চলছে মার্চ। বাঙালির স্বাধীনতার মাস। ঘুরে বেড়াচ্ছি স্বাধীন বাংলাদেশে। কিন্তু কেমন ছিল ৭১ এর মার্চ? কেমন ছিল মুক্তিযুদ্ধের সে দিনগুলো? বাঙালির আত্মত্যাগ, সাহসিকতা, মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, মানবিকতা বোধগুলো কেমন ছিল? সেই সময়টা জানতে-বুঝতে, অনুভব করতে কিন্তু বসে যেতে পারেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলাদেশি সিনেমাগুলোর সামনে।
কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। জীবন থেকে নেয়া, জয় বাংলা, ধীরে বহে মেঘনা, আবার তোরা মানুষ হ, সংগ্রাম, আলোর মিছিল, মেঘের অনেক রঙ, একাত্তরের যীশু, নদীর নাম মধুমতী, এখনো অনেক রাত, কার হাসি কে হাসে, মাটির ময়না, শ্যামল ছায়া, জয়যাত্রা, গেরিলা —প্রতিটি সিনেমাই রূপালি ফ্রেমে বন্দী একেক টুকরো মুক্তিযুদ্ধ।
ওরা ১১ জন
এটি এমন একটি চলচ্চিত্র যেখানে ১১ জন কলাকুশলীই সত্যিকারের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। পেশাদার অভিনয়শিল্পীর মধ্যে ছিলেন রাজ্জাক, শাবানা, নূতন প্রমুখ যাঁদের কেউই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম এ সিনেমাটি থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেননি। ব্যবহার করা হয়েছে সত্যিকারের অস্ত্র, গোলাবারুদ এমনকি যুদ্ধবন্দী পাকিস্তানি সেনাদের।
চিত্রসমালোচক চিন্ময় মুৎসুদ্দী তাঁর প্রবন্ধে বলেন, ‘এই ছবিতে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে যাঁরা অভিনয় করেছেন তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু কেউই অভিনেতা না। তাই অন্যান্য দৃশ্যের অভিনয় এত উন্নতমানের না হলেও যুদ্ধের দৃশ্যগুলো যথেষ্ট বাস্তবানুগ হয়েছে।’
১৯৭২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি মুক্তিপ্রাপ্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম এ চলচ্চিত্রটির পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। তিনি যুদ্ধ চলাকালীনই ভেবেছিলেন বেঁচে থাকলে মুক্তিযুদ্ধের ওপর সিনেমা বানাবেন। ত্রিশ লাখ শহিদ, বাঙালির আত্মত্যাগ, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব উঠে এসেছে সিনেমাটিতে। এছাড়াও এ দেশের দালালদের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড এবং তার পরিণতিও তুলে ধরা হয়েছে। শুধুমাত্র বীরাঙ্গনা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে পরিপূর্ণভাবে।
'মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে নারী-নির্মাণ' শিরোনামের একটি গবেষণাপত্রে ড. কাবেরী গায়েন ‘ওরা ১১জন’ চলচ্চিত্র নিয়ে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে নারীর যত ধরণের অংশগ্রহণ ছিলো, প্রায় সবধরনের প্রতিনিধিত্বই এই চলচ্চিত্রে পাওয়া যায়। তবুও মূল ন্যারেটিভে নারীর ধর্ষিত ইমেজটি-ই প্রধান হয়ে ওঠে এবং তাদের জীবন নায়কদের 'মহানুভবতা'র মুখাপেক্ষী হয়ে যায়.....মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে মূল চরিত্রে না হলেও কেবল ধর্ষিতা নয়, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণটি যে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নানামাত্রিক ছিল, এই চলচ্চিত্রে সেটি এসেছে।’
