একটি সাদা কালো ছবি, তাতে রয়েছে একটি বাস ও কিছু মানুষের উপস্থিতি। এটি ১৯৫৭ সালের দিকে লন্ডন থেকে কলকাতাগামী একটি বাসের ছবি যা সেই সময়ের পরিবহন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিয়েছে। বলা হয়ে থাকে লন্ডন থেকে কলকাতা যাওয়ার জন্য সড়কপথে বাসযোগে এটি ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম যাত্রাপথ।
বর্তমানে আকাশপথে লন্ডন থেকে কলকাতা পৌঁছতে লাগে প্রায় ১৬-১৭ ঘণ্টা। সেখানে একসময় এই পথটুকু সড়কপথে অতিক্রম করতে লাগতো প্রায় ৫০ দিন।
১৯৫৭ সালের দিকে লন্ডন এবং কলকাতা এই দুটো শহরই বিভিন্ন দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ৪০ বছর বয়সী ইংল্যান্ডের অধিবাসী, অসওয়াল্ড জোসেফ গ্যারো ফিশার এই বাসটির মালিক ছিলেন এবং তিনি বাসটির চালক হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি এই বাসটির নাম দিয়েছিলেন ‘ইন্ডিয়াম্যান’।
১৯৫৭ সালের এপ্রিল মাসে যাত্রী নিয়ে বাসটি প্রথম যাত্রা শুরু করে এবং ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে বাসটির যাত্রা শুরু হয়।
মোট ২০ জন যাত্রীকে নিয়ে বাসটি যাত্রা শুরু করেছিল (এর মধ্যে ২ জন নারী এবং ৫ জন পুরুষ যাত্রী ঐ বাসেই পুনরায় লন্ডন ফিরে এসেছিলেন)। বাসটি ১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল লন্ডন থেকে যাত্রা শুরু করে কলকাতা পৌঁছেছিল ৫ জুন। এত দীর্ঘসময় লাগার পেছনে বাসটির ইরান এবং তুর্কির মাঝামাঝি কোনো এক এলাকায় পথ হারিয়ে ফেলাকে কারণ হিসেবে ধরা হয়, যদিও এই কথার সপক্ষে তেমন অকাট্য যুক্তি নেই।
বাসরুটটি ছিল অনেকটা এরকম - লন্ডন থেকে যাত্রা শুরু করে বেলজিয়াম, পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়া, যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, তুর্কি, ইরান, আফগানিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তান হয়ে ভারতের আগ্রা, এলাহাবাদ, বানারাস হয়ে কলকাতা পৌঁছুত। যাত্রাপথে মোট ১৮ টি দেশ অতিক্রম করতে হতো।
সেসময় সীমান্তবর্তী প্রত্যেকটি দেশই এই বাসটির যাতায়াতের বিষয়টি সানন্দে গ্রহণ করেছিল, বর্তমানের মতো সীমান্ত বিষয়ক এত বিধিনিষেধ তখন ছিল না।
দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে লন্ডন থেকে কলকাতা পৌঁছানোর পর বাসের কর্মচারীদের একটি লম্বা সময়ের বিরতি দেওয়া হতো। প্রায় ১ মাসের একটি লম্বা বিরতি শেষে ফিরতি পথে রওনা দিতো। লন্ডন টু কলকাতা এবং কলকাতা টু লন্ডন ফিরে আসতে অর্থাৎ একটি রাউন্ড ট্রিপ সম্পন্ন করতে বাসটিকে ১১০ দিনে প্রায় ২০,৩০৪ মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল।
লন্ডন থেকে কলকাতা পৌঁছানোর পর বাসটি যখন উড স্ট্রীটে পার্ক করা ছিল সেইসময়ের একটি ছবি কলকাতার তৎকালীন একটি সংবাদপত্র ‘দ্য স্টেটসম্যানে’ প্রকাশিত হয়।
দ্য স্টেটসম্যানের সাথে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৭৬ বছর বয়সী যাত্রী মিসেস জে. স্কটার তার যাত্রার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন এভাবে, “আমার কাছে এটি একটি চমৎকার যাত্রা ছিল। তবে যাত্রাপথে আমি কেবলমাত্র একটি বিষয়েই বিরক্ত হয়েছিলাম। প্রসিদ্ধ শহরগুলোতে যাত্রা বিরতির সময় বিভিন্ন সংবাদপত্রিকার প্রতিনিধিদের অসংখ্য প্রশ্ন আমাকে বিরক্ত করে তুলছিল।”
