Loading...

হাকিম ভাই ও বুলবুল ভাই

| Updated: August 31, 2021 19:50:33


শেখ  আবদুল হাকিম ও বুলবুল চৌধুরী- {ছবি: সংগৃহীত} শেখ আবদুল হাকিম ও বুলবুল চৌধুরী- {ছবি: সংগৃহীত}

নব্বই দশকের পয়লা দিকে শাহবাগ বাদে আমার আড্ডার আরেকটা প্রিয় জায়গা ছিল এলিফ্যান্ট রোড। এলিফ্যান্ট রোডের এরোপ্লেন মসজিদের পাশ দিয়ে যে গলিটা দক্ষিণ-পূর্বে ঢুকে গেছে তার শেষমাথার ৩৬৮ নম্বর বাসাতে তখন থাকতেন ইমতিয়ার শামীম, ধ্রুব এষ এবং শওকত আলী তারা। এরা তিনজনই তুমুল আড্ডাবাজ বলে তাদের বাসাটা সকল সময়ে মৌ-মৌ করেছে লেখক-সাংবাদিক-চিত্রশিল্পীদের পদচারণায়।

এখানেই, ১৯৯৩ সালে, কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরীর সাথে প্রথম আলাপ হয় আমার। প্রতিদিন রাতের দিকে ৩৬৮ এলিফ্যান্ট রোডে যেতেন পাতলাসাতলা, হাওয়ায় দীর্ঘ চুল ওড়ানো বুলবুল ভাই। তার আগে সেখানে জমায়েত হতেন সাহিদুল আলম টুকু, মইনুল ইসলাম পল, শামসুল আলম আজাদ, আলীম আজিজ আর মাহবুব রেজা। বুলবুল ভাই কথা-টথা বিশেষ একটা বলতেন না। এমনও হয়েছে, তিনি আর আমি পাশাপাশি বসে আছি, সিগারেট টানছি, কিন্তু পরস্পরের সাথে আমরা কোনো কথা বলছি না। তথাপিও আমি তার মমতা বোধ করেছি বার বার। বড় আড্ডাতে তিনি চুপ করেই বসে থাকতেন বেশি, শুনতেন তার চাইতেও বেশি। তাঁর ব্যক্তিগত যত কথা তা ছিল ধ্রুব এষেরই সাথে, নিভৃতে।

দুই.

১৯৯৭ সালের পয়লা দিকে ধ্রুব এষ আর আলীম আজিজ আমাকে অদ্ভূত একটা অনুরোধ করে বসেন—সেবা প্রকাশনীর ‘রহস্যপত্রিকা’-তে আমি যেন কিছু দিনের জন্য সাব-এডিটরের কাজ করে দেই! আসাদুজ্জামান ভাই চলে যাওয়াতে সেখানে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, চাপ পড়ে যাচ্ছিল শেখ আবদুল হাকিম এবং রকিব হাসানের ওপরে। শেখ আবদুল হাকিম মূলত ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের অ্যাডাপটেশনগুলো গড়ে তোলার প্রকাশনার কাজে ব্যস্ত থাকতেন তখন। রকিব হাসান বেশি সময় দিতেন ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজসহ অন্যান্য লেখালেখিতে। তাঁরা ‍দু’জনেই তখন সেবার সবচেয়ে নিয়মিত ও জনপ্রিয় লেখক। আবার দু’জনই রহস্যপত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। কাজী আনোয়ার হোসেন সম্পাদক ও প্রকাশক। তো ভয়ানক অস্বস্তি নিয়ে আমি ‘না-না’ করেই যাচ্ছিলাম। কেননা ছোট কাগজের সাথে কাজ করা ছাড়া বড় প্রকাশনীর সাথে কাজের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না আমার! প্রুফ রিডিং পারলেও বানান সংশোধনের জন্য বার বার অভিধানের সাহায্য নিতে হতো আমাকে। তা’বাদে, ডিজাইন আর পেস্টিং পারতামই না আমি! ধ্রুব এষ আর আলীম আজিজ আমাকে বোঝালেন যে ডিজাইন আর পেস্টিংয়ের দায়িত্ব একান্তই ধ্রুবর, আমার কাজ হবে ম্যাটার তৈরি করে দেয়া, সে কাজে আমাকে প্রয়োজনে সব ধরনের সহায়তা দেবে আলীম। তো আমাকে রাজি হতেই হলো! আমি শর্ত দিলাম যে আমি 'গোস্ট সাব এডিটর' হিসেবে কিছু দিন কাজ চালিয়ে নেব। এভাবেই শেখ আবদুল হাকিমের সাথে আমার পরিচয় ঘটেছিল। আমার কৈশোরের ক্রেজ ‘মাসুদ রানা’ এবং রোমাঞ্চকর গল্পের অন্যতম কারিগর শেখ আবদুল হাকিমকে সামনাসামনি দেখে ভয়ানক আনন্দিত হয়েছিলাম আমি।

