Loading...

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরে মুক্তিযুদ্ধ

| Updated: March 29, 2021 22:09:17


স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরে মুক্তিযুদ্ধ

বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারণে বুকের ভেতর কী নিখুঁত মমতা অনুভূত হয়; মনে পড়ে যায়, সংস্কৃতিপ্রেমী বাঙালির বিয়োগ হওয়া প্রতিটি রক্ত ফোঁটা, আর্তনাদ আর নির্মমতার ডায়েরি।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে সুন্দর বিষয়টি হলো, সর্বস্তরের মানুষের প্রতিপক্ষ ছিল এক। ফলে, প্রতিটি মানুষ তার স্ব স্ব সার্মথ্য খরচে বিন্দুমাত্র দ্বিধা রাখেনি।

স্বাধীনতা'র তৃষ্ণাকে আরও বেশি তীব্র করে তুলতে, যুদ্ধকালীন সময়ে নির্মিত কিছু সঙ্গীত, আজও আমাদের পুরোদস্তুর বুক চিতিয়ে লড়াই করার উদ্দীপনা জাগায়। মহান এই মার্চ মাসে আমরা আমাদের আজকের আয়োজনে একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত কিছু দুর্দান্ত সংগীতের আদ্যোপান্ত আলোচনা করব।

 

জয় বাংলা , বাংলার জয়

হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়

কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে ,

নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময় !

মুক্তিযুদ্ধে ভীষণ অনুপ্রেরণাদায়ক অনবদ্য গানটির কথা লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, সুর করেছেন প্রয়াত আনোয়ার পারভেজ। আত্মা আন্দোলিত করা এই সুন্দর সৃষ্টির পেছনের গল্পটি ছিল অন্যরকম। ১৯৭০ সালে যখন ফকরুল আলম পরিচালিত 'জয় বাংলা' সিনেমাটির সঙ্গীত পর্যায়ে কাজ চলছিল, তখন সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বটুকু ন্যস্ত হয় আনোয়ার পারভেজের কাঁধে। বন্ধু গাজী মাজহারুল আনোয়ার লিখলেন— 'জয় বাংলা, বাংলার জয় ' গীতিকাব্য।

কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতিতে সঙ্গীত উপযোগী কোনো স্থান পাওয়া বড় দুষ্কর ছিল। আর তাই বর্তমান সংসদ ভবন বিপরীত রাস্তায় পাশাপাশি হন দুই বন্ধু। গানের কথা নিয়ে যেন কিছুটা ইতস্তত আচরণই করছিলেন গীতিকার। অবশ্য বন্ধু পারভেজের একটি ধমকে সব দ্বিধা কেটে গিয়েছিল। মাত্র ২০ মিনিট বিনিয়োগে সুরপর্ব চুকিয়ে ফেলেন সুরকার।

গানটি সমবেত কণ্ঠে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রথম ও পরবর্তী সময়ে বেতারের সূচনা সঙ্গীত হিসেবে প্রচারিত হয়। যুদ্ধকালীন অনুপ্রেরণার দাবি মিটিয়ে আজ অবধি 'জয় বাংলা, বাংলার জয়' সমভাবে আমাদের উজ্জীবিত করে।

 

শোনো একটি মুজিবরের থেকে

লক্ষ মুজিবরের কন্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি

আকাশে বাতাসে ওঠে রণি

বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ

গানটিকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ভাষণের প্রতিবিম্ব হিসেবে গণ্য করা যায়। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বয়ানে উচ্চারিত সমস্ত মশালদৃপ্ত কথা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখেছিলেন এই গান। আবশ্যিক কর্মের মতো ৭১ এর কোনো এক বিকেলবেলা আড্ডা জমলো কেটলি ঘরে বা পরিচিত কোনো এক চা-স্টলে। উপস্থিত, সুরকার অংশুমান রায়, গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, সঙ্গীত শিক্ষক দিনেন্দ্র চৌধুরী ও আকাশবাণী কেন্দ্র অধিকর্তা হিসাবে অবসর নেওয়া উপেন তরফদার। সেই সময়ে তুমুল ব্যবহৃত টেপ রেকর্ডারে তরফদার সাহেব বাজালেন ৭ মার্চের ভাষণ।

