Loading...

স্ট্যালিনের গ্রন্থাগার: ক্ষমতার উৎস হয়ে উঠেছে কি বইপত্র!

| Updated: February 20, 2022 19:38:34


স্ট্যালিনের গ্রন্থাগার: ক্ষমতার উৎস হয়ে উঠেছে কি বইপত্র!

সোভিয়েত স্বৈরশাসকের ব্যক্তিগত পুস্তকশালায় ব্যাপক সংখ্যক বইসহ ছিল নানা পাঠ্যবস্তু । কোন কোন চিন্তাধারা জোসেফ স্ট্যালিনের রাজনৈতিক ভাবনার জগতে ছাঁচ হয়ে উঠেছিল তাঁর এই সংগ্রহশালা নিয়ে কৌতূহল-উদ্দীপক সমীক্ষার মাধ্যমে সে বিষয় অনুধাবনের চেষ্টা করা হচ্ছে । 

জোসেফ স্ট্যালিন মারা যান ১৯৫৩ সালে। তারপরের কয়েক দশক ধরে তাঁর ওপর বিভিন্ন রচনা বা বই প্রকাশ করেন পণ্ডিত এবং বুদ্ধিজীবীরা। খুচরা বা খণ্ড খণ্ড উৎস থেকে পাওয়া তথ্য অবলম্বনে লিখিত এ সব রচনার গুণে স্তালিন হয়ে ওঠেন রহস্যময় ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৬-তে কম্যুনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে তাকে দানব স্বৈরশাসক বলে অভিহিত করেন নিকিতা ক্রশ্চেভ। অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক বা প্রজ্ঞার দিক থেকে স্তালিন মাঝারি মানের ছিলেন, এমন দাবি করেন লিওন ট্রটস্কি। সোভিয়েত এই স্বৈরশাসকের নিযুক্ত খুনির হামলায় ১৯৪০-এ মেক্সিকোতে প্রাণ হারান তারই প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত ট্রটস্কি। মৃত্যুর পর প্রকাশিত জীবনীগ্রন্থ ‘স্ট্যালিন’-এ এমন বুদ্ধিবৃত্তিক মাপকাঠি তুলে ধরেন ট্রটস্কি। এখন প্রশ্ন হলো এ সব কি সত্যি? বা কতোটা সত্যি?

১৯৮০ দশকের শেষার্ধ থেকে স্ট্যালিনের গোটা মনোগঠন সম্পর্কে অধিকতর জানার অবারিত সুযোগ মেলে। মিখাইল গর্বাচেভের সংস্কার প্রক্রিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে কেন্দ্র করে সেখানকার মহাফেজখানাগুলোর রুদ্ধদ্বার খুলে যেতে থাকে। নতুন নতুন তথ্যমালার সূত্রে যে সব অনাবিষ্কৃত বিষয় প্রকাশিত হতে থাকল তাঁর অন্যতম হলো স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের পুস্তক, সাময়িকী, প্রচারপত্র। এসব মিলিয়ে সংগ্রহ সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার। এর মধ্যে  ৪০০ বা তার বেশি পাঠ্যবস্তুতে পাঠচিহ্ন, ব্যক্তিগত মতামত বা টিকা-টিপ্পনী দিয়েছেন স্তালিন।

বিশাল এই সংগ্রহশালাকে নিয়েই ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সোভিয়েত পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতি বিশেষজ্ঞ  জিওফ্রে রবার্টসের ‘স্ট্যালিনস লাইব্রেরি’লেখা হয়েছে। সত্যিকার অর্থেই বইটি হয়ে উঠেছে  চিত্তাকর্ষক এবং অবশ্য পাঠ্য। জিওফ্রে রবার্টসের বই থেকে সন্দেহাতীত ভাবে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে রাজনৈতিক ক্ষমতার মতোই গুরুত্ব সহকারে মতধারা বা মতবাদগুলোকে গ্রহণ করেছিলেন স্ট্যালিন। বইটির পর্যালোচনায় এ সব কথা বলেন ফিনান্সিয়াল টাইমসের ইউরোপ সম্পাদক টনি বারবার। এর আগে তিনি অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় বিদেশী সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেছেন।

‘স্ট্যালিনস লাইব্রেরি’-তে রবার্টস বলেন, নিশ্চিতভাবেই, স্ট্যালিন ছিলেন “প্রচণ্ড গোঁড়া মার্ক্সবাদী”এবং “সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই যে তিনি ছিলেন কট্টর উগ্রবাদী।”এরপরও “ উগ্রবাদী, বই পড়া এবং আত্মোন্নয়নের লক্ষ্যে জীবনব্যাপী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”ছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে ডোনাল্ড রেফিল্ডের প্রকাশিত পুস্তক “স্ট্যালিন অ্যান্ড হিজ হ্যাংমেন”এ বলা হয়, “স্ট্যালিনের পড়াশোনা কতো ব্যাপক ছিল এই স্বৈরাচার  বিরোধীরা সে কথা বুঝতে না পারার মতো সবচেয়ে সাধারণ ভুলটি অহরহ করেছেন।”

