হোয়াইট হাউজে অনুষ্ঠিত এক আয়োজনে মোট ৮,৫১৩ জন ব্যক্তির সাথে হ্যান্ডশেক করেছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য ২০১১ সালে এই রেকর্ডং ভেঙ্গে জনৈক রাজনীতিবিদের নাম উঠে আসে গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ডে।

হ্যান্ডশেকের মতো সুন্দর একটি অভিবাদন পদ্ধতির শুরুটা ঠিক কবে হয়েছিল বা কীভাবে হয়েছিল তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকতে পারে।

এ সম্পর্কে জানতে ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়। গ্রীক সভ্যতার আমলে প্রথম হ্যান্ডশেকের প্রচলন শুরু হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে তখন অভ্যর্থনা জানানোর পাশাপাশি আরো অনেক কারণে হ্যান্ডশেক করা হতো।

কারণগুলো সম্পর্কে জানার আগেও এই বিষয়ে অবগত হওয়া জরুরি যে তখনকার অভ্যর্থনা জানানোর কায়দাটাও এখনকার চেয়ে একটু ভিন্ন ছিল।

বর্তমানে পরিচিত মানুষের সাথেই সচরাচর হ্যান্ডশেক করা হলেও গ্রীক আমলে কেবলমাত্র আগন্তুকদের সাথে হ্যান্ডশেক করা হতো। কোনো আগন্তুক এলে তাকে ডান হাত বাড়িয়ে দিতে বলা হতো যাতে করে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে তার হাতে কোনো ধরনের অস্ত্র নেই এবং তার মনেও কোনো দুষ্ট মতলব নেই। এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরই তার সাথে হ্যান্ডশেক করা হতো এবং শুভেচ্ছা বাণী জানানো হতো।

ইতিহাসবিদ ওয়াল্টার বার্কার্টের মতে, গ্রীক আমলে যেকোনো একটি চুক্তি সুস্পষ্টভাবে মৌখিকভাবে সম্পন্ন হতো। কিন্তু কেবলমাত্র হ্যান্ডশেকের পরই সেই চুক্তি কার্যকর হিসেবে গণ্য হতো। মুক্তহস্তে নিরস্ত্র বাহুদ্বয় একে অন্যের দিকে প্রসারিত করে পরস্পরের হাত দৃঢ়ভাবে ধরা হতো বা হ্যান্ডশেক করা হতো।

অটুট বন্ধুত্ব বা মৈত্রী স্থাপনের জন্য হ্যান্ডশেক করা হতো, যেমন - খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতকের দিকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত অ্যাসিরিয়ার তৎকালীন রাজা তৃতীয় শ্যালমানেজার বেবিলনের শাসকের সাথে মৈত্রী স্থাপনের লক্ষ্যে সেই শাসকের হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে হালকা চাপ দিয়ে হ্যান্ডশেক করেছিলেন।

প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত মহাকবি হোমারের সেই অনবদ্য মহাকাব্য ইলিয়াড ও ওডিসিতেও বহুবার হ্যান্ডশেকের উল্লেখ রয়েছে। সেই মহাকাব্য থেকে প্রতিপাদ্য যে, অঙ্গীকার এবং বিশ্বস্ততার প্রতীকস্বরূপ হ্যান্ডশেক করা হতো।

প্রাচীন রোমে, বন্ধুত্ব ও আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে হ্যান্ডশেক করা হতো।

এমনকি গ্রীকদের কাছে হ্যান্ডশেক এতোটাই গুরত্বপূর্ণ ছিল যে তাদের সমাধিফলকেও এর চিত্রায়ন ছিল। সেখানে দেখানো হতো মৃত ব্যক্তিটি তার পরিবারের কোনো একজন সদস্যের সাথে হ্যান্ডশেকরত অবস্থায় রয়েছে। এর একটি অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল তাদের কাছে। এই চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে তারা জীবিত এবং মৃত ব্যক্তির আত্মিক সম্পর্কে বোঝাতো।

এতো গেল হ্যান্ডশেকের শুরুর দিকের কথা। কেবলমাত্র অভ্যর্থনা হিসেবে হ্যান্ডশেকের প্রচলন শুরু হয় ইউরোপের কোয়েকারদের মাধ্যমে আর সেটা সতেরোশো শতাব্দীর দিকে। নতুন একটি দিনের শুভেচ্ছা হিসেবে হ্যান্ডশেক করতো তারা।

তবে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রান্তে সামাজিক প্রথা এবং সৌজন্য হিসেবে হ্যান্ডশেকের প্রচলনটা শুরু আঠারোশো শতাব্দীর দিকে।

সেই গ্রীকদের সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি হ্যান্ডশেকের কারণ এবং প্রয়োগ হয়তো খানিকটা বদলেছে তবে বিশ্বস্ততা এবং বন্ধুত্বের এক নীবিড় সম্পর্ক রয়েই গেছে।

শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

zabin860@gmail.com

Share if you like