মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়- নিজের রচিত এই কথামৃতকে ভুল প্রমাণ করে শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছেন আমাদের হৃদয়ে, আমাদের মগজে।
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মৃত্যু নেই, মৃত্যু নেই সেই জাতির কাছে যাদের জন্য দীপ্তি বিকাশ করতে গিয়ে নিজেরা পৌঁছে গেছেন বধ্যভূমির অন্ধকারে।
শহীদ মুনীর চৌধুরীর 'রক্তাক্ত প্রান্তর,' 'কবর, শহীদ আনোয়ার পাশার 'রাইফেল রোটি আওরাত,'শহীদুল্লাহ কায়সারের 'সারেং বউ,' 'সংশপ্তক, জহির রায়হানের 'আরেক ফাল্গুন,' 'একুশের গল্প,' 'হাজার বছর ধরে,' 'বরফ গলা নদী,' 'শেষ বিকেলের মেয়ে,' ইত্যাদি সাহিত্যকর্ম দেশের সাহিত্যকর্মের সোনালি যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এছাড়াও শহীদ আলতাফ মাহমুদের সুর করা আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গানটি আমাদের ভাষা আন্দোলনের চেতনার ধারক ও বাহক। জহির রায়হানের চলচ্চিত্র 'জীবন থেকে নেয়া,' 'স্টপ জেনোসাইড,' 'লেট দেয়ার বি লাইট,' 'আনোয়ারা,' 'বেহুলা,' ইত্যাদি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে সবচেয়ে আলোড়িত সিনেমাগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
রাইফেল রোটি আওরাত
শহীদ আনোয়ার পাশা রচিত এ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসটি রচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন; সেই সময়ের রচিত একমাত্র উপন্যাসও এটিই।
চারদিকে যখন যুদ্ধের নির্মমতা, ধ্বংস আর মৃত্যুর খেলা, শকুনের ছায়া, তখন জীবন বাঁচানোই অর্জন। কিন্তু এরও মধ্যে কখনো পাওয়া যায় সাহিত্যিক আনোয়ার পাশার মতো ব্যতিক্রমী জীবনীশক্তি। জীবন- মৃত্যুর অনিশ্চয়তার মধ্যেও যিনি বেছে নিয়েছিলেন শিল্প।
রাইফেল রোটি আওরাত নামটি এসেছে মূলত পাকিস্তানি হানাদারদের স্থুল জীবনপরিক্রমার উপর ভিত্তি করে। ৭১ এ যেখানেই বাঙালি পেয়েছে, রাইফেল তুলে নিয়েছে নির্বিচারে, হত্যা করেছে শিশু, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, অসংকোচে। ক্ষুধায় পেটে রোটি চালান আর রাতে তাদের ভাষায় 'আওরাত নিয়ে ফুর্তি' - যে পরিক্রমায় বীরাঙ্গনা বাংলার দুই লাখেরও বেশি নারী।
উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে ২৫ মার্চ, ইতিহাসের নিকৃষ্ট গণহত্যার চাক্ষুষ বিবরণ। বর্ণিত হয়েছে সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত চলে আসা শোষণ ও পাকিস্তানী অপশাসন। বর্ণিত হয়েছে উনসত্তরের গণভ্যুত্থানের উত্তাল সময়, অধ্যাপক শামসুজ্জোহার মৃত্যু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ। আরো আছে ইয়াহিয়ার বিশ্বাসঘাতকতা, কালরাত্রি, অতপর বাঙালির আবার জেগে ওঠার প্রতিজ্ঞা।
গল্পের মূল সময়কাল স্বল্প, ৭১ এর ২৫ শে মার্চ থেকে এপ্রিলের প্রথম ভাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ার পাশার এ রচনায় উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহীন নামের মূল চরিত্র। ২৫ মার্চের ভয়াল আক্রমণে তার টিচার্স কোয়ার্টারের সবাই মারা গেলেও বেঁচে যান সুদীপ্ত ও তার পরিবার। শিক্ষক হয়ে সে রাতে ছাত্রদের রক্ষা করতে না পারা, ব্যতিক্রমী হয়ে নিজের জীবিত থাকার অপরাধবোধে ভুগতে থাকেন তিনি।
সংশপ্তক
বাংলা সাহিত্যে শহীদুল্লাহ কায়সারের অমর রচনা 'সংশপ্তক' (১৯৬৫), যার আভিধানিক অর্থ দাঁড়ায় যে সৈনিকেরা জীবনমরণ পণ করে যুদ্ধে লড়ে।
'সংশপ্তক' এদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে হিন্দু ও মুসলমানের সাধারণ জীবন সম্পর্কে রচিত এবং অসাম্প্রদায়িক বসবাসের অনুভূতি দ্বারা অনুপ্রাণিত একটি রচনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলনের একটি নিপুণ প্রেক্ষাপট প্রাসঙ্গিকভাবে ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসে।
দীর্ঘ আয়তনের এ বইটিতে রয়েছে অনেক চরিত্রের সম্মেলন। তবে সবচেয়ে আলোচিত - পুরুষ শাসিত মুসলিম সমাজে নারীর বিদ্রোহ। উপন্যাসের সূচনা হয়েছে গ্রাম্য বিচারে হুরমতির লাঞ্ছনায় এবং সমাপ্তি ঘটেছে বিপ্লবী জাহেদের রাজনৈতিক গ্রেফতার ও তার ফিরে আসার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে।
উপন্যাসে ঢাকা ও কলকাতার নাগরিক জীবনের সঙ্গে বাকুলিয়া ও তালতলি গ্রামের গ্রামীণ জীবনের সাথে সমগ্র বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে সমকালীন ভূমি ব্যবস্থার আবহও।
রক্তাক্ত প্রান্তর
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান নাট্যকার শহীদ মুনীর চৌধুরী, যার প্রথম প্রকাশিত নাটক 'রক্তাক্ত প্রান্তর। আকর্ষণীয় কাহিনী, উপযুক্ত চরিত্র-চিত্রণ, যথাযথ সংলাপ ও সুষ্ঠু পরিবেশনায় নাট্যবোদ্ধারা এ নাটককে আখ্যায়িত করেছেন শিল্পসফল এক রচনা হিসেবে।
পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের কাহিনী নিয়ে নির্মিত তিন অঙ্কবিশিষ্ট নাটকটির আটটি দৃশ্যের চারটি দৃশ্যই ট্র্যাজেডি নির্ভর। এ ট্র্যাজেডি নাটকটি ইতিহাস-নির্ভর হলেও কাহিনীতে রয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিক ও ব্যাপকতা যা নিয়ে নাট্যকারের দৃঢ় উচ্চারণ আমি নাটকের বশ, ইতিহাসের দাস নই।
মারাঠা আর মুসলমানদের দ্বন্দ্বখচিত এ নাটকের প্রধান চরিত্রগুলো মূলত অভিজাত শ্রেণির। চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে জোহরা, ইব্রাহিম কার্দি, নজীবদ্দৌলা, সুজাউদ্দোলা, আহমদ শাহ আবদালী, প্রমুখ।
'৭১ এর ১৪ ডিসেম্বরের শহীদেরা, যারা সাহিত্য- সংস্কৃতি থেকে শুরু করে বাংলাদেশ গঠনে নতুন ভোর দেখিয়ে গিয়েছেন - জাতি তার এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আজীবন স্মরণ করবে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়। আর তারা বেঁচে থাকবেন তাদের অমর সৃষ্টিগুলোর মাঝে।
ফারিয়া ফাতিমা স্নেহ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।
fariasneho@gmail.com