সবুজেই খুঁজি প্রাণের ছোঁয়া
সবুজেই ছড়িয়ে রয়েছে জীবনের মায়া।
সবুজেই তো ছিলাম বেশ
এখনো তো তাই সবুজেই আমাদের আবাস।
দিনশেষে নাগরিকতাও যেন মুখ থুবড়ে পড়ে সবুজের করতলে। বর্তমানে বিভিন্ন স্থাপত্য নির্মাণে সবুজের ব্যবহার চোখে পড়ছে। শুধু নান্দনিকতার খাতিরেই নয়, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার তাগিদেই এমন নির্মাণে মানুষ দিন দিন আগ্রহী হয়ে উঠছে।
ভবনের নির্মাণ, নকশা এবং নির্মিত ভবনগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে শক্তি, পানি তথাপি অন্যান্য উপাদানগুলোর ব্যবহারও চরম মাত্রায় পৌঁছেছে।
সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বাণিজ্যিক ভবনে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক উপাদানের ব্যবহার বা নিঃসরণ হয়ে থাকে তার অংকটা অনেকটা এরকম-
মোট শক্তির ব্যবহার - ৩৯%
বিদ্যুতের ব্যবহার - ৬৮%
পানির ব্যবহার - ১২%
নিঃসৃত বর্জ্য - ৩০%
নিঃসৃত কার্বন ডাই অক্সাইড - ৩৮%
ওয়ার্ল্ড গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবিশেষ স্থাপত্য নির্মাণে সবুজের প্রাধান্য প্রদানের ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য কাজ করে চলেছেন।
বিশেষজ্ঞরা কেবল বাস্তুসংস্থানগত কারণেই নয় বরং কাঠামোগত স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি নান্দনিক মেলবন্ধন তৈরির বিষয়টিকে আলোকপাত করে থাকেন।
এক্ষেত্রে স্থাপত্য নির্মাণে টেকসই ভবনের নকশা এমনভাবে করা হয় যা পরিবেশবান্ধব হয়ে থাকে এবং এর নির্মাণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে তা ভবনের উপর কিরূপ প্রভাব ফেলবে তাও বিবেচনায় রাখা হয়।
এক কথায়, আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ুর উপর যাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে সে বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থাপত্য নির্মাণের সময় সবুজের প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে।
স্থাপত্য নির্মাণে সবুজের প্রাধান্য দিলে অপেক্ষাকৃত কম শক্তি ও পানির ব্যবহার নিশ্চিত হবে। আর সবুজ গাছগাছালির উপস্থিতির কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে। পাশাপাশি রক্ষা পাওয়া যাবে অতিরিক্ত গরমের হাত থেকে।
কোনো একটি পদক্ষেপ গ্রহণ বা কাজের পূর্বে এর সুফল বা সুবিধাগুলো সম্পর্কে জানা থাকলে সেই বিষয়ে ধারণা যেমন সুস্পষ্ট হয় ঠিক তেমনি নিজে সচেতন হয়ে অন্যান্যকেও উদ্বুদ্ধ করা সহজ হয়ে উঠে।
স্থাপত্যে সবুজায়নের সবচেয়ে বড় উপকার হলো মানসিক প্রশান্তি। ভবনে বসবাসরত ব্যক্তিদের স্বাস্থোন্নতি এবং মানসিক প্রশান্তি, ভবনের অভ্যন্তরে বিশুদ্ধ পরিমল বাতাস নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটি জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শুধু পরিবেশগত কারণেই নয় বরং আমাদের জীবনধারণ ও সুস্থতার উপরও রয়েছে এর ব্যাপক প্রভাবে।
‘রয়্যাল ইনস্টিটিউট ফর বৃটিশ আর্কিটেক্টস’ এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১০ সালে দ্য বিল্ডিং রিসার্চ এসটাবলিসমেন্টের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ইংল্যান্ডের এক চতুর্থাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪৮,০০,০০০ বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশকিছু ত্রুটি রয়েছে যার ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি হতে পারে, যেমন - হৃদযন্ত্রের অসুখ, ফুসফুসের অসুখ, স্ট্রোক, অ্যাজমা।
ইকো ফ্রেন্ডলি/পরিবেশবান্ধব আবাসস্থলে বসবাসরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৩০ ভাগ কম থাকে।
ভবনের অন্দরে বা বাইরে সবুজের উপস্থিতির ফলে তা মানসিক দক্ষতার উপরও প্রভাব ফেলে থাকে। হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক আপস্টেট মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির এক জরিপ অনুযায়ী, সবুজের ছোঁয়াবিহীন উচ্চ প্রযুক্তি সুবিধাসম্পন্ন ভবনগুলোতে কর্মরত ব্যক্তিদের চেয়ে পরিবেশবান্ধব সবুজের সান্নিধ্য পাওয়া যায় এমন ভবনে কর্মরত ব্যক্তিদের কর্মদক্ষতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি হয়ে থাকে।
নতুন ইমারত নির্মাণ বা বসবাসরত/কর্মরত ভবনটিকে নতুন একটি রূপ দিতে চাইলে অবশ্যই সবুজের প্রাধান্যের বিষয়টিকে সর্বাগ্রে রাখা দরকার।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
