একটা বটগাছ। তাকে গিয়ে গ্রামের দৃশ্য, যেমনটা ছোটদের আঁকিবুকিতে দেখা যায়। আছে চা আর মিষ্টির দোকান, আছে নিত্যদিনের রহস্য। তবেআনন্দে ভরপুর এখানকার বাসিন্দাদের সহজ নদীর মতো জীবন।
সেই জীবনের পার থেকে প্রথমেই তারা দর্শকদের ছুঁড়ে দেয় আমন্ত্রণের গান, ‘এসো পাশে বসো- হেসে হেসে মজার দেশে ছুটে যাব; সেথায় তুমি ভাবতে পারো ইচ্ছেমতো। চাইতে পারো ইছেমতো ইচ্ছে যত।’ লাগামহীন কল্পনার ঘোড়া ছুটিয়ে সীমাহীন ইচ্ছের বাঁধ ভেঙে দিয়ে ‘চলছে গাড়ি সিসিমপুরে’।
২০০৫ সালের পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশের পর্দায় প্রথম দেখা যায় কল্পনা আর বাস্তবে ঘেরাসেই অন্য জগত, সে জগতে আছে অভিমানী ইকরি, ভোজনরসিক হালুম, জ্ঞানী শিকু, মিশুক টুকটুকি এবং মজার মজার আরো সব চরিত্র। শিশুতোষ এ জগতে জেন্ডার সমতা থেকে শুরু করে জাতিবৈচিত্র্যের মতো অনেক ভারিক্কি বিষয়ও হালকা চালে, গানের ছলে, গল্পের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়। বেশ দ্রুতই শিশু-কিশোরদের জন্য সাপ্তাহিক অপেক্ষার ছুতো হয়ে উঠলো সিসিমপুর নামের এই জগতটি। সেই জের ধরে আজো প্রতি বছর ১৫ এপ্রিল পালন করা হয় সিসিমপুর দিবস।
সিসিমপুরের জন্মটা বহু আগের একটি আমেরিকান টেলিভিশন প্রোগ্রাম থেকে। সিসেমি স্ট্রিট। যুক্তরাষ্ট্রের ইংরেজিভাষী এই অনুষ্ঠানটির প্রথম পর্ব প্রচারিত হয় ১৯৬৯ সালে, তখন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের কাল। ২০০০ সাল পর্যন্ত ছিল অনুষ্ঠানটির প্রচারকাল। ইতিহাসের সর্বদীর্ঘ টেলিভিশন শোগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। বিনোদন ও শিক্ষা- দুই উদ্দেশ্য পূরণেই সফল যাত্রা ছিল সিসেমি স্ট্রিটের। শিশুদের প্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে ছিল এলমো, বিগ বার্ড, অ্যাবি প্রভৃতি। এই অনুষ্ঠানটির স্রষ্টা ছিলেন জোয়ান গ্যানজ ও লয়েড মোরিস্টেট।
সিসিমপুরকে এই সিসেমি স্ট্রিটেরই একটি বাংলাদেশী সংস্করণ বলা চলে। ইউএসআইডির প্রাথমিক অর্থায়নে সিসেমি ওয়ার্কশপ বাংলাদেশের নির্মাণে অনুষ্ঠানটির প্রচার হয়। সিসেমি স্ট্রিটের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মাপেট। সেই মাপেটদের আমরা দেখি সিসিমপুরেও। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গল্প, গান আর খেলার ছলে বন্ধুত্ব, সহযোগী মনোভাব। সামাজিক মেলবন্ধনের শিক্ষা পায় কোমলমতি দর্শকেরা।
গুণী ময়রার দোকানের আশেপাশে ঘটা সব মজার ঘটনার মধ্য দিয়ে, হঠাৎ আসা কোনো অতিথির আবির্ভাবে, নিজেদের মধ্যে জন্ম নেয়া জটিল সমস্যার সহজ সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া ইত্যাদি নিত্যনতুন সৃজনশীলতার মাঝেই সিসিমপুরের সাবলীলতা। শিশুদেরকে সাবলম্বী হবার পথেও এগিয়ে নিতে চায় সিসিমপুরের সদস্যরা। শিকু–হালুম–ইকরি-টুকটুকির বহুমাত্রিক চরিত্রের মধ্য দিয়ে শিশুরা জানতে পারে মানব চরিত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কথা। কেউ খুব মিশুক হয়ে সবার সাথে সহজে মিশে যায় তো কেউ একটু ভাবুক প্রকৃতির। কেউ সারাক্ষণই নতুন নতুন ফন্দি আঁটছে তো কেউ শুধু খাওয়াদাওয়া নিয়েই চিন্তায় মশগুল।
