‘স্ট্রোক’ শব্দটির সাথে পরিচয় নেই আজকাল এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া খানিকটা মুশকিলই বটে। সময়ের সাথে সাথে আর জীবনযাত্রার ধরনের কারণে স্ট্রোকের আধিক্য বেড়েছে। একটা সময় ছিল যখন বয়োবৃদ্ধ মানুষদের বেলায় আমরা এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা শুনতাম। কিন্তু এখন মাঝবয়সী বা তরুণদের মাঝেও এই রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে ব্যাপকহারে।
স্ট্রোকের সংজ্ঞা দিয়েই তবে আজকের বিস্তারিত আলোচনা শুরু করা যাক-
মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হলে বা কমে গেলে ব্রেইন টিস্যুগুলো পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টিগ্রহণ করতে পারে না ফলশ্রুতিতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষগুলো মারা যেতে শুরু করে, এই অবস্থাতে স্ট্রোক হয়ে থাকে। স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে, বিকলাঙ্গতার সম্ভাবনা থাকে, কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারে, স্মৃতিশক্তির উপরও অনেকসময় প্রভাব ফেলে থাকে এবংঅকস্মাৎ মৃত্যুও ঘটতে পারে। প্রকৃতপক্ষে স্ট্রোক পরবর্তী জটিলতা নির্ভর করে মস্তিষ্কের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং মস্তিষ্কের কোন জায়গাটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার উপর। একবার স্ট্রোক হলে তার দ্বিতীয়বার স্ট্রোক হবার ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণে।
দুইভাবে স্ট্রোক হতে পারে-
এক, মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীতে রক্ত জমাট বেঁধে গেলে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে ইশকেমিয়া বলে।
এবং দুই, কোন কারণবশত রক্তের শিরা-উপশিরা ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে।
এক জরিপে দেখা গেছে আমেরিকায় প্রতি বছর ৮৬০,০০০ জন হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে প্রায় ১৫০,০০০ জন স্ট্রোকের কারণে মারা যায়। দেশটিতে রোগ মৃত্যু এবংপ্রাপ্তবয়স্কদের মারাত্মক শারীরিক বিকলাঙ্গতার জন্যও এটি একটি প্রধাণ দায়ী কারণ।
ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশনের এক তথ্য মতে, ২৫ বয়শোর্ধ্ব প্রতি ৪ জনে ১ জন জীবনের কোন না কোন এক পর্যায়ে স্ট্রোকের শিকার হয়ে থাকে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই রোগেরহার অধিক।
২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত রেকর্ডকৃত তথ্য যাচাই করে সংস্থাটি জানিয়েছে যে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা প্রায় ২০% অধিক।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও স্ট্রোকের দৃশ্যপট খুব একটা সুখকর নয়। বাংলাদেশে রোগমৃত্যুর জন্য দায়ী তৃতীয় প্রধাণ কারণ হচ্ছে স্ট্রোক। স্ট্রোক মৃত্যুহার বিবেচনায় ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪ তম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উক্ত জরিপে স্ট্রোকের প্রধাণ কারণ হিসেবে উচ্চ রক্তচাপকে দায়ীকরা হয়েছে।
শিশুরা কি তাহলে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় না? হ্যাঁ, শিশুরাও স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারে। স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর যুক্তরাজ্যে প্রায় ৪০০ শিশু স্ট্রোকের শিকার হয়ে থাকে।
স্ট্রোকের বহুল পরিচিত লক্ষণসমূহ আমাদের অবশ্যই অবগত থাকা উচিত। একদিকে মুখমন্ডল হেলে যাওয়া, কথা বলতে সমস্যা বোধ করা এবং অন্যরা কি বলছে তা ঠিক ধরতে না পারা, মুখমণ্ডল, হাত বা পায়ে অসাড়তা অনুভব করা; এক বা উভয় চোখে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসা, কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, হাঁটতে গিয়ে আচমকা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা। এর যেকোনো একটি লক্ষণ পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে কেনো স্ট্রোক হয়ে থাকে বা দিনে দিনে স্ট্রোক আক্রান্তের সংখ্যা কেনোই বা বেড়ে চলেছে? আমাদের জীবনযাত্রার প্রভাব নাকি কোনো রোগাবস্থা আমাদের এই হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে? স্ট্রোকের অন্যতম প্রধাণ কারণ হচ্ছে অ্যাথেরোসক্লেরোসিস(ধমনীর অভ্যন্তরীণ প্রাচীরে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমতে থাকে যার দরুণ রক্ত চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যায়)। বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। এছাড়া আরো অনেক কারণ রয়েছে যার ফলে সাধারণত স্ট্রোক হয়ে থাকে যেমন-ধূমপান, পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যকলাপের অভাব, স্বাস্থ্যসম্মত আহার না করা, অতিরিক্ত মদ্যপান, উচ্চ রক্তচাপ, আট্রিয়্যাল ফিব্রিলেশন, রক্তে লিপিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, স্থূলতা, লিঙ্গ (পুরুষ), ডায়াবেটিস।
আমরা আমাদের জীবনযাত্রার ধরনকে যদি নিয়ন্ত্রণ করি তাহলে প্রায় ৮০% স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্বাস্থ্যসম্মত আহার, পর্যাপ্ত শারীরিক কসরত, ধূমপান পরিহার, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সীমিত মদ্যপানের অভ্যাস এবং ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রানিয়ন্ত্রণে ঐষধ সেবন-এই ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো গ্রহণের মাধ্যমে আমরা স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারি।
