গোপালগঞ্জ থেকে পালিয়ে এসে গাজীপুরের একটি মসজিদে ইমামতি করে আসছিলেন তিনি; শুধু তাই নয়, নিজেকে আড়ালে রাখতে চিকিৎসক না হয়েও খুলে বসেছিলেন ‘ক্যান্সার এইডস সেবা কেন্দ্র’।
এতকিছুর পরও শেষ রক্ষা হয়নি কোটালীপাড়ায় বোমা পেতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ মো. এনামুল হকের।
৫৩ বছর বয়সী এ দণ্ডিতকে গত শনিবার রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় র্যাব। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
রোববার দুপুরে কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২০০০ সালের ওই ঘটনার পর এনামুলের দুই দশক পালিয়ে থাকার তথ্য তুলে ধরা হয়।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, এনামুল গোপালগঞ্জ থেকে পালিয়ে এসে গাজীপুরে আশ্রয় নেন। এখানে একটি মসজিদে গিয়ে নিজেকে কারি পরিচয় দিয়ে ইমামতি শুরু করেন।
“তার নাম এনামুল হক হলেও গাজীপুরে এসে নিজের নাম পরিবর্তন করে এনামুল করিম ধারণ করে জাতীয় পরিচয়পত্র বানায়।”
তিনি বলেন, নিজেকে আড়াল করতে এনামুল গাজীপুরে হারবাল চিকিৎসক সেজে ক্যান্সার ও এইডসের মত রোগ নিরাময়ের কথা বলে ‘চিকিৎসা’ দিতেন।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে বোমা পুঁতে হত্যাচেষ্টার ঘটনার আগে মুফতি হান্নানের ভাই আনিসের সঙ্গে এনামুলের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে জানিয়ে কমান্ডার মঈন বলেন, “২০০০ সালে গোপালগঞ্জ শহরে বিসিক শিল্প নগরীতে মুফতি হান্নানের ছোট ভাই আনিসের সঙ্গে যৌথভাবে প্লট বরাদ্দ নিয়ে ‘সোনার বাংলা কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে টুথপেস্ট, টুথপাউডার, মোমবাতি ও সাবান তৈরির একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করে এনামুল।”
“এ ব্যবসার সূত্র ধরে মুফতি হান্নানের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে অন্য জঙ্গিদের নিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে র্যাবকে জানায় এনামুল।”
সংবাদ সম্মেলনে মঈন জানান, শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সাবান তৈরির কেমিকেল সংগ্রহের আড়ালে বিভিন্ন প্রকার বিস্ফোরক দ্রব্য ও বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম ওই কারখানায় জমা করা হয়।
“পরে সেসব কেমিকেল ও সরঞ্জাম লোহার ড্রামের ভিতরে ঢুকিয়ে দুটি শক্তিশালী বোমা তৈরি করে জনসভার কাছে পুঁতে রাখে।”
এ ঘটনায় এনামুলের সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ পেলে প্রথমে ঢাকার মোহাম্মদপুরে এসে আশ্রয় নেয়। পরে উত্তরা ও বনশ্রীতে বাসা ভাড়া করে বসবাস করতে থাকে।
র্যাব কর্মকর্তা মঈন বলেন, “উত্তরায় ২০১৫ সালে সে ‘আই কে হোমিও কলেজ উত্তরা’ নামে একটি হোমিও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে বলে এনামুল র্যাবের কাছে দাবি করেছে। এরপর সে গাজীপুরে গিয়ে স্থায়ী হয়।
“২০১০ সালে এনামুল ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে। এ সময় তিনি গাজীপুরে দীর্ঘদিন ধরে থাকার কারণে তার একটি অবস্থান তৈরি করে।”
সেখানে একটি হোমিওপ্যাথি কলেজে দুই বছর প্রভাষক এবং পরবর্তীতে অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করার কথা এনামুল জানিয়েছে বলে র্যাবের ভাষ্য।
“এছাড়া সে 'ক্যান্সার এইডস সেবা কেন্দ্র' নামে নিজে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ক্যান্সার, এইডসের মত রোগ একশতভাগ ভাল করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিল।”
২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়া শেখ লুৎফর রহমান কলেজের পাশের পুকুরে একটি তার পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ হওয়ায় বিষয়টি পুলিশকে জানান বদিউজ্জামান সরদার নামের এক চা দোকানি। সেই তারের সূত্র ধরে কলেজ মাঠে তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা মঞ্চের নির্ধারিত স্থানে মাটিতে পুঁতে রাখা ৭৬ কেজি ওজনের একটি বোমা পাওয়া যায়।
পরদিন ৮০ কেজি ওজনের আরও একটি বোমা উদ্ধার করা হয় কোটালীপাড়ার হেলিপ্যাড থেকে। ওই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা, হত্যার ষড়যন্ত্র এবং বিস্ফোরক আইনে কোটালীপাড়া থানায় তিনটি মামলা করে পুলিশ।
ওই ঘটনায় করা হত্যার ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় গত বছরের ২৩ মার্চ ১৪ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। তাদের মধ্যে এনামুলসহ পাঁচজন পলাতক ছিলেন।
আর হত্যাচেষ্টার মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১০ আসামির সবার সাজা হাই কোর্টেও বহাল রয়েছে।
