Loading...

স্যার ওয়াল্টার স্কট: সহজ ঋণ ও সৃজনশীলতার গল্প

| Updated: August 17, 2021 16:27:52


স্যার ওয়াল্টার স্কট।  ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ স্যার ওয়াল্টার স্কট। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

এ বছর ১৫ আগস্ট ছিল স্কটিশ ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার ও ইতিহাসবেত্তা স্যার ওয়াল্টার স্কটের ২৫০তম জন্মবার্ষিকী। স্কটের জন্মজয়ন্তী উদযাপনে জড়িত ওয়েবসাইট জানিয়েছে, তিনি স্কটল্যান্ডকে ‘নিজস্ব স্বকীয়তা’ দিয়েছেন। একথাটায় বিন্দুমাত্র খাদ নেই। স্কটল্যান্ডের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী এবং ইতিহাস নিয়ে রোমান্টিক চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে সেখানকার রাজনীতি থেকে বিস্কুটের টিন পর্যন্ত সব কিছুতে স্কটল্যান্ডের যে ছাপ পড়েছে, স্কটের উপন্যাসগুলোর মধ্য দিয়ে তার সূচনা হয়।

১৮২২ সালে ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জর্জের এডিনবার্গ সফরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্কটল্যান্ডে ‘টারটন’ হিসেবে পরিচিত বিশেষ ধরণের চেক কাপড়কে সেখানকার মোটিফ হিসেবে তুলে ধরেন ওয়াল্টার স্কট। শুধু তাই না, নাদুস-নুদুস, ভুড়িওলা নাদুগোপাল রাজাকে খাটো কিল্ট (টারটান বস্ত্রে তৈরি পুরুষের জন্য স্কটল্যান্ডের বিশেষ ধরণের স্কার্ট) পরতেও রাজি করাতে পারেন তিনি।

নিজ সময়ে জাতীয়সম্পদ হয়ে ওঠেন তিনি, একইসাথে হয়ে ওঠেন খ্যাতিমান এবং সফল। বর্তমানকালে সম্ভবত হ্যারিপটারের লেখক জে কে রাওলিংয়ই কেবল স্পর্শ করতে পেরেছেন এমন সৌভাগ্য।

বিপণনের যাদু বা কলমের মধ্য দিয়ে তাঁর ক্ষুরধার প্রতিভার বিকিরণকে ছাড়িয়ে গেছে আজকের দিনে স্কটের প্রাসঙ্গিকতা। নিজ সময়ে স্কট যখন ক্ষমতা ও সম্মানের শীর্ষে বিরাজ করছিলেন ঠিক তখনই তার জীবনে নেমে আসে আর্থিক-ধস। আজকের যুগের আর্থিক বা ব্যবসাক্ষেত্রের মহারথীদের মতই হঠাৎ করে যেন বিনামেঘে বজ্রপাতের মত ঘটে স্কটের পতন।

স্কটের বিখ্যাত উপন্যাস আইভানহো ও সেটির বাংলা অনুবাদের প্রচ্ছদ

প্রতি প্রজন্ম নিজেদের সমস্যাগুলোকে একক ও অনন্য ভাবতে পছন্দ করে। নজিরহীন সরকারি ঋণ গ্রহণ, সুদের নিম্নহার এবং সহজে ধার পাওয়ার সুযোগ – সব মিলিয়ে আমাদের এসময়টা হলো কর্জ নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। কোম্পানিগুলো নিজের সম্পদ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে নিজেদের নিয়ে আকাশ ছোঁয়া মূল্যায়ন সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরে। অতিমাত্রায় গ্রাহক হতে লালায়িত করার লক্ষ্য অর্জনে একাজটি করা হয়। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে যেমন সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা যায় তেমনই তারচেয়েও কম সময়ে সর্বস্ব হারিয়ে পথে নেমে যেতে হতে পারে। সত্যি বলতে কি, এসত্য মেনে নিয়ে স্কট হয়তো দুঃখজনকভাবে স্বীকৃতিসূচক মাথা নাড়াতেন !

