Loading...

স্যার ওয়াল্টার স্কট: ‘ঋণ করে ঘি খাওয়ার’ উন্মাদনা

| Updated: August 18, 2021 16:27:24


টুইড নদীর পারে স্যার ওয়াল্টার স্কটের দুর্গ অ্যাবটসফোর্ড টুইড নদীর পারে স্যার ওয়াল্টার স্কটের দুর্গ অ্যাবটসফোর্ড

[এ বছর ১৫ আগস্ট ছিল স্কটিশ ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার ও ইতিহাসবেত্তা স্যার ওয়াল্টার স্কটের ২৫০তম জন্মবার্ষিকী। ৬১ বছরের জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়তায় ভরপুর। তাঁকে নিয়ে ফাইনান্সিয়াল টাইমসের দীর্ঘ রচনার বাংলা রূপান্তরের দ্বিতীয় কিস্তি এখানে দেয়া হলো। প্রথম কিস্তির শিরোনাম ছিল: “স্যার ওয়াল্টার স্কট: সহজ ঋণ ও সৃজনশীলতার গল্প।” বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

অ্যাডাম স্মিথের অতি গুরুত্বপূর্ণ বই দ্য ওয়েলথ অব নেশনস  স্যার ওয়াল্টার স্কট পড়ে থাকলেও তা থেকে তিনি শিক্ষা নেননি, এমনটি মনে করা সঙ্গত। গ্রিনসিল, ওয়্যারকার্ড, কারিলিওন কিংবা ২১ শতকের যে কোনো বিশাল কোম্পানি বা করপোরেশন নিজেদের ঋণের ভারে তলিয়ে গেছে। ১৭৭৬ সালেই অ্যাডাম স্মিথ সহজ ঋণের লোভ এবং ‘ভূয়া বিলে’র চোরাবালি নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা দু’জনই পথে বসতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। কিন্তু তাঁর এই সতর্কবার্তার মাত্র ৫০ বছর পরেই ওয়াল্টার স্কট নিজের নামে ভূয়া বিল ছাড়তে থাকেন। আর আড়াইশ বছর পরে এরকম সন্দেহজনক বিলকে কেন্দ্র করেই গ্রিনসিল এবং ওয়্যারকার্ডের পতন ঘটে।

অর্থ উপার্জনের বিপুল সক্ষমতা ছিল স্যার ওয়াল্টার স্কটের। পাশাপাশি ছিল অর্থ ওড়ানোর বিপুলতর সক্ষমতা। তিনি নিজে বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় ডু্বে থাকতেন। পাশাপাশি তার ফরাসি স্ত্রীকেও সংসারের কাজের ছল-ছুতোয় টাকা ওড়ানোর উৎসাহ যোগাতেন।

স্কটের বাসভবনের তলকুঠরি বা সেলারে প্রায় সাড়ে চার হাজার বোতল সুরা বা মদ ছিল। নিয়মিত অতিথি অ্যাপায়নে তিনি ছিলেন দিল-দরিয়া। নিজ পরিবার ও বন্ধুদের জন্য খরচও করতেন দরাজ হাতে। তৎকালীন চল অনুযায়ী স্কট তার বড় ছেলেকে ঘোড়সওয়ার বাহিনীতে পর্যায়ক্রমে বড় বড় কমিশন পদ কিনে নিতে উৎসাহ যোগান। একই সঙ্গে এ পদের সঙ্গে মানানসই জমকালো দামি উর্দি পরার জন্য যা কিছু করা দরকার তা করতে মোটেও কাপর্ণ্য করেননি। (ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে অর্থের বিনিময়ে কমিশন কেনার চল ১৬৮৩ সালে রাজা দ্বিতীয় চালর্সের আমল থেকে শুরু হয় এবং ১৮৭১ সালে কার্ডওয়েল সংস্কার কার্যকর করার আগ পর্যন্ত তা বহাল ছিল।)

স্কট তাঁর বন্ধু, অভিনেতা ও ম্যানেজার ডেনিয়েল টেরির জন্য লন্ডনের অ্যাডেলপাই থিয়েটারের ইজারা নিয়ে দেন। স্কটের কয়েকটি কাহিনিকে নাটকের রূপ দিয়েছিলেন তিনি। স্কটের টাকা ওড়ানোর সবচেয়ে বড় রাস্তা ছিল টুইড নদীর পাড়ে খোশখেয়ালিপনায় ভরপুর দুর্গ অ্যাবটসফোর্ড। তিনি মনে করতেন, স্কটল্যান্ডের এরকম বর্ণিল এলাকায় চারপাশে খোলা জমি দিয়ে ঘেরা শুধু একটি বিশাল বাড়িতে স্কটসের বংশধরদেরই  থাকা উচিত। ক্লার্টি হোলি ফার্ম নামে সাদামাটা সম্পত্তি কেনার মধ্য দিয়ে এই খেয়াল বাস্তবায়নের সূচনা হয়।(স্কটিশ ভাষায় ক্লার্টি মানে হলো, নোংরা বা কর্দমাক্ত।) পড়শীদের জমি কিনে নেওয়ার জন্য বাজার দরের চেয়ে চড়া দাম দিতেও পিছপা হননি তিনি। বিপুল পরিমাণে জমি না কেনা পর্যন্ত তার এই ধারা চলতেই থাকে।

