কারোই জানা নেই চলমান ঘটনার শেষ কীভাবে হবে। তবে এর শুরু কীভাবে হয়েছে তা সবারই ভালোভাবে জানা আছ। ভ্লাদিমির পুতিন বিনা উসকানিতে নিরীহ একটি দেশের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করেন। ১৯৪৫-এর পর ইউরোপের মাটিতে সবচেয়ে জঘন্য আগ্রাসন তিনিই চালালেন। এ তৎপরতাকে ন্যায্যতা দেওয়ার লক্ষ্যে পঞ্চমুখে ছড়ালেন মিথ্যার বেসাতি। তিনি এখন অন্তত এ সময়ের জন্য গোটা পশ্চিমকে তাঁর বিরুদ্ধে একত্রিত করে তুলেছেন। শান্তি এবং কাপুরুষতাকে গুলিয়ে ফেলার কাজটি স্বৈরশাসক হিসেবে প্রথম করেননি পুতিন। বরং তিনি পশ্চিমী মানুষদের ক্ষোভকে জাগিয়ে তুলেছেন। ফলে রাশিয়ার গলায় যে নিষেধাজ্ঞার কণ্টক-মালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে তা সঠিক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এ ছাড়া, এটি চিত্তাকর্ষকও হয়ে উঠেছে।
দুনিয়ার মানুষদের মধ্যে পুতিনকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে গণ্য করা যেতেই পারে। রাশিয়ার হারানো সাম্রাজ্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে হয়ত তিনি আত্মোৎসর্গ করেছেন। এতে নিজ দেশের মানুষের কপালে কী নেমে আসবে তা নিয়ে হয়ত মাথা ঘামান না তিনি। সর্বোপরি তাঁর বিশাল ভাণ্ডার ভরে আছে পরমাণু বোমায়। তারপরও যতই ঝুঁকির হোক না কেন, পুতিনকে রুখে দাঁড়াতেই হবে। কেউ কেউ অবশ্য বলবেন, পশ্চিমাদের দোষ-ত্রুটিভরা তৎপরতারই পুতিনের কর্মকাণ্ডের নিয়ামক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ন্যাটো বিস্তারের সিদ্ধান্তের ঘটনাকে তুলে ধরা হবেই। ঘটনাটা উল্টা। রুশ শাসনের সাথে হাড়ে হাড়ে পরিচিত যেসব দেশের তারাই ন্যাটো বিস্তারের কর্মসূচিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। রাশিয়া এবং তার সাবেক অঞ্চলগুলোর মধ্যে ইউরোপের জন্য একটি সুরক্ষিত সীমান্তের একান্ত প্রয়োজন। ভুল সীমান্ত রেখার দিকে থাকাটাই ইউক্রেনের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হয়ে উঠেছে। মুক্ত হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করা ছাড়া আরো কোনো হুমকিই রাশিয়ার জন্য সৃষ্টি করেনি দেশটি। আর এতেই হুমকির মুখে পড়ে রাশিয়া।
নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও সচরাচর তা কড়াকড়িভাবে কার্যকর হয় না। তবে এবারে যে সব নিষেধাজ্ঞার কণ্টক-মালা রাশিয়াকে পরানো হয়েছে তার বেলায় তেমনটি ঘটবে না। গত মাসের ২২ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সার্বভৌম ঋণের দ্বিতীয়স্তরের বাজারের (সেকেন্ডারি মার্কেট) ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। একই দিনে জার্মানি বিতর্কিত নর্ড স্ট্রিম ২ গ্যাস পাইপলাইনের অনুমোদন স্থগিত করেছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জি৭ এর অন্য সদস্যদেশগুলো রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেনের ক্ষমতা সীমিত করেছে। এর মাত্র দুই দিন পরই সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে বেশ কয়েকটি রুশ ব্যাংককে সরিয়ে দেওয়া হয়। জব্দ করা হয় ব্যাংক অব রাশিয়ার সম্পদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকাটির সাথে লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়।
খতিয়ে বিশ্লেষণ শেষে ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স এ সব নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বলে, “আমরা প্রত্যাশা করছি, সাম্প্রতিক দিনগুলিতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা রুশ আর্থিক ব্যবস্থার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে গোটা দেশটির উপর নাটকীয় প্রভাব ফেলবে।” দেশটির ৬৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নগদ মজুদের বড় একটি অংশ অকেজো হয়ে যাবে। এরই মধ্যে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার দ্বিগুণ করতে হয়েছে। তাই ব্যাংকের বিরুদ্ধে এখনি অভিযোগ উঠছে যে জ্বালানি খাত বাদে রুশ অর্থনীতি যথেষ্ট পরিমাণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

অবশ্য, নিষেধাজ্ঞার সব যাতনা রাশিয়া একাই ভোগ করবে না। তেল ও গ্যাসের খরচ দীর্ঘ সময়ের জন্যেই বাড়বে। এতে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ হবে আরো কঠোর। বাড়বে খাবারের দামও । রাশিয়া যদি, নিজের জন্য চড়া মূল্যের বিনিময়েও, নিজ দেশের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরো গুরুতর হবে। ইউরোজোন এবং সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট জ্বালানি শক্তির ৯.০ (নয়) শতাংশ উৎপন্ন করে রুশ প্রাকৃতিক গ্যাস। তবে শীতকালেই এর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। আর যাই হোক, শীত ঋতু এ বছর অন্তত পেরিয়ে যাচ্ছে।