উনিশ শতকের প্রথম ২৫ বছরে এসব কিছুর উপস্থিতি দেখতে পাওয়া  গেছে। হালে একটি গল্প-গাথায় এর প্রতিচ্ছবি মেলে। এতে এখন বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে যে অশুভ মাতামাতি চলছে তার একটি প্রতিচ্ছবিও উঠে  এসেছিল যদিও তখন দুনিয়া এই ডিজিটাল মুদ্রা থেকে শতবর্ষ দূরে। গল্পের নায়ক হলো প্রতারক ম্যাকগ্রিগর যে মধ্য আমেরিকার কল্পিত একটি দেশের মুদ্রা হিসেবে ‘পোয়াইস’কে মানুষের সামনে প্রচার করতে থাকে। ‘পোয়াইস’বন্ড কেনার জন্য দলে দলে বিনিয়োগকারীরা ভিড় জমাতে থাকে। ভবিষ্যতে বসতি স্থাপনে আগ্রহীদেরকে তাদের স্টারলিংয়ের বিনিময়ে ‘পোয়ইসডলার’কিনতে রাজি করানো হয়। ঝাঁকে ঝাঁকে ঘাতক মশাভর্তি জলাভূমিতে এসব হতভাগারা দলে দলে প্রাণ হারায়। অন্যদিকে নানা দুর্ভোগ পোহানো সত্ত্বেও বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো ফিরে আসার আগে পাততাড়ি গুটিয়ে ম্যাকগ্রিগর পাড়ি জমায় ফ্রান্সে। সেখানে আবারো জালিয়াতির একই জাল বিছানোর চেষ্টায় নামে সে।

এটি এমন এক সময়ের উন্মাদনা যখন স্কট বিপুলবিত্ত-বৈভব অর্জন করেন, আবার তা খোয়ান এবং পুনরায় বিপুলবিত্তের অধিকারী হয়ে ওঠেন। ১৮২৫ সালে তার আর্থিক পতনের আগে পর্যন্ত তিনি এ উন্মাদনায় সওয়ার হয়ে সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠেন। খুব কাছের কয়েকজন সহকর্মীর মতো স্কটও ফাটকা-বাজারির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন কিনা সেকথা আমাদের ঠিক জানা নেই। তবে এটি নিশ্চিতভাবেই জানা যায় যে, নিজের বিলাসী জীবন-যাপন ও সামাজিক অবস্থান বজায় রাখার জন্য ব্যাংক, পরিবার এবং বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা ধার নিতেন তিনি।

তালিসমান (১৯৮৫) ও সেটির বাংলা অনুবাদের প্রচ্ছদ

তার এই তৎপরতার সঙ্গে লেক্স গ্রিনসিলের কাজকর্মের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিজের নামেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন গ্রিনসিল। সম্পদের জোরে টরি মন্ত্রীদের কাছে সহজে যাতায়াতের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন স্কট। তবে গ্রিনসিলের মতো তিনি নিজ ব্যবসায়িক স্বার্থে সরকারের সহায়তা নেননি। গ্রিনসিলকে কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার বা ‘সিবিই’ উপাধিতে ভূষিত হতে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সহজেই নাইটহুডে ভূষিত হন স্কট। স্কটল্যান্ডের রাজমুকুটের হারানো রত্নাবলী ‘পুনরায় খুঁজে বের’ করার কাজে নেতৃত্ব দেন তিনি। এডিনবার্গ দুর্গের তলকুঠুরি বাসেলার্সে এগুলো বিনা যত্নে ফেলে রাখা হয়েছিল। ১৭০৭ সালে অ্যাক্ট অব ইউনিয়নের সময় এই উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ায় স্কটকে কৃতজ্ঞ রাজা ব্যারোনেট হিসেবে ঘোষণা করেন।