আড্ডায় তখন বাংলাদেশ নিয়ে নানাবিধ আলাপচারিতা চলছিল। কিন্তু, অন্যমনস্ক গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার তখন চারমিনার সিগারেটের ভেতরে থাকা ছোট কাগজে কিছু একটা লিখছিলেন। হঠাৎই, অংশুমান রায়কে দেখিয়ে বললেন, “চলবে?”।

রায়বাবু, 'শোনো একটি মুজিবরের থেকে' গীতকবিতাটির আগাগোড়া চোখে লেপ্টে আত্মিক লোভ সামলাতে পারলেন না। খুব বিনয় করে বললেন, “আপনি এটা আর কাউকে দিতে পারবেন না গৌরীদা। আমি সুর করব, আমি গাইব”।

মাত্র এক ঘণ্টা খরচ করে অংশুমান রায় সেদিনই সুরের কাজ চুকিয়ে গানটিকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন নিজ কণ্ঠে। পরবর্তী সময়ে হিন্দুস্থান রেকর্ড স্টুডিওতে রেকর্ডের কাজ শেষ করে; মি.তরফদারের পরামর্শে, আকাশবাণীতে প্রচারিত রেসকোর্স ভাষণের ফাঁকে ফাঁকে বাজতে থাকে তখনকার সময়ে তুমুল জনপ্রিয় এই গানটি। পরে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী প্রয়াত আব্দুল জব্বারসহ আরও অনেকের সমবেত কণ্ঠে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতারের শুভ সূচনার পর গানটি একইভাবে প্রচারিত হয় । ৭১ পেরিয়ে আজকের ২১ অবধি- ঐতিহাসিক কালসাক্ষী গানটি, এখনও অন্যায়ের বিপরীত প্রতিবাদে তারুণ্যের গভীরে আরও হাজারো মুজিবের জন্ম দেয়।

 

তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে

আমরা ক'জন নবীন মাঝি হাল ধরেছি শক্ত করে রে...

তীরহারা সাগরের ঢেউয়ে যখন কোনো নবীন মাঝি হাল মনস্থির করে, তখন দ্বিধাহীন বলে দেওয়া যায়, একটি সুন্দর ভোর ছাড়া এঁদের প্রাপ্তির ঝুলিতে আর কোনোকিছুই যেন ধরে না। সুষম অনুপ্রেরণাদায়ক এমন নান্দনিক কথাকে একই মালায় গাঁথতে পেরেছিলেন; একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, গীতিকার ও সুরস্রষ্টা আপেল মাহমুদ। ১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষদিকে অনন্য এই গানটির কথাপর্ব সেরে ফেলেন গীতিকার। পরিশেষে, সুর অংশে ইতি টেনে; রথীন্দ্রনাথ রায়, আপেল মাহমুদ ও সহশিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে গানটি স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারের পর তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যুদ্ধ চলাকালীন আপেল মাহমুদ সর্বাধিক ৩১টি গান পরিবেশনে অনন্য রেকর্ডটি বাগিয়ে নেন।

 

পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে

রক্ত লাল রক্ত লাল

শত্রুর সমস্ত নিশান ভেঙে ফেলা যখন জরুরি হয়ে পড়ে, যখন অনস্বীকার্য হয়ে পড়ে মুক্তির অভিযান; প্রলয়ংকরী সব বাধা ডিঙিয়ে নিজস্ব আকাশে একটি শান্তিময় জ্বলজ্বল সূর্য উদয়ের ক্ষণ উপস্থিত হয়, ঠিক তখনই কবির কলম বলে ওঠে, 'পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল'। আশা জাগানিয়া এই গানটি ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বসে রচিত হয়। সমবেত কণ্ঠে গাওয়া গানটির কথা লিখেছেন গোবিন্দ হালদার ও সুর করেছেন সমর দাস ।      

সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে পড়াশোনা করছেন

ই-মেইল: sanjoydatta0001@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic