সার্জেন্ট স্টাবি: বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়া সাহসী কুকুর


সিরাজুল আরিফিন | Published: July 21, 2022 14:57:43 | Updated: July 22, 2022 11:55:40


সার্জেন্ট স্টাবি

যুদ্ধক্ষেত্রে তখনো পোষা প্রাণী সঙ্গে নেয়ার অনুমতি নেই। হঠাৎ করেই যুদ্ধজাহাজের কমান্ডিং অফিসার লক্ষ্য করলেন এক সেনার সাথে একটি কুকুর রয়েছে। অফিসার যখন রেগে কাঁই হবার জোগাড়, তখনই ছোট্ট কুকুরটি সামনের পা তুলে স্যালুট দিয়ে দাঁড়ালো। আর এতেই অফিসারের রাগ গলে হয়ে গেলো পানি। অভিভূত হয়ে অনুমতি দিলেন কুকুরটিকে সঙ্গে রাখার। সেই কুকুরটিই সার্জেন্ট স্টাবি।

১৯১৭ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে সামরিক প্রশিক্ষণের সময় ছোট্ট কুকুরছানা স্টাবিকে কুড়িয়ে পান প্রাইভেট রবার্ট জুনিয়র কনরয়। পরে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পর দ্রুতই অন্য সৈনিকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে স্টাবি। সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের সাথে নিজেকেও করতে থাকে প্রস্তুত। কিছুদিনের মধ্যেই স্টাবি শিখে যায় পা তুলে স্যালুট দেয়া, বাগল কল ও মার্চিং এর সাথে অভ্যস্ত হওয়া। ধীরে ধীরে সে হয়ে যায় ১০২ ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নের অন্যতম সদস্য।

প্রাইভেট রবার্টের সাথে স্টাবি

প্রাইভেট রবার্ট যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য জাহাজে চেপে বসেন, তখন লুকিয়ে সাথে রেখেছিলেন স্টাবিকে। যদিও পরে স্যালুট দেয়ার সেই মজার ঘটনার কারণে স্টাবিকে আর সমস্যায় পড়তে হয়নি। ১৯১৮ সালের ৫ মে, মার্কিন সৈন্যদের সাথে স্টাবি পৌঁছে যায় ফ্রান্সে। সেখানে প্রচণ্ড গোলাগুলি আর বিস্ফোরণের শব্দের সাথে দ্রুতই সে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সেখানেই স্টাবি প্রথম বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু হাসপাতালে সেবা শুশ্রুষার পর সে সুস্থ তো হয়ই, এর পাশাপাশি তার নাক হয়ে ওঠে আরো সংবেদনশীল।

গ্যাস মাস্ক পরিহিত স্টাবি

প্রথম দুর্ঘটনার পর থেকে স্টাবি খুব সহজেই বিষাক্ত গ্যাস চিহ্নিত করতে পারতো। একবার জার্মানরা মার্কিনদের ঘুমের মধ্যে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে দিলে স্টাবি তা বুঝতে পারে এবং চিৎকার চ্যাঁচামেচির পাশাপাশি মার্কিন সৈন্যদের জামা-জুতা ধরে কামড়ে টানাটানি করতে থাকে। এতে করে সৈন্যদের ঘুম ভাঙে এবং তারা সে যাত্রা প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হয়।

শুধু নাক নয়, স্টাবির কানও ছিল দারুণ। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতে থাকতেই সে জার্মান আর ইংরেজির পার্থক্য বুঝতে শেখে। একবার জার্মান এক গুপ্তচরের মুখে অন্য ভাষার ডাক শুনেই স্টাবি বুঝে ফেলে লোকটি মার্কিন নয়। এরপর সে ডাকতে থাকে এবং লোকটিকে আক্রমণ করে আমেরিকান সৈন্যরা আসার আগ পর্যন্ত আটকে রাখে। এরপরই স্টাবিকে আমেরিকার প্রথম কুকুর হিসেবে সার্জেন্ট উপাধি দেয়া হয়।

মার্কিন পতাকা গায়ে জড়িয়ে স্টাবি

যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকা সৈনিকদের মুখে ইংরেজিতে কথা শুনলে সে মেডিকেল কোরের সৈনিক না আসা পর্যন্ত অনর্গল ডাকতে থাকতো। এভাবে সে বহু আহত সৈনিকের জীবন রক্ষা করেছে। এছাড়া নিজে থেকে শত্রুর খোঁড়া পরিখা পার হতে পারা এবং কামানের গোলার শব্দ মানুষের আগে শুনতে পেয়ে সৈনিকদের সতর্ক করা - ইত্যাদি গুণ ছিল স্টাবির।

নিজের কোট গায়ে স্টাবি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৮ মাস যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে সর্বমোট ১৭ টি যুদ্ধে অংশ নেয়া স্টাবি যখন আমেরিকায় ফিরে আসে, তখন সে রীতিমত তারকা বনে যায়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের সাথেও সাক্ষাৎ করে স্টাবি। দুইবার সে ঘুরে আসে হোয়াইট হাউজে এবং সাক্ষাৎ পায় রাষ্ট্রপতি কেলভিন কুলিজ ও ওয়ারেন হারডিং এর। এছাড়া কয়েকটি সামরিক প্যারেডে স্টাবি অংশ নিয়েছিল।

সামরিক প্যারেডে অংশগ্রহণকালে

যুদ্ধক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য স্টাবিকে দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন পদক। এর মধ্যে তিনটি সার্ভিস স্ট্রাইপ, ইয়াংকি ডিভিশন প্যাচ, ফ্রেঞ্চ মেডেল, ফার্স্ট এনুয়াল আমেরিকান লিজিওন কনভেনশন মেডেল, নিউ হেভেন ভেটেরানস মেডেল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বলাই বাহুল্য, স্টাবি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পদকপ্রাপ্ত কুকুর। মার্কিন সেনাবাহিনীর ২৬ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের মাস্কট এই স্টাবি।

নাম ও পদকসহ ইউনিফর্মে সার্জেন্ট স্টাবি

যুদ্ধ শেষ হলে প্রাইভেট রবার্ট সামরিক বাহিনী ছেড়ে আইন নিয়ে পড়তে চলে যায় জর্জটাউনে। সেখানেই জীবনের বাকি অংশ কাটে স্টাবির। জর্জটাউন ফুটবল দলের মাস্কট ছিল স্টাবি। খেলার মাঠে দর্শকদের মাঝে মাঝেই সে মাতিয়ে রাখতো।

৯ বা ১০ বছর বয়সে ১৯২৬ সালে ঘুমের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করে স্টাবি। মৃত্যুর পর তার দেহ সংরক্ষণ করে রাখা হয় স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটে। এখনো সেখানেই স্টাবির দেহাবশেষ রাখা আছে; সঙ্গে আছে স্টাবির পাওয়া সকল পদক।

স্টাবিকে নিয়ে লেখা হয়েছে বিভিন্ন বই। এর মধ্যে স্টাবি: অ্যা ট্রু স্টোরি অব ফ্রেন্ডশিপ, স্টাবি দ্যা ওয়ার ডগ: দ্যা ট্রু স্টোরি অব ওয়ার্ল্ড ওয়ার ওয়ানস ব্রেভেস্ট ডগ, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, ২০১৮ তে স্টাবির জীবনের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র সার্জেন্ট স্টাবি - অ্যান অ্যামেরিকান হিরো।

সিরাজুল আরিফিন বর্তমানে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

sherajularifin@iut-dhaka.edu

Share if you like