শিল্পীর তুলিতে স্যার ওয়াল্টার স্কট (আগস্ট ১৫, ১৭৭১ - সেপ্টেম্বর ২১, ১৮৩২)

স্কট সেখানে গাছপালা লাগান এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য উদ্যান রচনা করেন। বিশাল ভবন তৈরি করেন এবং সেটাকে বাড়ানোর কাজ অব্যাহত রাখেন। ভবনের প্রতি কক্ষকেই চোখ ধাঁধানো সাজ-সজ্জায় ভরিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি কক্ষকেই অতিমাত্রায় সজ্জিত করা হয়। এ সব সাজ-সজ্জার মধ্য দিয়ে বিগত যুগের সাহসিকতা ও বীরত্বের প্রতি তার হৃদয় নিংড়ানো টানেরই প্রকাশ ঘটে। দেয়ালের শোভাবর্ধন করতো রঙিন পশমি সূতা দিয়ে অলংকৃত বস্ত্রখণ্ড বা ট্যাপিসট্রি এবং শিল্পকর্ম। ছাদে আঁকা হয়েছিল তার পূর্ব পুরুষদের শোর্যবীর্যের গাঁথা। এছাড়া, বিখ্যাত বীর বরার্ট ব্রুসের করোটি বা রব রয়ের গাদা বন্দুকের মতো সন্দেহের অবকাশ রয়েছে এমন কিছু জিনিসও তিনি সংগ্রহ করেন।

স্কট যতই রোমান্টিক কাহিনী বা বীরত্ব গাঁথা তুলে ধরুন না কেন, তাঁর পূর্বপুরুষরা সীমান্তবর্তী কৃষকদের চেয়ে বড়জোর সামান্য ভালো অবস্থানে হয়ত ছিলেন। তবে তাদের অবস্থা পশু পালকদের চেয়ে বেশি কিছু ছিলো না। লাগামহীন খরচ তাঁর উপার্জনকে ছাড়িয়ে গেলে ঘাটতি পূরণের জন্য তিনি চুরির আশ্রয় নিলেন না। বরং টাকা ধার করা এবং চালাকির পথ বেছে নিলেন। আইনের নজরদারি এড়ানোর জন্য বর্তমান সময়ের বাণিজ্য সংস্থাগুলো নিজ দেশের বাইরে অবস্থিত কোম্পানির ওপর নির্ভর করে। পাশাপাশি কাজির গরুর মতো খাতা-কলমে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই এমন সব খোলস বা শেল কোম্পানির ওপরও নির্ভর করে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি। এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে আরামের সময় গেছে স্কটের। বেশিরভাগ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি অংশীদারিত্বের হওয়ায় তাদের তহবিল বা শেয়ার সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা তখনকার ব্রিটেনে ছিলো না।

স্কটের এডিবার্গের প্রকাশক ছিলেন আর্কবল্ড কনস্টেবল। প্রথমেই এই প্রকাশককে মুনাফা থেকে বঞ্চিত করার জন্য নিজের একটি প্রকাশনা সংস্থা তৈরি করলেন স্কট। নতুন এই প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার কথাটা কিন্তু গোপন রাখলেন। তাঁর বিদ্যালয়-বন্ধু জেমসের সহজ-সরল ছোট ভাই জন ব্যালানটাইনকে সামনে নিয়ে এলেন। ব্যালানটাইন নিজেও এতে আগ্রহ দেখান। নতুন এই সংস্থা থেকে প্রথম প্রকাশিত বই হলো দ্য লেডি অব দ্য লেক। বইটা ব্যাপক মুনাফা করলেও এ টাকা ব্যবসায় না খাটিয়ে বিলাস-ব্যসনে ব্যয় করলেন স্কট।