বাসের অপর একজন যাত্রী ২২ বছর বয়সী পিটার মস লন্ডন থেকে কলকাতায় পৌঁছানোর পর ফিরতি যাত্রায় ইংল্যান্ডে ফিরে না এসে সমুদ্রপথে মালায়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ভ্রমণের সময় লেখা তার ডায়েরি, ছবি এবং স্কেচ এগুলোর সমন্বয়ে পরবর্তীতে একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটির নাম ‘দ্য ইন্ডিয়াম্যান- হোয়েন দ্য গোয়িং ওয়াজ গুড বাই ল্যান্ড এন্ড দ্য সি’। এই বইটিতে লন্ডন টু কলকাতা যাত্রার পূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায়।
নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটা সংবাদ অনুযায়ী, এই বাসটিতে ভ্রমণ করার জন্য ভাড়া গুণতে হতো সেসময়ের প্রায় ১৫০ পাউন্ড স্টারলিংস (লন্ডন থেকে কলকাতা ভাড়া ৮৫ পাউন্ড স্টারলিংস এবং ফিরতি ভাড়া ৬৫ পাউন্ড স্টারলিংস)। খাবার খরচ এই ভাড়ার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত ছিল। বলাই বাহুল্য, সেইসময় এই বাসের বেশিরভাগ যাত্রী ছিলেন সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ।
বিলাসবহুল এই বাসটিতে দীর্ঘসময়ের যাত্রাকাল উপভোগ করার জন্য যাত্রীদের জন্য বেশকিছু সুবিধার ব্যবস্থা করা ছিল, যেমন – আলাদা আলাদা শোবার বন্দোবস্ত, বই, ম্যাগাজিন পড়ার সুবিধা, রেডিও এবং টেপরেকর্ডারে গান শোনার আয়োজন, ফ্যান, হিটারসহ খাবার-দাবারের ব্যবস্থাও ছিল। এই বাসের স্লোগান ছিল, ‘ইওর কমপ্লিট হোম হোয়াইল ইউ ট্র্যাভেল’।
মাঝে যাত্রাপথে ভারতের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, যেমন- বিখ্যাত সমাধিসৌধ তাজমহল, বানারাসে গঙ্গা তীরবর্তী এলাকা, রাইন উপত্যকার রাজপথসহ পিকক থ্রোনের মত জায়গাগুলো পরিদর্শন করানো হতো।
এছাড়াও নয়াদিল্লী, তেহরান, কাবুল, ইস্তানবুল এবং ভিয়েনাতে যাত্রীদের কেনাকাটার জন্য সময় দেয়া হতো।
সেন্ট্রাল ওয়েস্টার্ন ডেইলির তথ্য অনুযায়ী, বেশকিছু বছর পর বাসটি দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং যাত্রার জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালের দিকে সিডনিতে কর্মরত একজন বৃটিশ পর্যটক, অ্যান্ডি স্টুয়ার্ট বাসটি কিনে নেন এবং সংস্কার করে বাসটিকে একটি ডাবল ডেকার বাসে রূপান্তরিত করেন। বাসটির নীচের ডেকে ডাইনিং ও পড়ার জায়গা এবং উপরের ডেকে আলাদা আলাদা স্লিপিং বাংকসহ ফ্যান ও হিটারের ব্যবস্থা ছিল। অ্যান্ডি স্টুয়ার্ট বাসটির নতুন নামকরণও করেন - ‘অ্যালবার্ট’।
হাই রোড ফর ওজি’র তথ্যমতে, অ্যালাবার্ট সর্বপ্রথম ১৩ জন যাত্রীকে নিয়ে ১৯৬৮ সালের ৮ অক্টোবর সিডনি থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।
অ্যালবার্ট সিডনি থেকে লন্ডন এবং কলকাতা থেকে লন্ডন এই রুটে যাত্রী সেবা দিয়েছে প্রায় ১৯৭৬ সালের আগ পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে সিডনি টু লন্ডন রুটে ৪ টি এবং লন্ডন টু কলকাতা রুটে প্রায় ১৫ টি ট্রিপ সম্পন্ন করে।
১৯৭৬ সালের দিকে ইরান সমস্যা এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের খানিকটা অবনতি হলে এই বাস সার্ভিসটি বন্ধ করে দেয়া হয়।
‘৭০-এর দশক পর্যন্ত এই কোম্পানির বাসগুলো যাত্রীদের সেবা প্রদান করেছে। যুগের হাওয়া বদল ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এসেছে আর কমেছে যাত্রাকালের সময়।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
