শেখ আবদুল হাকিম মারা গেছেন খবরটা জানতে পারি ফেসবুকে ওমর শেখ মন্টুর একটা পোস্ট থেকে। পোস্টের ভাষা ছিলএ রকম, মাসুদ রানার লেখক সাহিত্যিক আমার খালাতো ভাই শেখ আব্দুল হাকিম আর নেই (ইন্না-লিল্লাহ ওয়া)। পোস্টটা আবার পড়লাম। ভুল দেখছি নাতো! আবারো পড়লাম। সেই সাথে মনে ভেসে উঠলো টুকরো টুকরো অনেক স্মৃতি।
দুই
রহস্যপত্রিকা আঁটঘাট বেঁধে বের হওয়া শুরু হলো ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে, ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। তার আগে ১৯৭০ সালে চারটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর তা থেমে গিয়েছিল। রহস্যপত্রিকার সূত্র ধরেই সেবা প্রকাশনীর তখনকার লেখকদের সাথে পরিচয় হয় আমার। প্রকাশক ও সম্পাদক কাজী আনোয়ার হোসেন ততোদিন মাসুদ রানার স্রষ্টা হিসেবে দেশখ্যাত। সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার। সেবা থেকে একের পর এক বেরুচ্ছে মাসুদ রানা সিরিজের স্পাই থ্রিলার, কিশোর ক্লাসিক, বিশ্বি সাহিত্যের সেরা ক্লাসিকগুলোর কিশোরোপযোগী অনুবাদ, কিশোর থ্রিলার, রহস্য উপন্যাস। রহস্যপত্রিকাও স্বাভাবিকভাবে বাজার মাত করে ফেলল শুরুতেই। সে সময়কার বিভাগীয় সম্পাদকদের অন্যতম ছিলেন হাকিম ভাই। অন্য দুই বিভাগীয় সম্পাদক ছিলেন নিয়াজ মোরশেদ প্রিন্স, এবং রকিব হাসান। আসাদুজ্জামান ছিলেন পত্রিকার শিল্প নির্দেশক। আমি সেখান ফিচার এবং বিজ্ঞান সংক্রান্ত লেখালেখির সুযোগ পেয়ে গেলাম। প্রথমে কাজী ভাই, পরে প্রিন্সের সাথেই বেশি যোগাযোগ রাখতে হতো আমাকে। বলা যায়, প্রিন্সের কারণেই বিজ্ঞান বার্তা বিভাগটি চালু হয়।
ঢাকার তৎকালীন পত্রিকাগুলোতে যে আড্ডা হতো তার মধ্যে সম্ভবত সেরা ছিল রহস্যপত্রিকার সান্ধ্য আড্ডা। চা খেতে চাঁদা দিতে হতো না। চানাচুরের পয়সা দশে মিলে তুলতে হতো না। ও খাতে টাকা বিভাগীয় সম্পাদকদেরকে দিতো কাজী আনোয়ার হোসেনের রহস্যপত্রিকা। আর আড্ডা সবচেয়ে বেশি জমিয়ে তুলতেন হাকিম ভাই ও রকিব হাসান।
ভারী চশমা চোখে শেখ আবদুল হাকিমকে দেখেই মনে হতো এ লোকটার সাধারণ মানুষের শ্রেণিতে পড়েন না। আজ শেখ আবদুল হাকিমের মৃত্যু সংবাদ শুনে সেবার সেই ছোট ঘরটির কথাই প্রথমে মনে ভেসে উঠল। সাথে সাথে দেখতে পেলাম, শেখ আবদুল হাকিম ভাইকে। চেয়ারে মাথাগুজে এক নাগাড়ে কাজ করে চলেছেন। মুখে মৃদু হাসি। ততোদিনে তিনি সেবার নামকরা লেখক ও অনুবাদক হয়ে গেছেন। মারিও পুজোর গড ফাদার অনুবাদ করেছেন যা চার পর্বে প্রকাশ করেছে সেবা। উপন্যাস দড়াবাজ স্পাই বের হয়েছে দুই পর্বে। রহস্যপত্রিকাতিই ধারাবাহিকভাবে কেন ফলেটের আ ম্যান ফ্রম সেন্ট পিটার্সবার্গ অনুবাদ করতে থাকেন যা আততায়ী নামে প্রকাশিত হয়। আর আড়াল থেকে মাসুদ রানা লিখে যাচিছলেনতো বটেই।
