ভারতের বহরমপুরের ছেলে সৌম্য মুর্শিদাবাদী। জ্ঞানের কলসিতে জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্ন দেখতেন জীবনটাকে খুব কাছ থেকে দেখবেন, ভালোবাসবেন। সঙ্গীতের হাত ধরে তার স্বপ্ন অনেকটাই পূরণ হয়েছে। কিছুদিন আগে গেয়েছেন কোক স্টুডিও বাংলা’র মঞ্চে। লালন সাঁইজির পদে মিশ্রণ ছিল ভারতের গীতিকবি কবিরের পদ। কবিরের কথায় সেদিন তার গলা মেতেছিল জীবন বন্দনায়।
সংগীত জীবনের শুরু:
সৌম্যের বাবা গান ভালোবাসতেন, গাইতেন। কিন্তু জীবনের নানা প্রতিকূলতা তাকে সংগীতে খুব বেশি দূর এগোতে দেয়নি। তবে তার সংগীত তৃষ্ণা ছেলেকে দিয়ে পূরণের চেষ্টা ছিল খুব। তিনি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে মুর্শিদাবাদীকে ভর্তি করিয়ে দেন গানের ক্লাসে।
সংগীতের শুরু প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদী বলেন, “নিজেকে খুব বেশি ভাগ্যবান মনে করি কারণ বাবা আমাকে সঠিক দিশা দেখাতে পেরেছেন। আমার সংগীত গুরু শ্রী গৌতম ভট্টাচার্য ছোটবেলা থেকে সংগীত আর জীবন বিষয়ে যে গভীরতম দীক্ষা দিয়েছেন, তা এখনো বুকে নিয়ে চলাফেরা করি। আমি গুরুর কাছ থেকে হিন্দুস্থানি খিয়ালে তালিম গ্রহণ করেছি। এখানে যে বিষয়টি না বললেই নয়, বাবা সংগীতের পথে আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি সবসময় চাইতেন, সংগীত যেন রুটিরুজির কারণ না হয়, বরং তা যেন মনের খোরাক হয়েই পাশে থাকে।”
শিক্ষাজীবনটাকেও এগিয়ে নিয়ে গেছেন একসাথে। অনার্স পর্ব চুকিয়ে মাস্টার্স করতে মুম্বাই যান। পড়াশোনার জন্য ছোটাছুটি চলছিল ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর সংগীতে কিছু করার সংঘাত তার মাঝে বেড়েছে বৈ।
দিনশেষে তো সব শিল্পীই চায় তার নামটা জানুক শ্রোতার দল। বোম্বেতে শেষমেশ একটা ভালো সুযোগ আসে। বেশ দারুণ একটা থিয়েটার তাকে কিছু লিরিক সুর করার সুযোগ করে দেয়। বলা যায় ব্যাপারটা বিধ্বস্ত এক বুকে ঠান্ডা জলের আগমনের মত। যদিও বোম্বে শহরে তার মন বসছিল না। ইটপাথরে ঘেরা শহরটায়, শুধু মানুষের ছোটাছুটি, গাছ নেই, নাক ছেড়ে শ্বাস নেয়ার আরাম নেই। পরে হুটহাট ব্যাগ গুছিয়ে শান্তিনিকেতনের দিকে ছুটে যান। মাস্টার্স আর করা হয়নি।
শান্তিনিকেতনের গল্প:
শান্তির খুঁজে শান্তিনিকেতনে মুর্শিদাবাদী। ভাড়া করেন ছোট একটি কক্ষ। পরিচিত এক বন্ধুর মাধ্যমে গুণী শিল্পীদের সাথে
নিকেতনে আড্ডা বাড়ে। জানার পরিধি বাড়ে। সংগীত যে কী ভয়ানক সুন্দর, তার রূপ যে কতটা সৌন্দর্যে ঘেরা, শান্তিনিকেতন তা সৌম্যকে নতুন করে চিনিয়ে দেয়।
মজার কোনো ঘটনা প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদী বলেন— “একদিন বিকেল বেলা পরিচিত দাদার বাসায় আড্ডা বসে। হঠাৎ খেয়াল করলাম অর্ণব ভাই (শায়ান চৌধুরী অর্ণব) একটা ল্যাপটপ, আর গিটার নিয়ে খুব মনযোগ দিয়ে কিছু একটা ভাবছেন। আমি আগে তার নাম শুনেছি। ভালো লাগত তার গান।”
