যুগ যুগ ধরে টাইম ট্রাভেল নিয়ে মানুষের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিজ্ঞানের দ্রুত পসারের সাথে তাল মিলিয়ে এ নিয়ে আগ্রহ বেড়েই চলছে। মানুষ তার অধরা সময় ভ্রমণের স্বপ্ন এখনো ছুঁতে না পারলেও সিনেমা জগতে তা কিন্তু বসে নেই। ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির কাঁধে সত্যিকারের সময় ভ্রমণের দায় চাপিয়ে, উপভোগ করে চলছে টাইম ট্রাভেল সম্পর্কিত দারুণ কিছু সিনেমা।
সিনেমা জগতের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে থ্রিলার, অ্যাকশন, সায়েন্স ফিকশন। এসব জনরার মাঝেই টাইম ট্র্যাড়ভেল নির্ভর সিনেমার আকর্ষণ বেড়ে চলছে, ধীরে ধীরে এটি পরিণত হচ্ছে একটি সাব-জনরায়। মার্ক টোয়েনের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে ১৯২১ সালে নির্মিত হয় টাইম ট্রাভেল নিয়ে প্রথম সিনেমা 'অ্যা কানেক্টিকাট ইয়ানকে ইন কিং আরথার'স কোর্ট'। এর এক শতাব্দী পরে হালের টাইম ট্রাভেল সম্পর্কিত সিনেমাগুলো হচ্ছে আরো চমকপ্রদ, ক্ষেত্রবিশেষে মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতোও বটে। এরকমই কয়েকটি তুমুল জনপ্রিয় টাইম ট্রাভেল সম্পর্কিত সিনেমা নিয়ে আজকের আয়োজন।
ব্যাক টু দ্য ফিউচার
আইএমডিবি রেটিং: ৮.৫
ব্যাক টু দ্য ফিউচার ট্রিলজি’র প্রথম সিনেমা 'ব্যাক টু দ্য ফিউচার' বিখ্যাত মূলত ট্রাইম ট্রাভেল ক্ল্যাসিক হিসেবে। এর পাশাপাশি বেস্ট সাউন্ড এডিটিং বিভাগে অস্কার জেতা সিনেমাটি বিখ্যাত হয়ে আছে এর সংগীতের জন্যও। আধপাগল বিজ্ঞানী ডক ব্রাউন আবিস্কৃত প্লুটোনিয়ামভিত্তিক টাইম মেশিনে চড়ে বসে আশির দশকের সাধারণ এক কিশোর মার্টি ম্যাকফ্লাই। সে ভুলক্রমে চলে যায় ১৯৫৫ সালের অতীত পৃথিবীতে। অতীতে গিয়ে সে নিজের বাবা-মাকে দেখতে পায় তাদের কিশোর অবস্থায়, খুঁজে পায় অল্প বয়স্ক ডক ব্রাউনকেও। বর্তমানে ফিরে আসা নিশ্চিত করতে ম্যাকফ্লাইয়ের বাবা-মাকে একত্র করতে একসাথে কাজ শুরু করে তারা।
১৯৮৫ সালে মুক্তি পাওয়া সফল এ ছবিটি পরিচালনা করেছেন 'ফরেস্ট গাম্প' সিনেমার জন্য বেস্ট ডিরেক্টরের অস্কার পাওয়া আমেরিকান পরিচালক রবার্ট জ্যামেকিস। কমেডি সাই-ফাই জনরার ছবিটিতে প্রায় উন্মাদ বিজ্ঞানীর ভূমিকায় ক্রিস্টোফার লয়েডের অসাধারণ অভিনয় যেন ছিল লাফিং গ্যাস। মাইকেল জে. ফক্সও তার স্বভাবগত অভিনয়শক্তি এবং চমৎকার সংলাপভঙ্গিতে মার্টি ম্যাকফ্লাই চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছেন প্রাণবন্তভাবে।
ইন্টারস্টেলার
আইএমডিবি রেটিং : ৮.৬
'ইনসেপশন', 'দ্য ডার্ক নাইট রাইসেস', 'দ্য প্রেস্টিজ' সহ বিখ্যাত সব সিনেমার খ্যাতিমান পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি 'ইন্টারস্টেলার'। ২০১৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি মূলত নির্ভর করে আছে সময় পরিভ্রমণ, কোয়ান্টাম ডাটার উপর। পদার্থবিজ্ঞানের এসব তত্ত্বের সাথে বাবা কুপার এবং মেয়ে মারফির চিরন্তন ভালবাসার মিশ্রণে শেষ হয়েছে সিনেমার গল্প। ২০৬৭ সালের পৃথিবী যখন অবসবাসযোগ্য ডিস্টোপিয়ার মুখোমুখি, জোসেফ কুপারসহ নাসার এক দল নভোচারী বেরিয়ে পড়ে বসবাসযোগ্য কোনো আশ্রয়ের খোঁজে।
ওয়ার্মহোলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে তারা আলাদা আলাদাভাবে খুঁজতে থাকে বসবাসযোগ্য কোনো গ্রহ, মধ্যাকর্ষণভিত্তিক কৌশলে মেয়ে মারফির সাথে চলে যোগাযোগ, ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি পৌঁছানোয় হতে থাকে সময় বিস্ফোরণ। এমন নানা চমকপ্রদ ঘটনায় মোড়ানো সাই-ফাই অ্যাকশনধর্মী সিনেমাটির অসাধারণ ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের কাজ যেন শিল্প ও বিজ্ঞানের সেতুবন্ধন। অভিনয়ে আছেন ম্যাথিউ ম্যাককনাহে, অ্যানা হ্যাথাওয়ে, জেসিকা চ্যাস্টেইন প্রমুখ।
দ্য টার্মিনেটর
আইএমডিবি রেটিং: দ্য টার্মিনেটর- ৮.০
টার্মিনেটর ২: জাজমেন্ট ডে- ৮.৫
কানাডিয়ান পরিচালক জেমস ক্যামেরনের পরিচালনায় নির্মিত 'দ্য টার্মিনেটর’ সিনেমাটি অ্যাকশন জনরার ছবির জগতে একটি চমৎকার সংযোজন। ১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাটি মূলত 'টার্মিনেটর' সিরিজের ছয়টি সফল ছবির সূচনা। ট্রাইম ট্রাভেল নির্ভর ছবিটির মূল আকর্ষণ টার্মিনেটর নাম ভূমিকায় অভিনয় করা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার। ২০২৯ সালে যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভবিষ্যতের পুরো পৃথিবী, ১৯৮৪ এর পৃথিবীতে টাইম ট্রাভেলের মাধ্যমে পাঠায় 'টার্মিনেটর' নামের সাংঘাতিক শক্তিশালী ও অস্ত্রে সুসজ্জিত মারাত্মক এক সাইবর্গকে।
তার উদ্দেশ্য, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর রক্ষাকর্তার মা সারাহ কনরকে সন্তান জন্ম দেয়ার আগেই মেরে ফেলা। কিন্তু পুরো পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নারীকে রক্ষার জন্য টার্মিনেটর নামক সাইবর্গটিকে ধ্বংস করতে সময় ভ্রমণ করেই পাঠানো হয় সাহসী যোদ্ধা কাইলি রিসকে। তবে অপ্রতিরোধ্য এই সাইবর্গকে থামানোর কোনো উপায় আছে কি?