শেখ আবদুল হাকিম অনেক বিষয়ে কথা বলতেন। কিন্তু নিজের সম্পর্কে তেমন বলতেন না। তবে কথা প্রসঙ্গে দুটি গল্প করেছেন যা মনে আছে। ওনার বড় ভাই শেখ আবদুর রহমানের (উনিও একজন লেখক) নেশা ছিল গেট-এ-ওয়ার্ড খেলা। অধুনালুপ্ত মনিং নিউজ পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত জনপ্রিয় শব্দ পূরণের ধাঁধা। এটাকে কেউ কেউ জুয়া হিসেবেও দেখত। নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিয়ে যে কেউ এতে অংশ নিতে পারতেন। সে সময়ে আট মানে পঞ্চাশ পয়সা বোধহয় দিতে হতো। শেখ আবদুর রহমান গেট-এ-ওয়ার্ডের ধাঁধা পূরণ করে হাকিম ভাইকে ডাকে দিতে বলেছেন। ডাক মাশুলসহ চাঁদা বাবদ এক টাকা বা আট আনা দেওয়া হলো তাকে। কিন্তু হাকিম ভাই ইংরেজি সিনেমা দেখার জন্য আরো কিছু বেশি পয়সা চাইলেন বড়ো ভাইয়ের কাছে। তার সে আবদার সরাসরি নাকচ হয়ে গেল।
মনঃক্ষুণ্ণ হাকিম ভাই ভিন্ন রাস্তা ধরলেন। সিনেমা দেখলেন গেট-এ-ওয়ার্ড পাঠানোর টাকা দিয়ে। আর বড়ো ভাইকে ওটা ডাকযোগে পাঠিয়ে দিয়েছি বলে মিথ্যা জানালেন।
সেবা থেকে প্রকাশিত শেখ আবদুল হাকিমের উপন্যাস কামিনীরপ্রচ্ছদ
পরের সপ্তাহে ফল প্রকাশ হতেই হাকিম ভাই গভীর আঘাত পেলেন। বড়ো ভাই গোটা ধাঁধাঁর শব্দগুলো সঠিক ভাবে পূরণ করেছিলেন। আর কেউ সেবারে শতভাগ শব্দ পূরণ করতে পারেনি। ইস! বড় ভাই নিশ্চিত পুরস্কার হারালো তাঁরই জন্য। এ কথা যতোই ভাবে ততোই মন খারাপ হয়। অনেক দিন দুঃখটা বয়ে বেড়ালেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত চেপে রাখতে না পেরে কথাটা বলেই ফেললেন শেখ আবদুর রহমানকে। উনি শুনে খুব একটা পাত্তাই দিলেন না। প্রথমে মনেই করতে পারলেন না গেট-এ-ওয়ার্ডের কোন পর্বের কথা বলছে। পুরা ঘটনা ব্যাখ্যা করলেন হাকিম ভাই। কিন্তু তিনি বললেন, বাদ দে, আমি তো বহুদিন থেকেই খেলছি গেট-এ-ওয়ার্ড। একটা পুরস্কারও পাই নাই। আরেকটা না হয় পেলাম না, তাতে কি এমন হয়েছে। নিজেকে ছোট করার কোনো মানে হয়না। বাদ দে ওসব। ভাগ।
এ ভাবেই হাকিম ভাইকে ঝাড়া বিদায় করলেন তার বড় ভাই। কিন্তু হাকিম ভাইয়ের ওই কাজের জন্য অনুতাপ কখনো কমেনি। গল্প বলার সময় সে কথাই বলেন তিনি। তাঁর স্বরও বদলে যায় সে সময়ে।
