Loading...

স্যার ওয়াল্টার স্কট: বিপদে বিপুল বিক্রমেই কলম ধরেছিলেন

| Updated: August 19, 2021 15:20:40


- এডিনবার্গে স্যার ওয়াল্টার স্কটের স্মৃতিসৌধ - এডিনবার্গে স্যার ওয়াল্টার স্কটের স্মৃতিসৌধ

[এ বছর ১৫ আগস্ট ছিল স্কটিশ ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার ও ইতিহাসবেত্তা স্যার ওয়াল্টার স্কটের ২৫০তম জন্মবার্ষিকী। ৬১ বছরের জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়তায় ভরপুর। তাঁকে নিয়ে ফাইনান্সিয়াল টাইমসের দীর্ঘ রচনার বাংলা রূপান্তরের তৃতীয় ও শেষ কিস্তি এখানে দেয়া হলো। বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

স্যার ওয়াল্টার স্কটের যুগে ব্রিটেনে তহবিল খাটিয়ে টাকা উপার্জনের নানা সহজ পথ ছিলো। লন্ডনে বিদেশি সরকারগুলো নিয়মিত বন্ড বা ঋণপত্র ছাড়ত। দক্ষিণ আমেরিকায় নিজেদের সোনা-রূপার খনি আছে দাবি করে অনেক কোম্পানি বাজারে লোভনীয় প্রসপেকটাস ছাড়ত। শেয়ার কেনাবেচা করতো। প্রথম দিকের বিনিয়োগকারীরা পরবর্তীতে সোজা-সরল বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতো। গ্যাসের আলো বা রেললাইন বসানো, বাষ্পচালিত জাহাজ সার্ভিস চালু করাসহ নানা চমকদার ও নতুন প্রযুক্তিখাতের শেয়ারও ছাড়া হতো। এ ছাড়া,  স্টক ব্রোকার বা ফাটকাবাজারি নামের আরেকদল আর্থিক নতুন পেশাজীবী সৃষ্টি হলো। এদের কাজ ছিলো, কোম্পানির কাগজের ভিত্তিতে নগদ বিনিময়ের সুবিধা করে দেওয়া।

শিল্পীর তুলিতে স্যার ওয়াল্টার স্কট (আগস্ট ১৫, ১৭৭১- সেপ্টেম্বর ২১, ১৮৩২)

ব্রিটেনের তৎকালীন অর্থনীতিকে ঘিরে এ বিশাল বুদবুদ ফেটে যায় ১৮২৫ সালে। টাকা সরবরাহে ভীষণভাবে বেড়ে যাওয়ায় ভীত হয়ে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বিনা কওয়া-বলায় ঋণ কার্যক্রমের ওপর কড়াকড়ি চাপাল। অনেক প্রান্তিক মহাজনের ‘ডিসকাউন্টিং ট্রেড বিলবা ‘ছাড়কৃত ট্রেড বিলঅন্যকথায় বাণিজ্য বাট্টা মেনে নিতে অস্বীকার করা হলো। ফলে দ্রুত অর্থনৈতিক ধস নামল। এতে কুপোকাত হয়ে গেল ৬০টি ইংলিশ ব্যাংক।

উনিশ শতকে স্কটল্যান্ডের ব্যাংক ব্যবস্থা ২০০৮ সালের মতো ছিলো না বরং খুবই জোরালো ছিল। ২০০৮ সালে ব্রিটেনের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দুই ব্যাংক হলো, ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড এবং রয়েল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড। উনিশ শতকে দেশটির উত্তর সীমান্তে সাকুল্যে তিনটি ক্ষুদ্র ব্যাংক  অর্থনৈতিক ধসে পড়েছিল। তারপরও স্কটের শেষ রক্ষা হলো না। লন্ডনে তাঁর অংশিদার জোসেফ রবিনসন বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর জল্পনা-কল্পনায় মশগুল ছিলেন। কিন্তু মূল্যপতনের মধ্য দিয়ে তাঁর সে আশার গুড়ে বালি পড়ল। নিজ শেয়ার বিক্রি করতে না পেরে কর্জের টাকা শোধ দিতে ব্যর্থ হলেন তিনি। কনস্টেবলের সঙ্গে হার্স্ট রবসন্সও মেয়াদ উত্তীর্ণ সর্পিল বিলের ঘুর্ণাবর্তে বাধা পড়লেন। তাঁরা একে অন্যেকে ঋণ নেওয়ার সময় নিশ্চয়তা দিয়েছেন। এই দুইজনের প্রত্যেকেই মূল্যহীন বিল দেখিয়ে অনেক ব্যাংক থেকে দুহাতে টাকা ধার করেছেন। এদিকে নতুন করে ধার যোগাড়ের জন্য তারা যতোই হন্যে হয়ে উঠতে থাকেন ততোই তাদের মুখের ওপর একের পর এক দরজা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। ১৮২৫ সালের গোট শীতকাল টলমল অবস্থার মধ্য দিয়ে কাটালেন তাঁরা। কিন্তু ১৮২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই তাদের পুরো তাসের ঘরটি ভেঙ্গে পড়ল।

১৮২৫ সালে আর্চবিল্ড কনস্টেবল কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি বন্ড যা তিনি ওয়াল্টার স্কটকে দিয়েছিলেন