টেনেট
আইএমডিবি রেটিং: ৭.৪
প্যালিন্ড্রোমে নাম রাখা (TENET) সিনেমাটির গল্পের ভাঁজে ভাঁজেও যেন ছড়িয়ে আছে প্যালিন্ড্রোম। পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান পুরো এক দশক এই সিনেমার মূল বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করার পর পাঁচ বছর সময় নিয়ে লেখেন এর চিত্রনাট্য। করোনা অতিমারীর কারণে তিনবার পিছিয়ে যাওয়া এবং করোনা পরবর্তী থিয়েটারে মুক্তিপ্রাপ্ত এই প্রথম সিনেমাটি সমালোচকদের প্রশংসার পাশাপাশি জিতে নেয় অস্কারের বেস্ট ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস অ্যাওয়ার্ড।
ইনভার্ট এন্ট্রপির মাধ্যমে ইনভার্ট টাইম দেখানোসহ পদার্থবিজ্ঞানের চমকপ্রদ নানা বিষয়ের ব্যবহার সিনেমাটিকে করেছে দর্শকনন্দিত। ভবিষ্যতের ভিন্নধর্মী মারাত্মক সব অস্ত্র যখন গিয়ে পড়ে অসাধু ব্যক্তিবর্গের হাতে, বর্তমান ও ভবিষ্যতে ভ্রমণ করে পৃথিবীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হয় প্রোটাগনিস্ট নামক চরিত্রকে। প্রকৃতির নিয়ম ঠিক রেখে কীভাবে সে বাঁচায় পৃথিবীকে, তা জানতে অবশ্যই দেখে ফেলুন সিনেমাটি।
বিল অ্যান্ড টেড'স এক্সেলেন্ট অ্যাডভেঞ্চার
আইএমডিবি রেটিং : ৭.০
ক্যালিফোর্নিয়ার হাই স্কুল পড়ুয়া বিল এবং টেড দুই বন্ধু। একসাথে গড়তে চায় একটি মিউজিক ব্যান্ড। তবে টেড ইতিহাসের ক্লাসে ফেল করলে টেডের বাবা তাকে সামরিক স্কুলে পাঠিয়ে দেবে বলে দেয়। এদিকে তাদের সাহায্য করতে, টেলিফোন বুথ সদৃশ এক টাইম মেশিনের মাধ্যমে ২৬৮৮ সালের ভবিষ্যত থেকে পাঠানো হয় রুফাস নামক এক অভিযাত্রীকে। কেননা টেড এবং বিলের গড়ে তোলা মিউজিক ব্যান্ডটিই সেই ভবিষ্যত পৃথিবীর নিখুঁত সমাজের ভিত্তি। আর ব্যান্ডটি গড়তে হলে তাদের একসাথে থাকা প্রয়োজন, স্কুলের ইতিহাসের পরীক্ষায় পাস করা প্রয়োজন।
তাই রুফাস টাইম মেশিন ব্যবহার করে বিল এবং টেডকে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে ভ্রমণ করতে পাঠায়, যাতে তারা ইতিহাসের পরীক্ষায় পাস করতে পারে, এবং একসাথে থেকে ব্যান্ডটি তৈরি করতে পারে। কিন্তু ইতিহাস ভ্রমণে গিয়ে কী হয়, এবং ইতিহাস পরীক্ষাতেই বা কী হয়? জানতে হলে দেখতে হবে ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অ্যাডভেঞ্চার কমেডি ঘরানার এ সিনেমাটি।
তুলনামূলক সাদামাটা গল্পের উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হলেও বক্স অফিসে ছবিটি কুড়ায় দারুণ সাফল্য। ১৯৯১ এবং ২০২০ সালে মুক্তি পায় এর আরও দু’টি সিক্যুয়েল। স্টিফেন হেরেক পরিচালিত ছবিটিতে অভিনয় করেছেন কিয়ানু রিভস, অ্যালেক্স উইন্টার, জর্জ ক্যালিন প্রমুখ।
ফারিয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
fariasneho@gmail.com