বড় ভাইকে নিয়ে আরেকটা গল্প শুনিয়েছেন হাকিম ভাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য কেন্দ্র ইউসিসে চাকরি হয়েছিল শেখ আবদুর রহমানের। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনেই ছিল তখন ইউসিসের পাঠাগার ও দফতর। পরবর্তীতে ওই ভবনে জুট মার্কেটিং কর্পোরেশনের সদর দফতর স্থানান্তর করা হয়েছিল। ততদিনে ইউসিস চলে গেছে ধানমন্ডিতে। চাকরি হওয়ার পর আবদুর রহমান ভাবলেন গোটা অফিসটা তাঁর ভালোভাবে ঘুরে দেখা উচিত। নিজের অফিস বলে কথা। কোথায় কি আছে তা জানতে হবে না! এ ভাবের উদ্রেক হওয়ার পর তিনি নামলেন অফিস ঘুরে দেখার কাজে। ঘুরতে ঘুরতে ঢুকে পড়লেন ইউসিসের প্রবেশ নিষেধ এলাকায় অবস্থিত রেডিও কক্ষে। সেখানে হাঁটাহাঁটি করার সময় মার্কিন কোনো কর্তার নজরে পড়েন। এই নিষিদ্ধ এলাকায় কেন ঘুরঘুর করছে জানতে চাইলে আবদুর রহমান বলেন, বারে আমার অফিস আমি ঘুরেফিরে দেখবো না! জবাবে খুশি হয়নি মার্কিন কর্তা। তখনই আবদুর রহমানের চাকরি নট হয়ে যায়! এ গল্প বলে, হাকিম ভাই মন্তব্য করেন, আমারই বড়ো ভাইতো, আমার মতোই বুদ্ধিশুদ্ধি হবে!
তিন.
হ্যাঁ। শেখ আবদুল হাকিম অতি অমায়িক এবং সরল ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। আমি ফোন করলে তিনি বলেন, (সেবার কর্মী) মাসুমের কাজ থেকে খবরটা শুনেছি। হাকিমের মৃত্যু সংবাদটা যে তাঁকে বেশ কষ্ট দিয়েছে, সেটাওে বললেন। কাজী ভাইয়ের কণ্ঠে এ সময়ে ফুটে ওঠে শোকের আভাস। আর কোনো কথা বাড়ালাম না আমি। [মাসুদ রানার কপিরাইট দাবি ও সন্মানী নিয়ে তাঁদের দুজনের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে বড় তিক্ত হয়ে গিয়েছিল। মামলা মোকাদ্দমাতো হলো। ওদিকে আর যাচ্ছি না।]
হাকিম ভাইয়ের সহলেখক ও সহকর্মী রকিব হাসান। সেবার পাঠকদের কাছে রকিবের পরিচয় নতুন করে তুলে ধরার কোনো প্রয়োজনই নেই। আমার ফোন পেয়ে রকিব জানালেন যে মৃত্যু সংবাদটি পেয়েছেন তিনি। এও জানান যে নিজের স্ট্রোক করার পর থেকে তাঁর পক্ষে বেশি কথা বলা সম্ভব হয় না। কাশির কষ্ট হয়। শেখ আবদুল হাকিমের মৃত্যু তাকে গভীর বেদনা দিয়েছে।

সেবা থেকে প্রকাশিত শেখ আবদুল হাকিম অনূদিত বই আততায়ীর প্রচ্ছদ
রকিব হাসানের সঙ্গে ৯০ দশকের পর আমার আর কথা হয়নি। তাই প্রথমে আমাকে চিনতে পারছিলেন না ঠিকমেতা। তবে মনে করিয়ে দিতেই বললেন, সে তো অনেক দিন আগের কথা। ওগুলো কি আর মনে থাকে! তিন গোয়েন্দার স্রষ্টা কোনো স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না! সাদামাটা ফোন এসএমএস করা যায় আর কথা বলা যায়- বলে জানান তিনি।