'দ্য লেডি অব দ্য লেক' বইয়ের প্রচ্ছদ

স্কট নিজের বই প্রকাশনার কাজে লেগে থাকলে নতুন এই প্রকাশনা কোম্পানি হয়তো ব্যাপক লাভের মুখ দেখতে পেতো। কিন্তু তিনি তা না করে একের পর এক সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন এবং এসব সিদ্ধান্ত ভুল ও অলাভজনক হয়ে দেখা দেয়। ফলে একদিকে গুদামে অবিক্রিত বইয়ের পাহাড় জমতে থাকে, অন্যদিকে সিন্দাবাদের দানব-বুড়োর মতো ঘাড়ে চাপতে থাকে ঋণের বোঝা। দেউলিয়া হওয়ার ও প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার গোপন কথাটা ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশংকাও এ সময়ে দেখা দেয়। তখন সে কালের ব্রিটেনের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি ডিউক অব বুকলিউচের সঙ্গে নিজ সুসম্পর্ককে কাজে লাগান তিনি। তাঁর কাছ থেকে মোটা টাকা ধার করে তা দিয়ে ধারদেনা মিটিয়ে দিলেন। তারপর চুপচাপ নিজ প্রকাশনা সংস্থা বন্ধ করে দিয়ে আবার ঘরের ছেলে ঘরে অর্থাৎ আর্কবল্ড কনস্টেবলের কাছেই ফিরে এলেন।

এতসবের মধ্য দিয়ে অবশ্য তার হঠকারি কাজকর্ম বন্ধ হলো না। বরং এবারে তিনি খোদ জেমস ব্যালানটাইনের ওপর ভর করলেন। তাকে মুদ্রণ ব্যবসায় নামার শলাপরামর্শ দিলেন।  সংস্থাটির গোপন কিন্তু প্রধান অংশীদার হলেন স্কট নিজেই। (কিছু সময় তিনি এর একক মালিকও ছিলেন।) কনস্টেবল যেন ব্যালানটাইনের কাছে গিয়ে বই ছাপানোর লাভজনক কাজটি করতে পারেন সে বন্দোবস্তও হলো। এছাড়া, বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে মুদ্রণ কাজ এ সংস্থাকে পাইয়ে দিতেও শুরু করেন স্কট। তবে এর পেছনে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থের কথাটা বেমালুম চেপে গেলেন তিনি।

এই মুদ্রণ ব্যবসায় মোটা মুনাফা হলো ঠিকই কিন্তু স্কট সে সব টাকা তুলে মর্জি মাফিক খরচ করলেন। ফলে আবারও জড়িয়ে পড়লেন ঋণের জালে। ব্যালানটাইন, কনস্টেবল, তাদের লন্ডনের প্রকাশক ও এজেন্ট হার্স্ট রবিনসন অ্যান্ড কোম্পানি এবং সর্বোপরি স্কট নিজে এই লাভের হাওয়ায়, বিলাস জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিলেন। কর্জের টাকায় ব্যবসার প্রসার ঘটানোর পাশাপাশি বিলাসী জীবন-যাপনকে আরো বিলাসবহুল করে তুললেন তারা।

আজকের অ্যাবটসফোর্ড

গ্রিনসিল হয়তো মনে করতো যে ‘সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সিং’ আধুনিক এবং উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক মডেল। কিন্তু ১৮ এবং ১৯ শতকের ব্রিটেনে ‘ডিসকাউন্টিং ট্রেড বিল’ বা ‘ছাড়কৃত ট্রেড বিল’ অন্যকথায় বাণিজ্য বাট্টা ছিল অর্থ ধার দেওয়ার প্রধান উপায়। (এই ব্যবস্থা অনুযায়ী উৎপাদনকারী ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর পণ্য উৎপাদন করে এবং তা পৌঁছে দিলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান তার মূল্য পরিশোধ করে।)

এছাড়াও আরেক ধরণের বিল ছিল যাকে অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ ভুয়া হিসেবে উল্লেখ করেন। এটি ‘আবাসন বিল’ বা উপযোজক হুণ্ডি নামে পরিচিত। এতে দুই ব্যক্তি যেমন স্কট ও কনস্টেবল পরস্পরকে তিন মাসের মধ্যে ৭৫০ পাউন্ড স্টারলিং দিবেন বলে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু বাস্তবে এক কানাকড়িও হাত বদল হয় না অথচ এ বিল বা হুণ্ডিপত্র ব্যাংকে জমা দিয়ে উভয়ই নগদ টাকা কর্জ নিতে পারতেন। তিন মাসের মেয়াদ ফুরালে তখন ধারের টাকা ফেরত দিতে হবে বলে কাগজে-কলমে উল্লেখ থাকে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারটি আর হতো না, বরং ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে নতুন বিল বা হুণ্ডিপত্র লেখা হতো। এভাবে টাকা শোধ আর হতো না। স্কট ও কনস্টেবলই কেবল এমন জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা নয়। বরং একই পন্থার আশ্রয় নিয়েছিলেন ব্যালানটাইন, হার্স্ট রবিনসন এবং অনেক কোম্পানিসহ তৎকালীন ব্রিটেনের হাজার হাজার মানুষ। ‘ঋণ করে ঘি খাওয়ার’ উন্মাদনায় যেন মেতে উঠেছিল ব্রিটেনের তৎকালীন অর্থনীতি!

Share if you like

Filter By Topic