মুক্তিযোদ্ধা, সেবিকা, ধর্ষিতা- তিন রূপেই নারীর ভূমিকাকে তুলে ধরা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য ছবিতে যা দেখা যায় না বললেই চলে। সিনোম্যাটিক উপাদানের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সাদা-কালো এ ছবিতে অসাধারণ ক্যামেরার কাজের পাশাপাশি সম্পাদনায় নৈপুণ্য, আবহ সংগীতের চমৎকারিত্ব এবং কারিগরি অভিনবত্বের ব্যাপারটি ফুটে উঠেছে ভালোভাবেই।
অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী
‘চলো রোমেনা, আমরা দু'জনে এ সন্তানকে বুকে নিয়ে সমাজের দ্বারে দ্বারে ঘুরি। অসংকোচে বলি, এ লাঞ্ছিত নারীত্বের মর্যাদা দিতে তোমরা কুণ্ঠিত হয়ো না। নতুন সূর্যের আলোয় সদ্য ফোটা ফুলের হাসি ফুটুক। দেশের নব-নির্মিতিতে একদিকে এরাও হবে শরিক, স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক’—অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষীর শেষ দৃশ্যের এ সংলাপের মাধ্যমেই ফুটে ওঠে সিনেমাটির বার্তা।
সিনেমার শুরুতেই বিদ্যুতের তার, বৈদ্যুতিক খুঁটি, রেললাইন, হাত, হাতের তালুতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, হাতে বাংলাদেশের পতাকা, গ্রাম-বাংলার গাছপালা, ফসলের মাঠ, বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা হাত, যুদ্ধের শব্দ, সঙ্গীতের তীব্রতা- এসব বহু চেনা বাস্তব উপাদানের সমন্বয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে এক দ্বান্দ্বিক কোলাজ। কাহিনীর দিক থেকেও ছবিটি ছিল ভিন্নধর্মী।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি রোমেনার প্রতি নৃশংস নির্যাতন, মুক্তিযোদ্ধা আসাদ ও বদরুদ্দীনের শহিদ হওয়া, শিল্পী আনোয়ারের মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দিয়ে কলকাতায় পালিয়ে যাওয়ায় মনস্তাত্ত্বিক দহন এবং যুদ্ধ শেষে গ্রামে ফিরে এসে যুদ্ধশিশু, যুদ্ধাহত ও মুক্তিযোদ্ধা নারীকে সমাজে পুনর্বাসনের কাজে
আত্মনিয়োগ করার মধ্যে দিয়ে কাহিনী এগিয়েছে।
ববিতা, উজ্জ্বল, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ অভিনীত, বীরাঙ্গনাদের সম্মান এবং যুদ্ধশিশুদের অধিকারের বার্তাসমৃদ্ধ এ সিনেমাটি সুভাষ দত্তের এক ধ্রুপদী সৃষ্টি।
হাঙর নদী গ্রেনেড
মানুষ তার দেশের জন্য কতটুক করতে পারে? প্রাণ বিসর্জন? আসলে তার চেয়েও বেশি। এর প্রমাণ চাইলে দেখতে হবে এই সিনেমাটি।
গ্রামের এককালের দস্যি মেয়ে 'বুড়ি'র বয়সে অনেক বড় চাচাতো ভাই গফুরের সঙ্গে বিয়ে হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর প্রতিবন্ধী ছেলে রইসকে নিয়ে অনেকটা সংগ্রামেই চলতে থাকে তার সময়। এর মধ্যে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। হাফেজ ও কাদের দুই মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করতে করতে শত্রুপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে আশ্রয় নেয় বুড়ীর ঘরে। পিছু পিছু হানাদাররাও বাড়িতে আসে। দেশ যখন ডাক দেয়, একজন মা তখন সকল মুক্তিযোদ্ধার মা, তখন পেটে ধরা সন্তানের কথা ভাবলে চলে না। বুড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাতে নিজের সন্তানকে তুলে দেয় বন্দুকের নলের মুখে।
দক্ষ চোখে ধরা পড়বে অনেক ত্রুটি; কিন্তু সিনেমাটি, বিশেষত শেষ দৃশ্যটি মনে করিয়ে দিবে কতটুকু অশ্রু-রক্ত, ত্যাগ-সাহসিকতা জড়িয়ে আছে আমাদের স্বাধীনতার সাথে।
