Loading...

সবুজে সুস্থতা

| Updated: July 16, 2021 13:37:34


সবুজে সুস্থতা

শরীরের যেকোনো জটিলতায় কিংবা অসুস্থতায় আপনি চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের কাছে গেলে তারা আপনাকে ঔষধের সাথে শাকসবজি খাওয়ার পরামর্শ দেবেনই। আর ডায়েট সংক্রান্ত চিকিৎসা হলে তো কথাই নেই। নিয়মিত শাকসবজি আপনাকে খেতেই হবে। সবুজ শাকসবজিকে বলা হয় পুষ্টির শক্তিকেন্দ্র। অনেকে মনে করেন, পুষ্টিকর খাবার মানেই মাছ-মাংস। কিন্তু প্রোটিন, পটাশিয়াম, আয়রন, প্রায় সবরকমের ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, ফলিক এসিডসহ নানা ধরনের পুষ্টি থাকে সবুজ শাকসবজিতে। মানুষের বিভিন্ন জটিল ও মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচাতে পারে এই সবুজ খাবারগুলো। কোন সবুজ শাকসবজিতে কী পরিমাণ পুষ্টি আছে, কোনটি কোন রোগের কাজ করে, তা নিয়ে আমাদের আজকের লেখাটি।

পালং শাক

পালং শাকে ক্যালরির পরিমাণ খুবই কম থাকে। ওজন কমাতে কম ক্যালরিযুক্ত খাদ্য প্রয়োজন। এই শাকে প্রচুর আয়রন থাকে। এই শাক খেলে রক্তে আয়রনের মাত্রা বাড়ে। কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অন্য যেকোনো সমস্যায় পালং শাক বেশ উপকারী। পালং শাকের রসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ এবং ‘ই’ রয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’ বিভিন্ন প্রকার চোখের অসুখ দূর করে। বিশেষত চোখের ম্যাকুলার ক্ষয়ের ঝুঁকি হ্রাস করে।

কলমি শাক

কলমি শাক খাবার হজমে সহায়তা করে এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক রাখে। কলমি শাককে বসন্ত রোগের প্রতিষেধকও বলা হয়। পরিমিত ও সঠিক পরিমাণে এ শাক খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও কলমি শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম। এটি হাড় ও দাঁত মজবুত করতে সাহায্য করে। কলমি শাকে পর্যাপ্ত পরিমানে লৌহ থাকে। মানুষের সারা দেহে প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ ঠিক রাখতেও কলমি শাক ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

কচু শাক

কচু শাকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। আয়রন রক্তশূন্যতার রোগীদের জন্য বিশেষভাবে কাজে আসে। কচুশাকে থাকা ভিটামিন ‘এ’ রাতকানা, চোখে ছানি পড়াসহ চোখের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধসহ দৃষ্টিশক্তি বাড়িয়ে দেয়, ভিটামিন ‘সি’ শরীরের ক্ষত সারাতে সাহায্য করে আর ভিটামিন ‘কে’ রক্তপাতের সমস্যা প্রতিরোধ করে। এছাড়া এ শাকে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ থাকে। এসব আঁশ সহজে খাবার হজমে সহায়তা করে।

আমাদের শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ সচল রাখতে কচু শাক অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এর আয়রন ও ফোলেট রক্তের পরিমাণ বাড়ায়। এসব ছাড়াও কচু শাকে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাংগানিজ ও ফসফরাস হাকে। আমাদের দাঁত ও হাড়ের গঠনে কচু শাকের এসব উপাদানের ভূমিকা অনেক।

ডাঁটা শাক

ডাঁটাশাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ফলিক অ্যাসিড। এই দুই উপাদান ত্বকের জন্য অত্যন্ত উপকারী। শরীরের জন্য প্রতিদিন যে পুষ্টি প্রয়োজন, তা এই শাক অনেকটা মেটাতে সক্ষম। এতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ত্বক ও চুলের ক্ষয় রোধ করে, মুখের ভেতরের নরম অংশগুলোকে রক্ষা করে। ডাঁটা শাকের ভিটামিন ‘এ’, ‘কে’ এবং আয়রন আছে।

