বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন থেকেই ভাবতে হয়, "আমি স্নাতক শেষে কী করব?"-এ প্রশ্নের খুব গোছানো একটি উত্তর। তবে গোছানো উত্তর দিতে হলে হুটহাট দেয়া যায় না, উত্তর ভাবতে হয় অনেক আগে থেকেই। স্নাতক পর্যায় শেষে অনেকে তাদের বিষয়গতগণ্ডির বাইরে থেকে কিছু করতে চান, অন্য কোনো বিষয় নিয়ে পড়ালেখা করতে চান। অনেকে তাদের স্নাতকের বিষয়টিতে উচ্চতর শিক্ষা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। অনেকে উচ্চশিক্ষা নেয়ার যে লক্ষ্যটি ছিল, তা বদলে নিজের জন্য জীবিকার সন্ধান করেন। এগোনোর জন্য রাস্তা রয়েছে অনেকগুলো, কিন্তু সে অনুযায়ী নিজেকে কতটা প্রস্তুত করেছেন আপনি?
‘শর্টকাট’ আসলে কাজে লাগে কি না, তা একটা ভাববার বিষয়। স্নাতকোত্তর শিক্ষা আপনার কাঙ্খিত চাকরি পেতে কতটা কাজে লাগবে, সে ব্যাপারে দরকার বিশ্বস্ত কারো মতামত; যার আপনার ক্যারিয়ারের বিষয়টিতে যথেষ্ট জ্ঞান আছে। তাছাড়া আপনার দরকার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। লেখক লেইলা রবার্টস তার ‘আফটার ইউ গ্রাজুয়েট: ফাইন্ডিং অ্যান্ড গেটিং ওয়ার্ক ইউ উইল এনজয়’ বইতে প্রশ্ন তুলেছেন একই ক্ষেত্রে। আপনার যত বেশি ডিগ্রি, তত দ্রুত চাকরি- এ ভাবনাকে গ্রহণযোগ্যতা না দেয়াই ভালো।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এ ধাপটি অনেকটা লম্বা, বেশ খানিকটা পথ হেঁটে যেতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পেরোতে। তাও আবার, জীবনের সবচেয়ে তরুণ সময়টা কেটে যায় এই পথে হাঁটতে হাঁটতেই। আপনার নিজেকে নিয়ে যে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয়, সেটা স্নাতকপড়ুয়া জীবনেই হয়। আপনি কীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, জীবনে কঠিন সময়গুলোতে সমাধান কীভাবে করেছেন এবং আপনার সমাধানগুলোয় আপনি নিজে খুশি হয়েছেন কি না- সেগুলো ভেবে আপনার উচ্চশিক্ষার পথে পা বাড়ানো উচিত।
"স্নাতক শেষে আমি কী করব?" - এই প্রশ্নের সামনে হয়তো পড়তে হতে পারে যেকোনো সময়, সেটা হোক কোনো ইন্টারভিউ বোর্ড বা ব্যক্তিগত জীবনে কারো সাথে আলাপচারিতায়। আপনার মেধা, দক্ষতা, আগ্রহ, পরিশ্রম করার মানসিকতা ইত্যাদি বিষয় এখানে অনেক প্রভাব ফেলে। সেহেতু, আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময়টাতে নিজেকে কতটা জেনেছেন, আপনার পড়বার বিষয় আপনাকে কতটা প্রভাবিত করেছে- এই জিজ্ঞাসাগুলোর উত্তর থাকাটা জরুরি। কারণ, উচ্চশিক্ষা সময়সাপেক্ষ এবং দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা একটি ব্যায়সাপেক্ষ ব্যাপারও বটে।
অনেকে হয়তো ঠিকভাবে বুঝেও উঠতে পারেননি, স্নাতকে পড়ার সময়টুকু কীভাবে আপনার আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আপনি নিজেকে মাস্টার্সে তৈরি করতে পারবেন কি না, সে চিন্তা করে সামনে এগোনো উচিত। মাস্টার্সে মূলত পড়াশোনার পাশাপাশি থিসিস করা হয়, এবং সময় পাওয়া যায় অনেক কম। মনে জমা থাকে অনেক প্রশ্ন। আজকের এ লেখায়, চলুন সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেয়া যাক।
কীভাবে এগোবেন?
জীবনে নিজেকে কোন পর্যায়ে দেখতে চান, তা ভেবে ক্যারিয়ার বাছতে হবে আপনাকে। সে অনুযায়ী পড়াশোনার বিষয় ভাবতে হবে। তবে শুধু তা ভাবলেও কিন্তু কাজে দেবে না, আপনাকে সাথে সাথে ভাবতে হবে, একবিংশ শতাব্দীতে কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ পেতে হলে ব্যক্তির মধ্যে কী কী দক্ষতা থাকা প্রয়োজন এবং তা আপনার মধ্যে বিদ্যমান আছে কি না।
‘ড্রিম জব’ পাওয়ার জন্য কতটা তৈরি আপনি?
