দিনের ক্লান্তি শেষে একটুখানি আদুরে স্পর্শ পাওয়া কিংবা পড়াশোনা শেষ করে গল্পে গল্পে পরীদের রাজ্যে বেড়াতে যাওয়া, দাদি-নানীদের গল্পে হেসে গড়াগড়ি খাওয়া-- এসবের মাঝে শৈশব কেটেছে অনেকের।
তবে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হওয়া বিশ্বে চার দেয়ালের জীবন থেকে শুরু করে বহির্বিশ্বের সাথে দৈনন্দিন সংগ্রামের প্রতি ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে।
শওকত আলীর বয়স ৬৬, জন্ম পুরান ঢাকার লক্ষীবাজারে। বর্তমানে রাজধানীর নারিন্দার অধিবাসী এই প্রবীণ। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন তার ছোটবেলার সবটুকু কেটেছে নানীর সাথে। দিনে স্কুল বা ভিক্টোরিয়া পার্কে বন্ধুদের সাথে আড্ডা তারপর থেকে এক দৌঁড়ে চলে যেতেন নানীর কাছে।
"নবদ্বীপ বসাক লেনের চার মাজারের বাড়ি সবার কাছেই পরিচিত। এখানেই আমার নানী বাড়ি। রাতে নানীর কাছে আসার সময় নানী গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকতো, যাওয়ার সময়ও তাই, যেন আমি ভয় না পাই। আমার কুরআন, হাদীস থেকে যাবতীয় ধর্মীয় জ্ঞান নানীর কাছে থেকেই শেখা, বলেন তিনি।
নানীর কাছে গিয়ে কখনো খালি হাতে ফিরতে হয়নি। রাতে যাওয়ার পর, সকালে ফিরার সময় দুই আনা দিয়ে দিতেন। আবার সকালের গ্লাস ভর্তি দুধের সর তো আছেই। আমরা সাত ভাইয়ের মধ্যে নানীর সবচেয়ে কাছে আমিই ছিলাম। নানী তার শেষ নিঃশ্বাস আমার হাতেই ত্যাগ করেন।
জীবনের বহু চড়াই উৎরাই দেখা শওকত পরিবারের মুরুব্বিদের সাথে বর্তমানে শিশুদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখেছেন। তিনি বলেন, "আমরা যারা জীবিকা আর পরিবারের জন্য শহরে ছেড়ে গিয়েছিলাম বা অনেকে আছে যারা বিভিন্ন ধরনের সুবিধার জন্য মা-বাবার থেকে আলাদা বসবাস করা শুরু করেছিল, তাদের সন্তানেরা কিন্তু ঈদ বা পূজা ব্যতীত তাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানীকে কাছে পায় নি। এর দায় আমাদেরই। আমি যেখানে পুরো শৈশব নানীর সাথে অতিবাহিত করেছি আমার সন্তানদের কিন্তু তা করার সুযোগ দিই নি।"
জীবন যাত্রায় অনেক পরিবর্তন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, চাকরি ও নিজের ভবিষ্যৎ, বিয়ে ও সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব - সম্পর্কের পরিবর্তনের জন্য তিনি দায়ী করেন এ বিষয়গুলোকে। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করেন বাচ্চাদের পড়াশোনা চাপ, ক্যারিয়ার, টাকার পিছনে ছুটে চলা, প্রযুক্তির উত্তরোত্তর উন্নতি, সম্পর্কের মাঝে দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এস.এম.শাদমান ইসলাম সম্পর্কের পরিবর্তনের জন্য দুটি প্রধান দিক উল্লেখ করেন। এক হলো সন্তান প্রতিপালনে বাবা-মায়ের ভূমিকা, আরেকটি প্রযুক্তির অত্যধিক ব্যবহার।
বাবা-মা বাচ্চার মন ভোলানোর জন্য কারণে-অকারণে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্টফোন-ট্যাবলেট। এসব শিশুদের শৈশবের উল্লেখযোগ্য একটি সময় কাটে প্রযুক্তির সাথে। ফলে পরিবারের অন্যান্য সদস্য, বিশেষ করে বয়োঃবৃদ্ধদের সাথে সময় কাটানোর প্রবণতা কমে যায়।
এস.এম.শাদমান ইসলাম বর্তমানে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ১৩তম সেমিস্টারে অধ্যয়নরত।
শাদমান সম্পর্কের এই পরিবর্তনটিকে নেতিবাচকভাবেই দেখেন।
"আমি মনে করি তাদের সাথে বাচ্চাদের দূরত্ব কমে যাওয়া ফলে বর্তমানে শিশুদের ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আসছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি লক্ষ্য করা যায় পারিবারিক রীতিনীতি বা মূল্যবোধের জায়গায়। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলো থেকে ভার্চুয়াল জীবনের সম্পর্ক গুলো অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। এতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা যেমন- হতাশা, বিষণ্ণতা ও একাকিত্বও দেখা যায়।
ওয়াচ ট্যাগ নামে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং পার্টনার সুদয়। তিনি মনে করেন, জীবনের নানা দিক সম্পর্কে দাদা-দাদি বা পরিবারের বয়স্কদের অনেক অভিজ্ঞতা কাজে লাগে।
তিনি বলেন, "ছোট বেলায় দাদার কোলেই বড় হয়েছি। তার মুখে শহরের দিন গুলোর অনেক গল্প শুনেছি। কীভাবে কাজ করতেন, কীভাবে থাকতেন, শহরে একা টিকে থাকার দিনগুলো নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবিরত বলতে পারতেন। আমি মুগ্ধ হয়ে সেই গল্পগুলো শুনতাম।
বর্তমানে আমি যখন শহরে থাকি, দশ জন মানুষের সাথে কথা বলি, কাজ করি, তখন পদে পদে তার অভিজ্ঞতাগুলো মনে পড়ে। তিনিই বলেছেন, যদি টিকে থাকতে চাও তাহলে ধৈর্য্য ধরো, সবার সাথে সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলো," বলেন সুদয়। তিনি মনে করেন, আজকের শিশুরা এই সখ্যতা, শিক্ষা, আড্ডা ও অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত।
তবে সময় পাল্টালেও দাদি-নানীর সাথে শিশুদের সখ্যতা একেবারেই শেষ হয়ে যায়নি। এর উদাহরণ চার বছরের ছোট্ট শিশু আমরিন। আমরিন বাবা-মা ও দাদা-দাদির সাথে নারিন্দাতেই থাকে।
৯০ এর দশকের শাদমান কিংবা ৫০ এর দশকে জন্মানো শওকত আলীর মতো ছোট্ট আমরিনের শৈশবও কাটছে দাদা-দাদির আদরে। মা সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকলে দাদির কোলে আদর পায় আমরিন। সময় হলে খাওয়া-দাওয়া আর ঘুমানোর সময় দাদির কাছে যেতেই পছন্দ করে সে।
আবার দাদা কাজ থেকে ফিরলেই সারাদিনের জমিয়ে রাখা কথাগুলো বলতে ভুলে না সে। এভাবেই দাদা-দাদির আদরে কেটে যাচ্ছে তার শৈশব। পার্থক্য শুধু, দাদা-দাদির আদরের সাথে যোগ হয়েছে মোবাইল ফোনের গেইম আর টিকটকের ভিডিও।
মোঃ ইমরান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
mohd.imranasifkhan@gmail.com