১৯৩৩-৩৪’এ মস্কোর বাইরে স্ট্যালিনের জন্য নির্মিত হয় (রুশ দ্বিতীয় বাসভবন বা অবকাশ যাপনের কুটিরের আদলে) ‘দাচা।’ এ গৃহের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, চারটি বড় বড় বুককেস বা পুস্তকাধারকসহ ৩০ বর্গ মিটার গ্রন্থাগার। প্রতি পুস্তকাধারে দুই সারি বই রাখার উপযোগী বিস্তৃত তাক রয়েছে। স্ট্যালিনের সংগ্রহ ব্যাপক। স্থান সংকুলান না হওয়ায়  অনেক বই আলাদা ভবনে সংরক্ষণ করতে হয়েছে।  তিনি  চাওয়া মাত্র সে সব বই আনার ব্যবস্থাও  ছিল। 

১৯২৫ সালে কর্মীদেরকে নিজ গ্রন্থাগারের বই শ্রেণিবিন্যাসের নির্দেশ দেন স্ট্যালিন। দর্শন ও মনোবিজ্ঞান থেকে ট্রেড ইউনিয়ন, শিল্প সমালোচনা এবং কার্ল কাউতস্কি এবং রোজা লুক্সেমবার্গের মতো বলশেভিক বিরোধী সমাজতন্ত্রীদের রচনা পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি শ্রেণিতে সংগ্রহগুলোকে তালিকাভুক্ত করা হয়। নিজ গ্রন্থাগারের সব বই পড়ার মতো পর্যাপ্ত সময় স্ট্যালিনের ছিল না।  তা সত্ত্বেও গ্রন্থাগারের অনেক কিছুই তাঁর পড়া হয়েছিল। কবি দেমিয়ান বেদনি অভিযোগ করেন যে, তাঁর ধার দেওয়া বই যখনই স্তালিনের কাছ থেকে ফেরত এসেছে তাতে আঠালো আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে। [প্রকৃত নাম ইয়েফিম আলেক্সেভিচ প্রিদভোরভ (১৩ এপ্রিল, ১৮৮৩ - মে ২৫, ১৯৪৫) হলেও তিনি দেমিয়ান বেদনি ( দরিদ্র দেমিয়ান) নামে বেশি পরিচিত। তিনি ছিলেন সোভিয়েত রাশিয়ার কবি, বলশেভিক এবং ব্যঙ্গ-রচনাকারী।]

স্ট্যালিন যে সব বই গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন তাতে উৎসাহের সাথে দাগাতে, মন্তব্য  বা ‘পোমেতকি’ করতে দেখা গেছে। এ কাজে লাল, নীল এবং সবুজ পেন্সিল ব্যবহার করেন তিনি। বইয়ের বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে ঘৃণা, রাগ মশকরা বা মতানৈক্য প্রকাশ করতে যেয়ে তিনি লেখেন, “হা হা”, “হি হি”, “বাকরুদ্ধ”, “পচা”, “অর্থহীন” “আবর্জনা”, “আহাম্মক”, “বেজন্মা”, “বদমাশ”, “শুয়োর”, “মিথ্যুক”, “লম্পট” এবং “ভাগ ব্যাটা।।” স্ট্যালিন সবচেয়ে বেশি পড়েছেন  ভ্লাদিমির লেনিন  এবং কার্ল মার্কসের রচনাবলী। কিন্তু এসব রচনায় যে সব মন্তব্য করেন তাতে সমালোচনা প্রকাশ পায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। তবে পুস্তক সমালোচক টনি বারবার সে সব বক্তব্য তুলে ধরেন নি। কিংবা মূল বইতেও সে সব মন্তব্য আছে কিনা সে তথ্যও দেননি।

সে যাই হোক, স্ট্যালিনের গ্রন্থাগার নিয়ে লেখা বইয়ের লেখক মনে করেন, এ থেকে ধারণা করা হয় যে সব ধরণের প্রশ্নকে বিবেচনায় নেওয়ার মতো সন্দেহবাদী চিন্তাবিদ ছিলেন না স্ট্যালিন। তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সব সমস্যার উত্তর পাওয়া এমন ভিত্তি থেকে পাঠের সূচনা করেছিলেন। স্ট্যালিনের গণহত্যা চালানোর সক্ষমতা অনুধাবনে বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি তুলে ধরেন  রবার্টস। তিনি বলেন, “সবার দৃষ্টির সামনে এটি লুকিয়ে আছে : এ হলো বিপ্লব রক্ষায় এবং কমিউনিস্ট ভাবধারা বা ইউটোপিয়া অনুসরণের নিমিত্তে শ্রেণিযুদ্ধের নির্মম রাজনীতি এবং আদর্শ।”

