Loading...

সকালে হাঁটার উপকারিতা

| Updated: May 11, 2021 16:59:24


ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ফিলিস্তিন খান/ফ্লিকার ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ফিলিস্তিন খান/ফ্লিকার

আমাদের প্রাত্যহিক জীবন বিভিন্ন রকমের ব্যস্ততায় ভরপুর। ব্যস্ততা যেন পিছু ছাড়তে চায় না। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরা যেনো পেরে উঠছি না কোনভাবেই। আমরা সবাই ছুটছি কেউ হয়তো স্কুল-কলেজে, কেউ হয়তো অফিস-হাসপাতালে, কেউ বা ঘরের কাজকর্মে অধিক সময় অতিবাহিত করছি। আক্ষরিক অর্থে, পুরো বিশ্বটাই এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। জীবন বদলের এই সময়ে আমরা হয়তোবা আগের মতো ঘুরছি ফিরছি না খুব একটা, এক জায়গায় বসেই দিনের অনেকখানি সময় ব্যয় করছি। কিন্তু আমরা কি জানি, শরীরের জন্য এটা কতখানি ক্ষতিকর?

একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর বাচ্চা থেকে বুড়ো - সব বয়সের মানুষের জন্যই ব্যয়াম দরকারি হয়ে ওঠে। কারণ মানুষের শরীরটাও একটা যন্ত্রের মতো। যন্ত্র দিয়ে যদি কাজ না হয়, একটা সময় পর এতে জং ধরতে শুরু করে, আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাজ করলে যন্ত্রটি ক্ষয় হয়ে যেতে থাকে। তাই কাজের সাথে সাথে সমন্বয় করে আমাদের উচিত শরীরের যত্ন নেওয়া। হাঁটা হলো এমন একটি ব্যয়াম, যা সকল বয়সের মানুষের জন্য উপযুক্ত। হাঁটার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে সমন্বয় ঘটে যা শরীরকে নানাবিধ রোগ থেকেও মুক্ত করে।

দিনের যেকোনো সময়ই হাঁটা যায়, কিন্তু এর জন্য সকালের সময়টাই সর্বোত্তম। অবশ্য কারো যদি সময় সংকট থাকে, তাহলে বিকালে বা রাতেও হাঁটা যেতে পারে। দিনের শুরুতে সতেজ বাতাসে প্রাণ খুলে শ্বাস নেওয়া যায় সকালবেলা। সকালের হাঁটার বিশেষত্ব রয়েছে অনেক, আর তাই সকলের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা সন্দেহাতীত। প্রথমত, যে কারণে সকালে অবশ্যই হাঁটা উচিত তা হলো সাত সকালে প্রকৃতির যে মনোমুগ্ধকর রূপ থাকে, তা আসলে অন্য কোনোসময় পাওয়া যাবে না। সকালের মৃদুমন্দ স্নিগ্ধ বাতাসের মাঝে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যে কতটা শান্তির, তা শুধু একজন সকালে পরিভ্রমণকারী ব্যক্তিই বলতে পারবেন। জার্নাল অব এনভায়রনমেনটাল ফিজিওলজি’র একটি গবেষণায় দেখা যায়, যে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা ২০ মিনিটের জন্য বাইরে হাঁটেন, তারা বাড়ির ভেতরে ২০ মিনিটের জন্য যারা হাঁটেন, তাদের চেয়ে বেশি প্রাণশক্তি অনুভব করেন।

তাছাড়া, শহর এলাকায় সকালে সকল প্রকার যানবাহনের চলাচল একদমই কম থাকে, ফলে কার্বনযুক্ত ধোঁয়ার পরিমাণও বাতাসে সেসময়টায় কম থাকে। সকালে সকল প্রকার পাখ-পাখালির কিচিরমিচির শব্দে মনপ্রাণ ভরে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, সকালে হাঁটার ফলে দেখা যায় আমরা কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতির কাছাকাছি চলে যাই। আমাদের মস্তিষ্কের সমস্ত কার্যকলাপ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়, যার ফলে সকালে আমরা যে কাজই করি না কেন, তার ফলাফল অনেকাংশে ভালো হয়। আমেরিকান ফিজিওলজিকাল অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণায় দেখা যায়, হাঁটাচলা আমাদের মনে ভাবনার একটি অবাধ প্রবাহ উন্মুক্ত করে, যা বসে থাকা অবস্থার চাইতে যেকোনো সমস্যা সমাধানেই অনেক বেশি সহায়ক। তাই কোনো চিন্তায় আটকে গেলে, একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসুন, হয়তো মাথার জট খুলে যাবে!