“আমরা যখন দমবন্ধ ভাব নিয়ে বাইরে ঘুরে আসার পরিকল্পনা করছিলাম, তখনই অর্ণব ভাই ডেকে বললেন, ‘তুমি মুর্শিদাবাদী না? তোমার জন্য একটা গান তৈরি করছিলাম। গেয়ে শোনাও।’ কিছুক্ষণের জন্য চমকে উঠি। আসলে এমন হুটহাট মেলবন্ধন বা ঘনিষ্ঠ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা শান্তিনিকেতনের আবহ ছাড়া সম্ভব কিনা আমি জানি না।”
কোক স্টুডিও বাংলা ও মুর্শিদাবাদী প্রজেক্ট:
কোক স্টুডিও বাংলায় কবির দাসের লেখা ‘কবিরা কুয়া এক হ্যায়’ অংশে কন্ঠ দিয়েছেন সৌম্য। তার কন্ঠের কারুকাজ অনেকের মনে দাগ কেটেছে। কোক স্টুডিও মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন “শুরুতে কোক কর্তৃপক্ষ আমাকে মিউজিক সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেয়। তখন অর্ণব ভাই, সাঁইজির গানে কবির দাসের ফিউশন নিয়ে কিছু একটা পরিকল্পনা করছিলেন। আমি জীবনের অধিকাংশ সময় কবির বা সুফি গানের দিকেই ঝুঁকে ছিলাম। সে সুবাদে হয়তো সু্যোগটা পেয়ে যাই।”
সৌম্যের মুর্শিদাবাদী প্রজেক্ট দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর, বলিউড দিয়ে আবার শুরু হলো। পরিচালক সৃজিত মুখার্জির সিনেমা শেরদিল ২৪ জুন মুক্তি পেয়েছে। শেরদিলের একটি গান ‘মোকো কাঁহা ধুন্ধে রে বন্দে’ যেখানে কন্ঠ ও সংগীত পরিকল্পনায় ছিলেন সৌম্য মুর্শিদাবাদী। এছাড়াও পার্নো মিত্র অভিনীত ‘বনবিবি’ সিনেমায় কন্ঠ দিয়েছেন তিনি। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের সিনেমা বিসমিল্লাহ’তে তার কিছু গান শোনা যাবে।
ভাষা ও কবিরের গান:
মুর্শিদাবাদীর জন্ম যেহেতু বহরুমপুরে, সেহেতু তিনি বাংলাভাষী। কৌতুহলবশত সংগীতে কেন তিনি হিন্দি ভাষাকে বেছে নিলেন জানতে চাইলে, তিনি মুচকি হেসে বললেন, “সংগীতের তো কোনো ভাষা হয় না। আবার সহজ করে বললে, বলা যায়, সবার নিজস্ব কিছু পলিটিক্স থাকে। এটা আমার পলিটিক্স।”
কবিরের গান গাওয়া প্রসঙ্গে তার উত্তর বেশ আবেগ ও আক্ষেপে ভরপুর ছিল। তিনি মনে করেন, প্রতিনিয়ত যেভাবে জাতপাত, সংঘাত বা মানুষ-মানুষে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মত নয়। জীবনের চেয়ে বড় তো কিছু হয় না, হতে পারে না। কিন্তু তবু কেন মানুষ এত হানাহানি খুনোখুনিতে মজে থাকে, তার কূলকিনারা খোঁজে পান না সৌম্য। তাই তার এও মনে হয়, কবির বা লালনের গান আরও বেশি বেশি গাওয়া উচিত। সবার গাওয়া উচিত। এতে যদি এমন দুর্দশা থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যায়।
স্রষ্টার দুয়ারে সবার পরিচয় সবার আগে মানুষ। কবির কিংবা সাঁইজি ঘুরেফিরে এমন বার্তাই দিয়ে গেছেন। মুর্শিদাবাদীর ভাবনা কিংবা শিল্পীর এমন সুচিন্তার জয় হওয়া খুব দরকার। কেননা রক্তারক্তির ঘ্রাণে অকারণ ঘেন্নায় আমরা বহুকাল ঘুমোতে পারিনা শান্তিতে, স্বস্তিতে।
সঞ্জয় দত্ত ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
sanjoydatta0001@gmail.com