ওয়াল্টার স্কট পেশায় ছিলেন উকিল। কিন্তু আইনজীবী বা প্রাদেশিক খণ্ডকালীন বিচারকের কল্পনাও করতে পারেন না এমন সম্পদ ও সামাজিক অবস্থান তাঁকে এনে দিয়েছিল তাঁর লেখনীশক্তি। প্রথম তাঁর খ্যাতি জোটে মারমিয়ন এবং দ্য লে অব দ্য লাস্টমিনস্ট্রেল এর মতো মহাকাব্যধর্মী কবিতার মাধ্যমে। ব্যাপকভাবে এসব বই বিক্রিও হয়েছিল। এরপর তিনি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক রোমান্টিক উপন্যাস লেখেন। তাঁর প্রথম গল্প ওয়েভারলি-র নামে এর নাম রাখা হয়। স্কটের সৃষ্টি ক্ষমতা ছিল বিস্ময়কর। ১৮২৪ পর্যন্ত দশ বছরে ১৮টি উপন্যাস প্রকাশ করেন। এগুলোর মধ্যে ছিল তাঁর সবচেয়ে খ্যাতনামা উপন্যাস আইভানহো, রবরয় এবং দ্য ব্রাইড অব ল্যামার মুর

স্কটের বই বিপুল সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। আর প্রকাশকদেরকে মোটা অংকের অর্থ আগাম দিতে বাধ্য করেছেন তিনি। শেকসপিয়ারের ওপর প্রকাশিত বইয়ের জন্য ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে ৮৮ হাজার পাউন্ড স্টারলিং (এক কোটি টাকার কিছু বেশি) আগাম দেওয়ার কথা শোনা গেছে। স্কটের আগাম নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করলে এটাকে নেহায়েতই খুচরা পয়সা বলে মনে হবে! আজকের দিনের হিসাবে তিনি নিয়মিতই ১০ লাখ পাউন্ড স্টারলিং (এক কোটি ১৭ লাখ টাকা) সমপরিমাণ আগাম অর্থ দাবি করতেন। এক পর্যায়ে বইয়ের নাম বা কাহিনী কী হবে তা ঠিক না করেই চারটি বই লেখার জন্য এরকম আগাম টাকার দাবি করেন।

মারমিয়ন উপন্যাসে বিবরণ আছে ১৫দশ শতকের তৈরি এই ক্রিচটন দুর্গের

আজকের দিনে নিজ প্রচেষ্টায় হয়ে ওঠা ধনকুবেরদের মতো স্কটও বিলাসবহুল জীবন কাটাতেন। সম্পত্তি ক্রয় করতেন। এডিনবার্গের নিউটাউনের অভিজাত এলাকায় তিনি তৈরি করলেন বহুতল বিশিষ্ট বাসভবন। এর সামনের দিকটা দেখতে ছিল ধনুকের মতো। এছাড়া, স্কটিশ সীমান্তের কাছে টুইড নদীর পাড়ে খোশখেয়ালিপনায় ভরপুর এক দুর্গও তৈরি করেন যার নাম অ্যাবটসফোর্ড। ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক মহলে তাঁর ঘনিষ্ঠ জানা শোনা ছিল। তৎকালীন ব্রিটেনের সবচেয়ে ধনবান ব্যক্তি, ডিউক অব বুকলেউচের সঙ্গেও ছিল তাঁর সুসম্পর্ক। প্রয়োজনে স্কট নিজের নাম ভাঙ্গিয়েই তাঁর কাছ থেকে ধার-কর্জ নিতে পারতেন।

ব্যবসা জগতে স্যার ওয়াল্টার স্কটের ব্যাপক চাহিদা থাকায় তিনি একাধারে একটি বিমা কোম্পানির গভর্নর, আরেকটির পরিচালক,  প্রযুক্তি তৈরিতে জড়িত নতুন শুরু হওয়া একটি কোম্পানির প্রধান হিসেবেও ছিলেন। তবে এ কোম্পানি ভুল প্রযুক্তি বের করেছিল এবং স্কটের নিজের তেলগ্যাস কোম্পানি ঘরবাড়ি ও রাস্তায় বাতি জ্বালানোর শক্তির যোগান দেওয়ার কাজে কয়লা কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছিল না। এছাড়াও তিনি এডিনবার্গের খ্যাতনামা রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি ছিলেন। আধুনিক অর্থনীতির জনক হিসেবে পরিচিত অ্যাডাম স্মিথসহ স্কটল্যান্ডের বিদগ্ধ ও বরেণ্যজনরা এই সোসাইটি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

[স্যার ওয়াল্টার স্কটকে নিয়ে দ্য ফাইনান্সিয়াল টাইমসের দীর্ঘ রচনার বাংলা রূপান্তরের প্রথম কিস্তি। বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like

Filter By Topic