খুবই খারাপ লাগছে, খুবই বিমর্ষ লাগছে, ফোনে হাকিম ভাইয়ের চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে বললেন সেবার আরেক খ্যাতিমান লেখক, সাংবাদিক নিয়াজ মোরশেদ। সেবার তুখোড় অনুবাদক হিসেবে নিয়াজ ওরফে প্রিন্স খ্যাতি কুড়িয়েছেন।
হাকিম সেবা প্রকাশনীর সাথে দীর্ঘদিন পথ চলেছেন, উল্লেখ করে প্রিন্স আরো বলেন, হাকিমের সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। যে ধরণের সাহিত্যের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাকে ক্রিয়েটিভ বা সৃজনশীল সাহিত্য হিসেবে দেখা হয় না। অথচ সঠিক মূল্যায়ন হলে অনেক উঁচুতে স্থান পাবেন তিনি। ছায়া-লেখক হিসেবে সেবার পাঠকদের অনেকেই তাঁকে জানতেন।
প্রিন্স আরো জানান যে হাকিম ছিলেন প্রচণ্ড আড্ডাবাজ একজন মানুষ। সাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী ও মাহমুদুল হকসহ আরো অনেকের সাথে তাঁর সখ্য ছিল বলেও জানান নিয়াজ।
শেখ আবদুল হাকিমের মৃত্যু সংবাদ আমার কাছ থেকেই শুনলেন সাবেক সচিব এবং, সেবার আরেক দুর্দান্ত অনুবাদক ও প্রচ্ছদ শিল্পী আসাদুজ্জামান। এখন দেশের পুরানো এবং খ্যাতনামা একটি এনজিওর প্রধান হিসাবে দায়িত্বপালন করছেন।
আজ শনিবার ( ২৮ আগস্ট) দুপুরে হাকিম ভাইয়ের দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার খবরটি জানার পর আসাদের বুক ধড়ফড় করে উঠল। তিনি সেই অতীতে চলে গেলেন। বললেন, আমরা পাশাপাশি টেবিলে বসে দিনের পর দিন কাজ করেছি। মানুষটা ছিলেন অতি অমায়িক। অতি হাসিখুশি। নির্মল মনের মানুষ। কেবল অনুবাদক নয়, সৃষ্টিশীল সাহিত্যিকও ছিলেন তিনি। সাহিত্যিক বলতে যে ধরণের মানুষের ছবি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে পোশাকে-আশাকে তেমনি ছিলেন শেখ আবদুল হাকিম। ছিলেন নির্লোভ।
শেখ আবদুল হাকিমের একটি রোমাঞ্চ উপন্যাসের প্রচ্ছদ
চার.
রহস্য পত্রিকায় আলোকচিত্র, নানা ফিচার, নিয়মিত বিজ্ঞান বার্তা প্রকাশিত হলেও কখনো আমার গল্প ছাপা হয়নি। হাতে গোনা দুয়েকটা গল্প লিখেছি কিন্তু পছন্দ হয়নি শেখ আবদুল হাকিম ভাইয়ের। হাকিম ভাইয়ের বাতিল করে দেওয়া গল্প অন্যেরা ছেপেছে। একবার এ কথা বললেই হাকিম ভাই বললেন, আরে তাই নাকি! কি সাংঘাতিক। দেন, গল্প দেন। এবারে ঠিক ছেপে দেবো। সে গল্প লেখা হয়েছে তবে হাকিম ভাইকে আর দেওয়া হয় নি। আর দেওয়াও হবে না!
আজ মনে মনে বলছি, হাকিম ভাই, ওপারে আসার সময়ে নিয়ে আসবো গল্পটা, ছাপাবেন কিন্তু!
syed.musareza@gmail.com