এবারে স্কটের মধ্যে দেখা দিল অপরাধ বোধ। তাঁকে দেউলিয়া ঘোষণার অবমাননাকর অবস্থায় পড়তে হবে বলে আশংকা করতে থাকলেন। এটি ঘটলে তাকে আইনগত দায়-দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। ওয়্যারকার্ডের সাবেক চিফ অপারেটিং অফিসার এমন পরিস্থিতিতে বিদেশে ভেগে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এদিক স্ত্রী মারা যাওয়ায় স্কটের হতাশাবোধ আরো তুঙ্গে ওঠে। কিন্তু না এ অবস্থার মধ্যেও দাঁড়িয়ে স্কটের পূর্বসুরীদের নিয়ে বীরত্বের যে কাল্পনিক গাঁথা রচিত হয়েছে তা নিজের মধ্যে উস্কে দিলেন। ডাইরিতে স্কট লিখলেন, “কান্নায় আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে কিন্তু তাতে তো কোনো ফায়দাই হবে না। না, লড়াই ছাড়া পিছিয়ে আসবো না।পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়ে স্কটের পূর্বপুরুষরা অসিকে শেষ ভরসা করেছেন। কিন্তু ওয়াল্টার জীবনের এমন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বিপুল বিক্রমে মসী বা কলমকেই তুলে নিলেন।

তাঁকে যেনো দেউলিয়া ঘোষণা করা না হয় পাওনাদারদের কাছে করজোড়ে সে অনুরোধ জানান স্কট। তাঁর আইনজীবী ব্যাংকগুলোকে একটি ট্রাস্ট গঠনে সম্মত করান। এ ট্রাস্টের কাছে তাঁর সব সহায়-সম্মদ এবং ভবিষ্যতের আয়ও গচ্ছিত রাখা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি সব ধারকর্জ মিটিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। একই সাথে নিজের বাসভবন এবং তাঁর সব মালামাল বিক্রি করে দেয়া হলো। জন গিবসনকে নিয়ে নিজ বাসভবনে খাবার খেতে বসে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হলো তাঁকে।  খাবার টেবিলে যে সব বাসন-কোসন ব্যবহার করা হচ্ছিল তা খুবই সস্তা দামে কিনে এনেছেন গিবসন। টু্‌ইড নদীর তীরে খেয়ালিপনায় ভরপুর অ্যাবটসফোর্ড দুর্গটা তাঁর বড় ছেলেকে দিয়েছিলেন স্কট। সেটা বিক্রির হাত থেকে রক্ষা পেলো। পাওনাদাররা স্কটকে তাঁর বাকি জীবন সেখানে কাটানোর এবং সেখান থেকে লেখালেখি করতে দেওয়ার ব্যাপারে রাজি হলেন। এমনকি দুর্গের মদ ও সুরাপূর্ণ তলকুঠরি বা সেলার স্কটকে রাখতে দেওয়ার অনুমতিও দেওয়া হলো।

জীবনের শেষ ছয় বছরে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। এ ছয় বছরে তিনি নয়টি বই লেখেন। এর মধ্যে উডস্টক নামের উপন্যাস এবং নেপোলিয়নকে নিয়ে বহুখণ্ডের বইও রয়েছে। ১৮৩২ সালের মধ্যে বকেয়া ঋণের ১৫ শতাংশ শোধ করলেন। ১৮৩২ সালে স্কট মারা যাওয়ার আগে এ ঋণের পরিমাণ অর্ধেকে এসে দাঁড়ায়। ১৮৪৭ সালে তাঁর বাকি বইয়ের গ্রন্থস্বত্ব বিক্রি করে ঋণের পুরো টাকাই শোধ করা হয়। অন্যদিকে কনস্টেবল, ব্যালান্টাইন এবং হার্স্ট রবিনসনের পাওনাদাররা তাদের দেনার মাত্র ১০ শতাংশ উদ্ধার করতে  পেয়েছিলেন।

 স্কটের উডস্টক উপন্যাসের প্রচ্ছদ, ১৮৭১ সালের সংস্করণ

স্কটের সুনাম শেষপর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকল। শুধু তাই না, তাঁর পাওনাদাররা কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁর জন্য গথিক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। এডিবার্গের প্রিন্সেস স্ট্রিটে আজও এটি সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। স্কটের রচনাশৈলী ছিল বিরক্তিকর রকমের পল্লবিত।  এ কারণে তাঁর লেখার ভঙ্গিমা লেখকমহলে জনপ্রিয় হয়নি। কিন্তু পাঠকদের কাছে তাঁর লেখার জনপ্রিয়তা উত্তরসূরি লেখদের পথকে সুগম করে তুলেছিল।

অর্থের প্রতি নির্লজ্জ মোহ সত্ত্বে স্কট দেখিয়ে গেছেন যে গুরুগম্ভীর লেখাও বাণিজ্য সফল হতে পারে। একটা বই লেখার প্রস্ততি হিসেবে ‘প্রকাশকের কাছ থেকে আগাম টাকাকড়িনেওয়ার পথও তিনিই দেখান। শুধুমাত্র তাঁর এ কালজয়ী তৎপরতার জন্য লেখককুল তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবেন। এ কারণেই স্কটের ২৫০তম জন্মদিন উদযাপন এবং তাঁকে গভীর ভাবে স্মরণ করা আজও অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

[সমাপ্ত]

আরো পড়ুন:

১. স্যার ওয়াল্টার স্কট: ‘ঋণ করে ঘি খাওয়ারউন্মাদনা

২. স্যার ওয়াল্টার স্কট: সহজ ঋণ ও সৃজনশীলতার গল্প

Share if you like

Filter By Topic