সেলিনা হোসেনের উপন্যাস 'হাঙর নদী গ্রেনেড' অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু নির্মাণের আশা অপূর্ণ রেখেই ১৯৯২ সালে পরলোক গমন করলে তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করেন পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে নির্মিত ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রটিতে অনবদ্য অভিনয়ে আছেন সুচরিতা, সোহেল রানা, অরুণা বিশ্বাস প্রমুখ।
মেঘের অনেক রং
সিনেমাটিতে দেখা যায়, পরিবার থেকে হারিয়ে যাওয়া যুদ্ধে নির্যাতিতা এক নারী একসময় ডাক্তার স্বামীকে দূর থেকে দেখে স্বামীর সামনে না যেয়ে বরং লুকিয়ে ডাক্তারের কাছে ছেলেকে রেখে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে চায়। যুদ্ধে অনেক বীরাঙ্গনা, নির্যাতিতা নারীদের পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে ক্লাসিক এ সিনেমাটিতে।
১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম রঙিন এ সিনেমাটিতে পরিচালক
হারুনর রশীদ দেখিয়েছেন যুদ্ধের ছবি মানে শুধু যুদ্ধ নয়। যুদ্ধের প্রভাবের ব্যাপকতাকে তিনি দেখিয়েছেন। চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পীদের এটিই ছিল প্রথম কাজ। অভিনয়ের ঘাটতি পূরণ করে দেয় সিনেমাটির অসাধারণ আবহ সংগীত, পরিচালনা ও চিত্রগ্রহণ।
আগুনের পরশমণি
ঢাকা শহরের রুদ্ধ পরিস্থিতিতে এক পরিবারের সন্ত্রস্ত অবস্থা দিয়ে শুরু করে গেরিলা যুদ্ধ, পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহ অত্যাচার, মুক্তিযোদ্ধাদের দৃঢ়তা সাহসিকতা প্রতিফলনের মাধ্যমে কাহিনী এগিয়ে যেতে থাকে।
কারফিউ শুরু হওয়ায় গুলিতে জখম হওয়া বদিকে সারানোর মতো ডাক্তার, ঔষধের জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে করতে সকাল পর্যন্ত বাঁচার অনিশ্চয়তা নিয়ে শেষ হয় চলচ্চিত্রের কাহিনি।
হুমায়ূন আহমেদের জাদুকরি নির্মাণ এবং আসাদুজ্জামান নূর, আবুল হায়াত, বিপাশা হায়াত, শীলা আহমেদের মতো দক্ষ সব কলাকুশলীদের অভিনয় 'আগুনের পরশমণি'কে পরিণত করেছে সিনেমার থেকেও বেশি কিছু।
টুকরো টুকরো সেলুলয়েড দৃশ্যের মধ্য দিয়ে সমগ্র চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় সকল দিকেরই অবতারণা ঘটেছে, যা সেই সময়ে দর্শকের মধ্যে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত করতে রেখেছে বিশেষ ভূমিকা। দর্শকের মনোজগতে নতুন মাত্রার সৃষ্টি হয় শেষ দৃশ্যে; যুদ্ধ ও মৃত্যুকে পেছনে ফেলে গেরিলাযোদ্ধা বদিকে রাত্রি অনুপ্রাণিত করছেন ভোরের সূর্যালোক স্পর্শ করতে, আর নেপথ্যে বাজছে-
"আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে
এ জীবন পুণ্য করো
এ জীবন পুণ্য করো
এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে"
সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রাজনৈতিক ঘটনা, এর আগে ও পরের রাজনীতির পটভূমি, গুরুত্বপূর্ণ কোনো অভিযান ফুটে উঠতে দেখা না গেলেও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলোতে বিষয়বস্তু ও কাহিনীর বৈচিত্র্য দেখা যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাতে এসব চলচ্চিত্র হতে পারে একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
ফারিয়া ফাতিমা স্নেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন। ইমেইল- fariasneho@gmail.com