স্ট্যালিনের গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করায় মারাত্মক বিপদের ঝুঁকি ছিল। ১৯৩৫ সালে এটি স্পষ্টতর হয়। সে সময় এই স্বৈরশাসক এবং অন্যান্য সোভিয়েত নেতাকে হত্যার কাল্পনিক ষড়যন্ত্রে গ্রন্থাগারিকসহ ক্রেমলিনের বিভিন্ন সহায়তা কর্মী জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয়। অতি-সন্দেহবাতিকগ্রস্থ স্ট্যালিন দলীয় এক সভায় বলেন, “যে সব একক ব্যক্তির আমাদের নেতাদের আবাসগৃহে ঢোকার অধিকার রয়েছে তারা হলো, ঘর সাফ করার দায়িত্বে নিযুক্ত নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং বই সাজানোর অজুহাতে আবাসগৃহে যাতায়াতকারী গ্রন্থাগারিক। এরা কারা? এদের পরিচয় কী? প্রায় সময়ই তা আমরা জানি না। তবে আমরা জানি, খুব সহজে প্রয়োগ করার মতো নানা বিষ রয়েছে। এমন বিষ বইয়ের পাতায় সহজে মাখিয়ে রাখা যায়। বইটি হাতে তুলে নিলে, পড়লে বা লেখালেখি করলে। অথবা বিষ বালিশে মাখিয়ে রাখা হলো। বিছানায় গেলে বালিশে মাথা রেখে শুলে,  শ্বাস নিলে। আর তার এক মাস পরেই সব শেষ হয়ে যাবে।”

স্ট্যালিন সামরিক ইতিহাসের খুবই আগ্রহী পাঠক ছিলেন। মস্কোতে ১৯৪২ সালের এক বৈঠকে, তিনি ১৮০৮-১৮১৪এর পেনিনসুলার ওয়ার (পেনিনসুলার যুদ্ধ হলো নেপোলিয়নে শাসনামলের যুদ্ধের সময় প্রথম ফরাসি সাম্রাজ্যের আক্রমণকারী এবং দখলকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে স্পেন, পর্তুগাল এবং যুক্তরাজ্যের বাহিনীর আইবেরিয়ান উপদ্বীপের যুদ্ধ) চলাকালে স্পেনে ডিউক অব ওয়েলিংটনের সেনা অভিযান নিয়ে গভীর জ্ঞান প্রদর্শন করেন। এ লড়াই নিয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য দেখে উইনস্টন চার্চিলের দোভাষী মেজর আর্থার বিরসক হতবাক হয়ে যান। ইংরেজ জাতির গৃহযুদ্ধ সম্পর্কিত এক বই নিয়ে কথা বলার সময় তিনি সোভিয়েত রেড আর্মির রাজনৈতিক কমিসারদের সাথে অলিভার ক্রোমওয়েলের নিউ মডেল আর্মির পিউরিটান পাদরিদের তুলনা করেন।

রবার্টস মনে করেন, স্ট্যালিন একজন সূক্ষ্ম ভাবনার অধিকারী মৌলিক চিন্তাবিদ ছিলেন না, কিন্তু “সরলীকরণের কাজ উজ্জ্বল ভাবে করতে পারতেন, বিষয়কে স্পষ্ট করে তুলতে এবং জনপ্রিয় করতে পারতেন।  . . তিনি প্রথম বলশেভিক ছিলেন এবং দ্বিতীয়ত ছিলেন বুদ্ধিজীবী।”

রবার্টসের এই বইয়ে সম্ভবত আরো গভীর এবং পরোক্ষ শিক্ষাও লুকিয়ে আছে। একনায়কত্বের যুগের স্ট্যালিনের কিংবদন্তী আজও রয়ে গেছে। স্বৈরশাসকদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কেতাবি জ্ঞান ছিল তাঁর এবং সবচেয়ে বেশি বইয়ের পাঠক ছিলেন স্তালিন। কিন্তু স্বৈরশাসক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বই পড়লেই রাজনীতি এবং জীবনের প্রতি তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে বা তার প্রকাশ ঘটাবে এমন নিশ্চয়তা কখনো কেউই দিতে পারবে না।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]

Share if you like

Filter By Topic