সুরে সুরে লোকজ বাদ্যযন্ত্র


অদ্রি বর্মণ | Published: February 27, 2021 12:01:24 | Updated: February 27, 2021 20:45:18


ছবিঃ ইন্টারনেট

বাঙালিদের ঐতিহ্যবাহী গান লোকসংগীত। লোকগানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় বাংলা ও বাঙালির বহু ঐতিহ্য। আর এই গানগুলোকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে ঐতিহ্যবাহী কিছু বাদ্যযন্ত্র। সেই বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিয়েই আজ কথা হবে।

একতারা
একসময় বহু বাউলশিল্পী বাংলার মাঠঘাটে একতারা হাতে নিয়ে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে গান বাঁধতেন। সেই একতারার সুরের ঝংকারে নিজেদের মন মাতাত গ্রামবাংলার মানুষেরা।

এ বাদ্যযন্ত্র কবে কোথায় কে আবিষ্কার করেছেন, তা নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন কথা বলেছেন। কিন্তু কার কথা সঠিক, তা জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, প্রায় এক হাজার বছর ধরে বাংলায় একতারার ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ধারণা করেন, বাউল মরমি কবি সাধক ফকির লালনশাহের আমলে একতারার জন্ম হয়।

যন্ত্রটির নাম একতারা হওয়ার কারণ-এটি এক তার বিশিষ্ট যন্ত্র। ইতিহাসের পাতায় একে একতন্ত্রী বীণা বলেও আখ্যায়িত করা হয়। একতারার সুরের মূর্ছনায় ডুবে থাকতেন বাউলরা, আর তা উপভোগ করত লোকগানপ্রেমী সাধারণ মানুষেরা। একটি তারের সে যন্ত্র দিয়ে বাউলেরা সুরের বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলেন খুব সুন্দর করে।

বাউলরা কখনো দেশপ্রেমের ভাব প্রকাশ করে বলে ওঠেন, একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল, কখনো আবার কোনো অভিমানী বাউলের আক্ষেপ ভরা মন গেয়ে ওঠে, একতারা বাজাইও না।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের লেখনীতেও উঠে এসেছে একতারা। বাদল-বাউল বাজায়রে একতারা আর একতারাটির একটি তারে গানের বেদন বইতে নারেএ ধরনের অনেক চরণ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে মিলবে।

একতারা তৈরি করতে ব্যবহার করা হয় লাউ, কুমড়া, মোটা বাঁশ বা কাঠ, নারিকেলের খোল কিংবা পিতলের পাতলা আবরণ ও তার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাদ্যযন্ত্রভিত্তিক ভাস্কর্যের নাম একতারা। এটি লালনশাহের জন্মস্থান ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু শহরে স্থাপিত হয়েছে। এটি বেদি থেকে ২২ ফুট এবং মাটি থেকে ২৬ ফুট উঁচু।

ঢোল
লোকসংগীতের অন্যতম বাদ্যযন্ত্র ঢোল। কথা, সুর ও তাল, এই তিনের সংমিশ্রণে জন্ম হয় একটি গানের। ঢোল তাল যন্ত্র। মধ্যযুগে বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে এই কাঠের খোলসের দুইদিকে চামড়া দিয়ে আচ্ছাদিত যন্ত্রটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

ঢোল মূলত কাঠ খোদাই করা পিপার মতো খোলস। এর দুই মুখ খোলা, দুই মুখে চামড়ার আবরণ দিয়ে তৈরি করা হয় ঢোল। একপাশে গরুর মোটা চামড়া, আর অন্যপাশে ছাগলের পাতলা চামড়া ব্যবহার করা হয়। এতে করে মোটা ও পাতলা পর্দার সংমিশ্রণে সুন্দর, ভারসাম্যযুক্ত আওয়াজ বের হয়ে গানের তাল ধরে রাখতে সহায়তা করে।

জারি, সারি, গম্ভীরা, নৌকাবাইচ, বাউলা গান, হোলিখেলা, গাজনের গান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, যাত্রাগান, টপ্পা গান, ছোকরা নাচ, কবি গান ইত্যাদি ক্ষেত্রে ঢোলের প্রয়োগ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও হিন্দুধর্মের বিভিন্ন পূজা-অর্চনায় ঢাক বাজানো হয়। বিশেষ করে দুর্গাপূজা ও কালীপূজায় বেশি ঢাক বাজানো হয়।

ঢোল ও ঢাক-নাম দুটি হলেও এদের মধ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য। ঢাক, ঢোলের চেয়ে আকারে বড়। দুটি কাঠির মাধ্যমে একপাশে বাজাতে হয় এটি। আর ঢোল বাজানো হয় একটি কাঠি ও হাতের আঙুল ব্যবহার করে।