হাঁটার সাথে সাথে আমাদের পেশিগুলো আরও মজবুত ও শক্তিশালী হয়। দিনের শুরুটা যদি হাঁটা দিয়ে হয়, তবে তা দিন জুড়ে ব্যক্তির পছন্দগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রস্তুত করতে পারে। কিছু সময় হাঁটাচলার পর, নিজেকে আরো সতেজ লাগবে, এক কোনে লেগে থাকা ঘুমগুলোও ভারি করবে না চোখের পাতা। তাই আরো সহজে কাজে লেগে পড়তে পারবেন।

তৃতীয়ত, সকালে হাঁটার ফলে আমাদের শরীর থেকে প্রচুর ঘাম নিঃসৃত হয়, বাতাসের সাথে মিশে শরীরকে স্বস্তি দেয়। আর ক্যালরি খরচের উপরি পাওনা তো আছেই! হেলথ লাইন ডট কমের একটি তথ্যে পাওয়া যায়, মাঝারি গতির ৩০ মিনিটের একটি হাঁটায় একজন ১৫০ ক্যালরি পর্যন্ত দহন করতে পারে। যার ফলে স্থুলতার সমস্যার সমাধান হয়। এছাড়া, অনেকটা ঘাম বেরিয়ে যাবার পর শরীরের হজমক্রিয়া আরও সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে। ক্ষুধামন্দাও দূর হয়।

প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে হাঁটলে তা ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় অনেকটাই। কেউ যদি ডায়াবেটিক রোগী হয়ে থাকেন, তাহলে হাঁটাহাঁটি রক্তে চিনির মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া, হাঁটা একজন মানুষকে দীর্ঘায়ুও করতে পারে।

হাঁটাহাঁটির ফলে রাতে আরো ভালো ঘুম হয়। ন্যাশনাল সেন্টার বায়োটেকনোলোজি ইনফরমেশনের মতে, অনিদ্রাজনিত সমস্যায় ভোগা ৫৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্করা পরবর্তী সময়ে সকাল-সন্ধ্যা ব্যায়াম করে রাতে ভালো ঘুমিয়েছেন। তাছাড়া, গ্রীষ্মকালে সকালে হাঁটার সুবিধা হলো, উষ্ণ জলবায়ুতে বসবাসকারী ব্যক্তি বাইরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির আগেই সকালে হেঁটে ফিরতে পারবেন। এতে অস্বস্তিও রইল না, আর ‘ফিট’ থাকাও হলো।

ফিজিওলজি অ্যান্ড বিহেভিয়ার জার্নালের একটি গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ঘুমের সমস্যা থাকা ১৮ বছর বয়সী তরুণীদের জন্য এক কাপ কফির চেয়ে আরও উৎসাহী ছিল ১০ মিনিটের জন্য সিঁড়ি হাঁটা। ফিজিকাল অ্যাকটিভিটি ফর গাইডলাইনসের মতে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি থেকে তীব্র ধরনের ব্যায়াম করা উচিত।

আমরা অনেকেই হাঁটার আগে বা পরে কী খাব, বা হাঁটার আগে খাওয়া উচিত কি না, এ নিয়ে দ্বিধায় থাকি। আসলে এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক গঠনের উপর। হাঁটার আগে কেউ চাইলে হালকা দুয়েকটি ফল খেয়ে নিতে পারেন। তবে খাবার না খেয়ে হাঁটলে ক্যালরি বেশি পুড়বে, আর ওজন কমবে সহজে।

‘‘আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ; মেইকস আ ম্যান হেলদি, ওয়েলদি অ্যান্ড ওয়াইজ”- সুপরিচিত এই বাক্যটির যে নিগূঢ় অর্থ রয়েছে, তা প্রায়শই ভুলে যাই আমরা। যান্ত্রিক জীবনে প্রযুক্তির আশীর্বাদ কিংবা অভিশাপে রাত পার করে অনেকেই সকালে ঘুমোতে যাই, যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব থেকে যায় আমাদের শরীরে। সুস্থ থাকতে সকালে ওঠার এবং সকালে হাঁটার খুব একটা বিকল্প কিন্তু নেই।

লাবণ্য ভৌমিক বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।

labanyabhowmik1777@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic