এক মাসের বেশি সময় আগে অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা মারামারিতে জড়াল।
বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আইনজীবী সমিতি ভবনের তিনতলায় সম্মেলন কক্ষের সামনে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে হাতাহাতি, পরে কিল-ঘুষির পর কক্ষের জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয়।
সমিতির সাবেক সহ সভাপতি, আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের নেতা মো. অজি উল্লাহর নেতৃত্ব একটি দল নতুন উপ-কমিটি গঠন করে ভোট পুনর্গণনার পর ফল ঘোষণার দাবিতে সম্মেলন কক্ষে ঢুকতে গেলে মারামারির সূত্রপাত। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
সমিতির ওই কক্ষেই গত মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ব্যালটসহ অন্যান্য জিনিসপত্র রাখা আছে।
অজি উল্লাহর নেতৃত্বে ভোট পুনর্গণনা করে নতুন সাত সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা উপ-কমিটি ফল ঘোষণা করবে বলে মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল।
অজি উল্লাহর নেতৃত্বে বুধবার আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা ভোট পুনর্গণনার জন্য ঢুকতে গেলে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ধাক্কা-ধাক্কি, হাহাহাতি, কিল-ঘুষির মধ্যে কক্ষের তালা ভেঙে অজি উল্লাহরা ভেতরে ঢুকে পড়লে বিএনপি সমর্থকরা কক্ষের কাচ ভাংচুর করে। বাইরে থেকে বিএনপি কক্ষের বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
গোলমালের মধ্যে কোনো পক্ষের আইনজীবীদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত ১৫ ও ১৬ মার্চ সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ ওয়াই মশিউজ্জামানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের নির্বাচন উপ-কমিটির অধীনে।
একদিন পর ১৭ মার্চ ভোট গণনা করে রাতে ফল ঘোষণার সময় আওয়ামী সমর্থক আইনজীবী প্যানেল পক্ষের সম্পাদক প্রার্থী ভোট পুনর্গণনার দাবি করে লিখিত আবেদন জানালে ফল ঘোষণা আটকে যায়।
এরপর ফল ঘোষণা না করে মশিউজ্জামান সমিতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে খবর আসে।
ফলে আটকে থাকার মধ্যে এক মাস ১৩ দিন পর মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট ল রিপোর্টার্স ফোরামে সংবাদ সম্মেলন করে সাবেক সহ-সভাপতি অজি উল্লাহ দাবি করেন, গত ১২ এপ্রিল সমিতির কার্যকরি কমিটির মেয়াদের শেষ এক সভায় তাকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি নির্বাচন উপ কমিটি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি নির্বাচন পরবর্তী অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য গত ১৬ এপ্রিল থেকে কার্যক্রম শুরু করেছি। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীকে (সম্পাদক) নোটিস করি, বারের অফিসে নোটিস করি। কক্ষের দাবি হস্তান্তরের জন্য এ ওয়াই মশিউজ্জামানকে ই-মেইলে পত্র প্রেরণ করি। তিনি চাবি হস্তান্তর করেননি, তারপর তার সাথে আদালতে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলি।”
বর্তমানে সমিতির কার্যক্রম ‘অচলাবস্থা’ বিরাজ করছে উল্লেখ করে অজি উল্লাহ বুধবার নির্বাচনের অসম্পন্ন কাজ ‘সম্পন্ন’ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
এদিকে আইনজীবী সমিতির বর্তমান সম্পাদক ও বিএনপি সমর্থক প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজল বুধবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, অজি উল্লাহ নির্বাচন পরিচালনায় উপ-কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে যে দাবি করছেন, তা ঠিক নয়।