গ্রামবাংলার কবিয়ালরা বিভিন্নভাবে এই ঢোল নিয়ে গান বেঁধেছেন। সুপরিচিত গান আমি তাকডুম তাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল এর মাঝে অন্যতম। কখনো ঢোলের আওয়াজকে কলঙ্কের সঙ্গে তুলনা করে কবিয়ালরা বলেছেন, জগৎ জুড়ে বাজে শুনি পিরিতি কলঙ্কের ঢোল। আবার বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন-পয়লা বৈশাখ নিয়ে কবি বলেছেন, বাজে রে বাজে ঢোল আর ঢাক, এলো রে পয়লা বৈশাখ।

বহুকাল আগে গ্রামে-গঞ্জে ঢোল ও ঢ্যারা পিটিয়ে লোকজন জড়ো করা হতো, কোনো সংবাদ বা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়ার জন্য। তখন যেমন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত ছিল ঢোল, এখনো মানুষের জীবনের গান-লোকগানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই বাদ্যযন্ত্রটি।

দোতারা
গ্রামবাংলার আরও একটি লোকজ বাদ্যযন্ত্র দোতারা। দোতারা সুরযন্ত্র। দুই তারবিশিষ্ট বলে এমন নাম। কেউ কেউ এটিকে স্বরাজ বলেও ডাকে। বাংলার বাউলদের হাতের সুর মাখানো এ যন্ত্রে বিভিন্ন সময়ে দুই তারের পরিবর্তে চার বা পাঁচটি তারও যুক্ত হয়েছে। ওস্তাদ পাগলা বাবু শাহজাদপুরী তার দোতারায় পাঁচটি তার এবং বাংলার বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম চারটি তার ব্যবহার করতেন।

এটি তৈরি করা হয় নিম কাঠ, চামড়া ও রেশমের তার দিয়ে। এটির অগ্রভাগে কাঠে খোদাই করা হয়। এতে বিভিন্ন নকশাও থাকে। টিয়া পাখি ও ময়ূরের মাথার নকশা বেশ জনপ্রিয়। এটি বাজাতে হয় দাঁড়িয়ে গলায় ঝুলিয়ে বা বসে কোলের ওপর রেখে কটি দিয়ে। এই কটি গরু বা মহিষের শিং দিয়ে বানানো হয়। অঞ্চলভেদে দোতারার কাঠামো ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। দেড়-দুই হাত লম্বা যন্ত্রটি ঢাকা, রংপুর, খুলনা ও পঞ্চগড় এলাকায় ভিন্ন নকশা এবং ভিন্ন কাঠামোতে তৈরি করা হয়ে থাকে।

ধারণা করা হয়, এই সুরযন্ত্রটি মধ্যযুগীয় সময় থেকে এই বাংলায় রয়েছে। এর উল্লেখ পাওয়া যায় ধ্যানমালা ও পদ্মপুরাণ গ্রন্থেও। কবিগান, মুর্শিদি, জারিগান বা সারিগানের প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসাবে দোতারা বা স্বরাজ ব্যবহার করা হয়। কালের যাত্রায় আজও এই আবহমান বাংলার বাউলরা এর সুরের মূর্ছনায় ডুবে থাকেন।

সারিন্দা
দেড় থেকে দুই ফুট লম্বা তিন তার বিশিষ্ট যন্ত্রটির নাম সারিন্দা। কাঠ, চামড়া, ও তার দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। বয়সের হিসেবে বহু প্রাচীন এ যন্ত্র বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে। বাউলরা তার টেনে এটি বাজাতেন বলে এটিকে ততবাদ্যও বলা হতো।

তিন তারের এ যন্ত্রের অগ্রভাগ তিনটি কান-এর সঙ্গে লাগানো হয়। বাউলরা প্রয়োজন অনুযায়ী কান ঘুরিয়ে স্বর নামিয়ে এবং চড়িয়ে থাকে। প্রথম দিকে সারিন্দা তারগুলো তৈরি করা হতো ঘোড়ার লেজের চুল দিয়ে। পরবর্তীকালে এটিতে ইস্পাতের তার ব্যবহার করা হয়।

যন্ত্রটিতে সুর তুলা হয় ডানহাত দিয়ে ছড় টেনে এবং বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে তার টিপে টিপে। মুর্শিদি ও কেচ্ছা গানে এই যন্ত্রটি বেশি ব্যবহার করা হতো।

আজকের আধুনিকায়নের বেড়াজালে সেই প্রাণ মাতানো বাউলের গান বা এই বাদ্যযন্ত্রগুলোর আবেদন হয়তো ইতিহাস আর ঐতিহ্যের পাতাতেই বেশি মানানসই। তবু পুরোনো স্মৃতির গহীনে গিয়ে প্রাণের যে সুর মেলে, তা কোথাও না কোথাও একতারা-সারিন্দার কোলেই বাজতে থাকে।

অদ্রি বর্মণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞান নিয়ে সম্মান চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত। ইমেইল: audribormon@gmail.com

Share if you like