এ সব সুনির্দিষ্ট প্রভাবের বাইরেও যুদ্ধ, পারমাণবিক হুমকি এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সংমিশ্রণে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পায় ব্যাপকভাবে । আর্থিক নীতিকে আরো কঠিন নাগপাশে বাঁধার সিদ্ধান্ত নিতে যেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোর মুশকিল বাড়বে। এ ছাড়া জ্বালানির ধকল সামাল দেওয়ার চেষ্টায় লবেজান সরকারগুলোর বেলাও একই কথাই খাটে।
দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রভাবের পথ ধরে হাঁটবে ভূরাজনীতি। ফলাফল যদি পশ্চিম এবং রুশ-চীন কেন্দ্রিক জোটকে কেন্দ্র করে মধ্যে গভীর এবং দীর্ঘ বিভক্তি হয় তা হলে অর্থনৈতিক বিভাজন সেখানেও বর্তাবে। প্রত্যেকেই বিতর্কিত এবং অবিশ্বস্ত অংশিদারদের ওপর নির্ভর করা থেকে যতদূর সম্ভব দূরে থাকার জন্য হন্যে হয়ে উঠবে। এমন ধারার দুনিয়ায় অর্থনীতির ওপর রাজনীতি বিজয়ী হয়। বৈশ্বিক পর্যায়ে অর্থনীতি নতুন ভাবে সাজানো হবে। যুদ্ধকালীন সময়ে রাজনীতি সবসময়ই অর্থনীতিকে টপকে যায়। এটি কী করে ঘটে সে কথা আমরা এখনো জানি না।
ইউরোপ অবশ্যই সবচেয়ে বেশি বদলে যাবে। জার্মানি একটি বিশাল পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি এও স্বীকার করেছে তার শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থান অর্জন করা সম্ভব নয়। জার্মানিকে পুনর্গঠনবাদী রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম এমন শক্তিশালী ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে হবে। জ্বালানি নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসার মতো বিশাল তৎপরতাকে এর অন্তর্ভুক্ত করত হবে। দুঃখজনক ভাবে, ইউরোপকে বলতে হয়, পুতিনকে ডোনাল্ড ট্রাম্প “প্রতিভা” হিসেবে গণ্য করেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ততদিন নির্ভরযোগ্য মিত্র হবে না যতদিন রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্ব দেবেন ট্রাম্প। অন্যদিকে ব্রিটেনকে স্বীকার করতে হবে যে দেশটি সবসময়ই একটি ইউরোপীয় শক্তিতে পরিণত হবে। পূর্ব ইউরোপীয় মিত্রদের সর্বোপরি মহাদেশটির প্রতিরক্ষার জন্য ব্রিটেনকে আরো গভীর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করতে হতে হবে। এই সব বিষয় সমাধান হওয়া একান্ত ভাবে প্রয়োজন এবং এ জন্য মোটা অর্থ খরচ করতে হবে।
এই নতুন বিশ্বে চীনের অবস্থানকে ঘিরে উদ্বেগের কেন্দ্র রচিত হবে। চীনের নেতৃত্বকে বুঝতে হবে যে রাশিয়াকে সমর্থন করা হলে তা এখন পশ্চিমা দেশগুলির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে খাপ খাবে না। অন্যদিকে, ইউরোপের কৌশলগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নীতির বিষয়টিও থাকতে হবে। চীন যদি পশ্চিমের বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য কর্তৃত্ববাদী নতুন অক্ষের ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পশ্চিমকে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বিভাজনই মেনে নিতে হবে। ব্যবসা জগতকে এদিকে নজর দিতে হবে।
শান্তিপূর্ণ গণতন্ত্রের সন্তানদের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এমন এক তৎপরতা - যা পশ্চিমের নাগরিকরা ভুলে যেতে পারে না। যারা এ যুদ্ধের শুরু করেছে বা যারা সমর্থন করেছে তাদেরকে পশ্চিম ক্ষমা করতে পারে না। পশ্চিমের অতীতের নিজস্ব স্মৃতি অবশ্যই একে ভুলতে দেবে না। পশ্চিম একটি নতুন মতাদর্শগত দ্বন্দ্বে পড়েছে। এবারে আর কমিউনিস্ট বনাম পুঁজিবাদী নয়। বরং অপ্রতিরোধ্য স্বৈরাচার এবং উদার গণতন্ত্রের দ্বন্দ্ব। নানা দিক থেকে এটি শীতল যুদ্ধের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। পুতিনের হাতে নিয়ন্ত্রণহীন এবং স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা রয়েছে। যতক্ষণ তিনি ক্রেমলিনে থাকবেন, ততক্ষণ বিশ্ব বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেই থাকবে। চীনের শি জিনপিংয়ের বেলায়ও এটি সত্য কিনা তা এখনো স্পষ্ট নয়। এখনো এটি শেখার সময় আছে।
এই সংঘাত রুশ আমজনতার সাথে নয়। সভ্যতার ক্ষেত্রে দেশটির আমজনতার অবদান আছে। কাজেই তাদের যোগ্য রাজনৈতিক শাসনের আশা পশ্চিমের করা উচিত। চলমান সংঘাতটি দেশটির বিরাজমান শাসন ব্যবস্থার সাথে দ্বন্দ্ব। রাশিয়া অপরাধচক্র দ্বারা শাসিত দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এমন প্রতিবেশীর সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলো শান্তিতে থাকতে পারে না। এই আক্রমণ অবশ্যই সহ্য করা হবে না, কারণ এ আগ্রাসন সফল হলে তা সকলকে হুমকির মুখে ফেলবে। আমরা একটি নতুন বিশ্বে বসবাস করছি। তা বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সবাইকে তৎপর হতে হবে।
[লেখক ফাইনান্সিয়াল টাইমসের প্রধান অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। মূল ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]