চেহারা, লিঙ্গ, ব্যক্তিত্বের সবক’টা ফারাক ছাড়িয়ে তবু এরা সবাই বন্ধু- এই গভীর বার্তাটাও শিশুমনে বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে শেখায়। সিসিমপুর মূলত প্রচারিত হতো শুক্রবার সকালে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় কর্মজীবী বাবা-মায়েরা এ সময়টাতে বাসায় থাকবেন, শিশুদের টেলিভিশন দেখার সময়টুকু পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন- হয়তো এ ধারণা থেকেই প্রচারের সময়টা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বই পড়ার প্রতি শিশুদের আগ্রহ সৃষ্টি করতেও সিসিমপুর ছিল বদ্ধপরিকর। তাইতো টুকটুকিকে দেখা যায় সময় পেলেই দুই বেণী ঝুলিয়ে বই পড়তে বসে যায়। প্রিয় বন্ধু ডাকপিয়ন লাল মিয়ার চলে যাওয়ার পর তার স্মরণে সিসিমপুরবাসীরা গড়ে তোলে একটি গ্রন্থাগার। গুণী ময়রার স্ত্রী আশাকে দেখা যায় সেই গ্রন্থাগারের দায়িত্ব নিতে। রং, সংখ্যা, বর্ণমালার মতো মৌলিক শিক্ষার বিষয় থেকে শুরু সিসিমপুরে সবসময়ই থাকতো দেশ-বিদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির নানান ঘটনার সচিত্র বর্ণন।
মৌলিক অনুষ্ঠান সিসেমি স্ট্রিট যেমন তখনকার সময়ে, সেই অঞ্চলে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তেমনি ব্যাপক সাফল্যের মুখ দেখে বাংলাদেশের সিসিমপুরও। ২০০৬ সালে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাকোর্ডিং টু সিসেমি স্ট্রিট’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র মুক্তি পায়, যাতে সিসেমি স্ট্রিটের সাথে উঠে আসে সিসিমপুরের জগতের গল্পও।
২০০৭ সালে এসিপিআর থেকে একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়। তাতে প্রাপ্ত ফলাফল থেকে জানা যায়, সিসিমপুরের দর্শক শিশুরা তাদেরই সমবয়সী শিশু, যারা সিসিমপুর দেখে না- তাদের চাইতে ভাষা, গণিত এবং এমনকি সংস্কৃতি বিষয়েও বেশি পারদর্শী। অধিকাংশ সময় বিটিভিতে এবং পরবর্তী সময়ে মাছরাঙা ও দুরন্ত টিভিতে প্রচারিত এই অনুষ্ঠানটি এমনই গভীর ছাপ রাখতে পেরেছিল শিশুমনে।
সিডি কিংবা ডিভিডি ক্যাসেটের পাশাপাশি সিসিমপুরের গল্পগুলো নিয়ে ছাপা হয়েছে বইও। এছাড়া ইউটিউবেও দেখতে পাওয়া যায় পুরনো এপিসোডগুলো। প্রতি একুশে বইমেলায় সিসিমপুরের সদস্যদের সাথে দেখা করতে সিসিমপুর কর্নারে জড়ো হয় চঞ্চল ভক্তবন্ধুদের ঢল।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন। anindetamonti3@gmail.com