খাদির পাঞ্জাবি আর সূতির পাজামা পরতেন হাকিম ভাই, গোল্ড লিফ মার্কার সিগারেট খেতেন। দিলখোলা মানুষ ছিলেন তিনি। হাসতেন খুব মিষ্টি করে! আমি গল্প লিখতে চেষ্টা করি জেনে তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্য নিয়ে আলাপ করতেন আমার সাথে। সেসব আলাপে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর তিন বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ফিটজারাল্ড, হেমিংওয়ে, নভোকভ, ফোকনার, স্টেইনবাক—এদের মতো নমস্য কথাসাহিত্যিকেরা হরহামেশাই হাজির হতেন। এডিটিং ফেলে তাঁর সামনে বসে বিশ্বসাহিত্যের গুরুদের কাজ সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন শুনতাম আমি। একের পর এক সিগারেট পুড়ে ছাই হয়ে যেত আমাদের! তবু হাকিম ভাইয়ের গল্প ফুরোতো না! তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন দু’টো জরুরি জিনিস—স্বল্প সময়ে এডিটিং এবং লুসিড গদ্য লিখার কায়দা। তিনি এত ভাল শিক্ষক ছিলেন যে মোটামুটি এক মাসের ভেতরেই আমি শিখে ফেল্লাম অনেক কিছু। 

গ্রাফিক্স স্ক্যানে বইয়ের প্রচ্ছদের কাজ শেষ করে প্রতি দিন সন্ধ্যের পরে সেবা প্রকাশনীর অফিসে চলে আসনে ধ্রুব এষ, পেস্টিংয়ের ডেট না থাকলেও। তাঁর সাথে যোগ হতেন আলীম আজিজ। একটা রিকশায় উঠে আমার তিন জনে রওয়ানা দিতাম ৩৬৮ এলিফ্যান্ট রোডের উদ্দেশে। ততক্ষণে পত্রিকা-অফিস থেকে ফিরেছেন ইমতিয়ার শামীম, এনজিও-অফিস থেকে শওকত আলী তারা। সেই আড্ডাতে যোগ দিচ্ছেন বুলবুল ভাইও। আমরা সবাই তখন কাবাব-পরাটা খেতে যাচ্ছি মূলত মল্লিকা সিনেমা হলের পাশের রেস্টুরেন্টে। বুলবুল ভাইয়ের নিরবতা তখন মুগ্ধ করেছে আমাকে। তাঁর প্রতি আমার আকর্ষণ এখানেই ছিল—বেশি মানুষ এসে পড়লে তিনি সহজে আর মুখ খুলতেন না। বুলবুল ভাইয়ের একটা সাদা রঙের স্ট্রাইপ ফুলশার্ট আর রঙ জ্বলে যাওয়া খয়েরি ফুলপ্যান্টে এখনো চোখে ভাসছে আমার! সাধারণ মানুষের মতো চলেফিরে বেড়ানোর প্রবণতাটা আমার কাছে মনে হতো, তিনি আসলে লেখক হিসেবে লুকিয়েই থাকতে চান! বুলবুল ভাই এমনই লাজুক মানুষ ছিলেন!

তিন.

সব আড্ডাই এক সময় ভেঙে যায়, পড়ে থাকে পালক! ইমতিয়ার শামীমরা ৩৬৮ এলিফ্যান্ট রোডের বাসা ছেড়ে দিল ১৯৯৮-এর শেষের দিকে। সেই থেকে বুলবুল চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে গেল আমার। ১৯৯৯ সালের শেষদিকে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে চলে যাই, সেবা প্রকাশনীর সাথে আমার সম্পর্ক চুকে যায়। একইভাবে শেখ আবদুল হাকিমের সাথেও আমার নিয়মিত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল।

শেখ আবদুল হাকিম এবং বুলবুল চৌধুরী—এই দু’জনেই সত্তরের শক্তিমান কথাশিল্পীদের অন্যতম। বোহেমিয়ান জীবনের চর্চা করেছেন বুলবুল চৌধুরী, পক্ষান্তরে সংসারধর্ম অনুসরণ করে গেছেন শেখ আবদুল হাকিম। কিন্তু তাঁদের দু’জনের ভেতরে একটা অপূর্ব মিল ছিল—তাঁরা পেশাদার লেখক হতে চেয়েছিলেন। এ কারণে তাদের জীবন সরলরেখায় ধাবিত হয়নি, আর্থিক কষ্টে ছিলেন দু’জনেই। এ নিয়ে তাদের ভেতরে কোনো খেদ দেখিনি আমরা। একবার হাকিম ভাই আমাকে বলেছিলেন, লেখালেখি ছাড়া আর কিছুই পারেন না তিনি, তাই চাকরিবাকরি করে খাওয়ার কথা মাথায় আসেনি তাঁর। বুলবুল চৌধুরী ২০২১-এ ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত হয়েছিলেন। কিন্তু সৃজনশীল লেখা আর অনুবাদের তুলনায় অ্যাডাপটেশনের সংখ্যা বেশি থাকাতে শেখ আবদুল হাকিমের বড় কোনো মূল্যায়ন হয়নি —থ্রিলার লেখক হিসেবে তাঁর সুনাম ছড়িয়েছে বেশি। থ্রিলার ঘরাণার ক্ষেত্রে তো আর পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই! তবু শেখ আবদুল হাকিম আমাদের কৈশোরের হিরো হয়েই থাকবেন!

বাংলাদেশে পেশাদার লেখালেখির ধারণার পথিকৃৎ এ দু’জন লেখকের জন্য লাল সেলাম।

Faizulbd@gmail.com

[লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া; ঈষৎ সম্পাদিত]

Share if you like

Filter By Topic