শসা

শসা প্রোটিন পরিপাকে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, কিডনি ও পাকস্থলী প্রদাহ নিরাময়ে কাজ করে। শসায় থাকা স্টেরল উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এতে এরেপসিন নামক এনজাইম থাকায় এটি হজমে সাহায্য করে। শসার রস ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশ উপকারী। শসার ভিটামিন কে, ক্যালসিয়াম আছে। ভিটামিন ‘কে’ হাড়ের ক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে এবং ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। তাছাড়া শসার ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম এবং ভিটামিন ‘কে’ হৃদযন্ত্রের সুস্থতা রক্ষা করতে সাহায্য করে। ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়াম গ্রহণের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

নিয়মিত শসা খেলে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে এবং শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে। শসাতে থাকা ফসফরাস যা হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী মূল পুষ্টি উপাদান। এমনকি এতে থাকা ভিটামিন ‘বি ওয়ান’, ভিটামিন ‘বি ফাইভ’ এবং ভিটামিন ‘বি সেভেন’ মানসিক উদ্বেগ ও চাপ কমাতে সাহায্য করে।

বাঁধাকপি

বাঁধাকপি খুব ভালো ক্যান্সার প্রতিরোধক একটি সবজি। এই সবজি আঁশসমৃদ্ধ হওয়ায় ওজন কমাতে সহায়ক। এতে ক্যালসিয়াম থাকায় এটি হাড়কে করে দৃঢ় ও মজবুত করতেও সাহায্য করে। বাঁধাকপির রস আলসার রোগে বেশ কাজ করে। এছাড়াও বাঁধাকপিতে বিটা ক্যারোটিন নামের একটি পুষ্টি উপাদান আছে, যা চোখের জন্য খুবই ভালো। এ সবজিতে থাকা ফাইটো-কেমিক্যালসমূহ ত্বকের প্রদাহজনিত সমস্যা দূর করতে সক্ষম। বাঁধাকপির ভিটামিন ‘সি’ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

শিম

শিমের খনিজ উপাদান মাথার চুল পড়া কমাতে সাহায্য করে ও চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। শিম কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। এই সবজি গর্ভবতী নারী ও ছোট শিশুদের অপুষ্টি দূর করতে বেশ উপকারী। শিমে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও আয়রন থাকে। শিমের বীজে আমিষ আছে। নিয়মিত শিম খেলে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকে। শিমে সিলিকনজাতীয় উপাদান থাকে, যা হাড় সুগঠিত করতে সহায়তা করে। এছাড়াও শিম বলদায়ক, বায়ু ও পিত্তনাশক।

করলা

করলার রস অ্যালার্জি প্রতিরোধে দারুণ উপকারী। এই সবজি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যও উত্তম। নিয়মিত করলার রস খেলে রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। করলায় প্রচুর পরিমানে বিটা ক্যারোটিন আছে। এই পুষ্টি উপাদান দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে ও চোখের সমস্যা সমাধানে কাজ করে। করলায় প্রচুর পরিমাণে আয়রনও আছে, যা হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে সাহায্য করে। করলায় আছে ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়াম ও যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’। ভিটামিন ‘সি’ ত্বক ও চুলের জন্য জরুরি।

পটল

সবুজ ও তাজা পটল হজমশক্তি বাড়ায়, কাশি, জ্বর, রক্ত পরিশোধিত করে। হার্টের শক্তি বৃদ্ধি, পিত্তজ্বর, কৃমি প্রতিরোধ করে। এই সবজি শরীর শীতল রাখে। ওজন কমাতে ও কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। এমনকি রক্তে চিনির মাত্রা কমাতেও পটল সাহায্য করে।

আমাদের দেশে সারা বছর এসব সবুজ শাকসবজি পাওয়া যায়। বিশেষ করে শীতে এসব শাকসবজি অনেক বেশি ফলে। সাধারণত এগুলোর দামও অনেকটা হাতের নাগালেই থাকে। ফলে যেকোনো শ্রেণিপেশার মানুষ প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এসব খাবার রাখতে পারেন। তবে বর্তমানে শাকসবজিতে নানা ধরনের ক্ষতিকারক পদার্থ মেশানো হয়। কেনার সময় সচেতন থেকে সঠিক ও সতেজ শাকসবজি খেতে পারলে সবজিতে থাকা পুষ্টিগুণ আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখবে, মুক্তি দেবে নানা রোগ থেকে।

ফরহাদুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী।

farhadrahman702@gmail.com

 

Share if you like

Filter By Topic