একথাও রাখতে হবে মাথায়। অনেকসময় উচ্চশিক্ষার সময়টা এসে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনের মোড় আমূল ঘুরিয়ে দিতে পারে। সমাজবিজ্ঞান পড়েও আপনার মন পর্যটন বিষয়ে আগ্রহী হতেই পারে, তখন আপনার পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে উচ্চশিক্ষার বিষয় বাছতে পারেন আপনি। ধরুন, আপনার স্নাতকের বিষয় ছিল রসায়ন। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আপনি রসায়ন নিয়ে আর পড়তে চাইলেন না। কিন্তু আপনাকে মানসম্মত ইন্টার্নশিপের সুযোগ দেয়া হলো, আপনি কি বেছে নেবেন সেটা? নাকি আপনার হাতে থাকা আরো অনেক পথের মাঝে একটিকে বেছে নেবেন; তা আপনার আর্থিক অবস্থা, আপনার কাছে কোনটা বেশি দরকারি- সেসব বিষয়ের উপরের নির্ভর করছে।
স্নাতকোত্তর ডিগ্রি কি সত্যিই নেবেন?
কোন সমীক্ষায় বিশ্বাস করবেন? সাধারণত, কোনো বিষয়ে গবেষণা একটি সীমাবদ্ধ ও নির্দিষ্ট ডোমেইনে হয়ে থাকে। চাকরির বাজারে বেতন কত, সেটা অনেকটা পরিবর্তনশীল। ধরুন, আপনি সফটওয়্যার ব্র্যান্ডে চাকরি করতে চান, আপনি জরিপে পাওয়া বেতনেই চাকরি পাবেন, সেটার নিশ্চয়তা নেই। বরং, আপনি কত দ্রুত সুযোগ লুফে নিতে পারেন, কাজে আপনি কেমন পারদর্শী, সেসব বিষয় নির্ধারণ করে দেবে চাকরির লভ্যতা। এবং আপনার পূর্ব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ একটি সিভি আপনাকে এগিয়ে রাখবে। আপনার দেশেই পড়াশোনা এগিয়ে নেয়ার ইচ্ছাটা আপনাকে স্বপ্নপূরণে এগিয়ে রাখবে কি না, তা বিচার করে এগোনো ভালো। দেশে থেকে যেতে চাইলে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মানসিকতা জোরদার করে আগাতে হবে, বাইরে পড়াশুনা করার ক্ষেত্রেও দরকার একই মানসিকতা এবং সুযোগ পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা।
সিভি এবং রেজাল্ট কি জরুরি?
হ্যাঁ, অবশ্যই জরুরি। দুটোই ভূমিকা রাখবে আপনার কাঙ্খিত বিষয় পাওয়া, দরখাস্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য। আপনার দরখাস্ত ফিল্টার করা হবে আপনার ইন্টারভিউ, দক্ষতা, ফলাফল, সিভি কতটা আপনার দক্ষতার সাথে মিল খায়- এসব বিবেচনা করেই। সাথে লেটার অব রেকমেন্ডেশন এবং রেফারেন্স বাড়তি কিছু পয়েন্ট পুরবে আপনার পকেটে। স্নাতক চলাকালীনই এজন্য সিভি, দক্ষতা বৃদ্ধি, অভিজ্ঞতা বাড়ানোর জন্য ইন্টার্নশিপ- বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখা উচিত।
গবেষণা সহকারী কি হতে পারবেন?
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট বা গবেষণা সহকারী হতে হলে দরকার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, ভালো ফলাফল, ইন্টারভিউ বোর্ডে পারদর্শিতা। সাথে সাথে আপনার সিভি, আপনি কতটা আগ্রহী, আপনার পূর্বে করা গবেষণার অভিজ্ঞতা আপনাকে এগিয়ে রাখবে। আর উপরে বলে দেয়া প্রতিটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
বাইরে পড়তে যেতে চান?
এ ক্ষেত্রে অবশ্যই থাকা-খাওয়া, ডিগ্রি পড়বার খরচ, যাতায়াত খরচ ইত্যাদি বিবেচনা করে আগানো ভালো। ডিগ্রি পড়বার পরে আপনি কী করবেন, চাকরি কোথায় নেবেন, সেটাও চিন্তা করা দরকার। আর উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনার কাছে আছে কি না, সেটিও দেখুন। কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ তো নেবেনই, তবে সেইসাথে সহপাঠী এবং তরুণদের পরামর্শ অবশ্যই নেবেন কারণ অনেকসময় আপনার চাইতে কমবয়সী কেউ আপনাকে দারুণ কিছু নতুন উপায় বাতলে দিতে পারে। নিজের সিদ্ধান্ত ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে নিন। বাস্তবমুখী রাস্তা ধরে এগিয়ে যান।
সোফিয়া নুর বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।
sofiautilitarian@gmail.com