যে সভায় অজি উল্লাহকে নির্বাচনের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য আহ্বায়ক করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করছেন, ওই গত ১২ এপ্রিল সমিতির এমন কোনো সভাও হয়নি বলে দাবি করেন কাজল।
কাজল বলেন, “অজি উল্লাহ নেতৃত্বে তথাকথিত নতুন নির্বাচন সাব-কমিটি গঠন, ভোট কাউন্টিং বা নির্বাচনী ফলাফল বিষয়ে তাদের যে কোনো পদক্ষেপ অবৈধ। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সুমহান ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করার নির্লজ্জ অপচেষ্টা। এ ধরনের অবৈধ, নীতিহীন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য সবাই আহ্বান জানাচ্ছি।”
এদিকে অজি উল্লাহ মঙ্গলবার বলেছিলেন, “বারের কল্যাণ ও মর্যাদা রক্ষার জন্য এবং অচলাবস্থা নিরসনের জন্য আমরা এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছি। স্বাচ্ছভাবে সম্পাদক পদে ভোট ফ্রেশ গণনা করে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল প্রকাশ করা হবে।”
গত ১৫ ও ১৬ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে ৫১টি বুথে সমিতির ২০২২-২৩ মেয়াদের কমিটি গঠনে ভোটগ্রহণ হয়। মোট ৮ হাজার ৬২৩ জন ভোটারের মধ্যে দুই দিনে ভোট দেন ৫ হাজার ৯৮৩ জন।
১৭ মার্চ রাতে ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, সভাপতিসহ ছয়টি পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাদা প্যানেল এবং সম্পাদকসহ আটটি পদে বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেলের প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছে।
তখন সম্পাদক পদে ক্ষমতাসীন প্যানেলের প্রার্থী ভোট পুনর্গণনা আবেদন করেন।
ওই অবস্থায় দুই পক্ষের হট্টগোলের মধ্যে ফল ঘোষণা না করে স্থান ত্যাগ করেন নির্বাচন পরিচালনা উপ কমিটির সদস্যরা।
সাদা প্যানেলে যারা
সরকার সমর্থক বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ সমর্থিত সাদা প্যানেল থেকে সভাপতি পদে মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সহ-সভাপতি পদে মো. শহীদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ হোসেন এবং সম্পাদক পদে মো. আবদুন নুর (দুলাল) এবার প্রার্থী হন।
কোষাধ্যক্ষ পদে প্রার্থী হন মো. ইকবাল করিম, সহ-সম্পাদক পদে এ বি এম হামিদুল মিসবাহ ও মো. হারুন অর রশিদ।
সদস্য পদে এ প্যানেলের সাত প্রার্থী হলেন- ফাতেমা বেগম, হাসান তারিক, মো. মনিরুজ্জামান রানা, মুনমুন নাহার, শফিক রায়হান শাওন, শাহাদাত হোসাইন (রাজিব) ও সুব্রত কুমার কুণ্ডু।
নীল প্যানেলে যারা
বিএনপি সমর্থক জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলের (নীল প্যানেল) সভাপতি পদে প্রার্থী হন মো. বদরুদ্দোজা (বাদল)। সহ সভাপতি পদে মনির হোসেন ও মো. আসরারুল হক, সম্পাদক পদে রুহুল কুদ্দুস (কাজল) প্রার্থী হন।
কোষাধ্যক্ষ পদে প্রার্থী হন মোহাম্মদ কামাল হোসেন, সহ সম্পাদক পদে মাহফুজ বিন ইউসুফ ও মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান খান।
এ প্যানেলের সাতটি সদস্য পদে লড়েন ফাতিমা আক্তার, কামরুল ইসলাম, মাহদীন চৌধুরী, মো. আনোয়ারুল ইসলাম, মো. গোলাম আক্তার জাকির, মো. মঞ্জুরুল আলম (সুজন) এবং মো. মোস্তফা কামাল বাচ্চু।
এর বাইরে সভাপতি পদে এবারও মো. ইউনুস আলী আকন্দ প্রার্থী হন। সভাপতি পদে নতুন প্রার্থী হিসেবে নাম লেখান তানিয়া আমীর, তিনি সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি এম আমীর উল ইসলামের মেয়ে।
গত বছর এ নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। আর রুহুল কুদ্দুস কাজল টানা দ্বিতীয়বারের মতো সম্পাদক নির্বাচিত হন।
পরে মতিন খসরুর মৃত্যুতে সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ সমর্থক অংশ সভাপতি হিসেবে এ এম আমিন উদ্দিনের নাম ঘোষণা করলে বিএনপি সমর্থকরা আপত্তি তোলে। এ নিয়ে বিশেষ সাধারণ সভায় হট্টগোলও হয়।
