শি’র দুর্নীতি দমন অভিযান ঘিরে নানা সংশয়


সৈয়দ মূসা রেজা | Published: April 02, 2022 14:47:42 | Updated: April 04, 2022 13:53:26


- রয়টার্স ফাইল ছবি

দেশে এবং বিদেশে একযোগে দুর্নীতি দমন অভিযানকে আরো জোরদার করেন শি। চীনে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও তার নেতাদের বিরুদ্ধে বিস্ময়করভাবে এ অভিযান শুরু হয়। ২০২০এর শুরুতে আলিবাবা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ঋণপ্রদানকারী সংস্থা অ্যান্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মাএর বিরুদ্ধে অভিযানের মধ্য দিয়ে এমন অভিযানের যাত্রা শুরু হলো। এই অভিযানই পরে নিয়ন্ত্রক এবং নীতি বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঝড়ে রূপ নেয়। অভিন্ন সমৃদ্ধির নামে সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়া এতকালের ব্যবসার বিরুদ্ধে এভাবেই তুফান বইতে থাকে।

নিরাপদ নয় কেউ

চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির ২৫ সদস্যের পলিট ব্যুরোতে গত ডিসেম্বরে এক ভাষণে শি বলেন, বছরের পর বছর ধরে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পুঁজির বিস্তার ঘটেছে। যা আরো বেশি চাপের মুখে ফেলেছে। পলিট ব্যুরো এক পাঠচক্রে এ কথা বলেন তিনি। প্রবল ঝড় যে আসছে তারও আভাস দেন এর মাধ্যমে।

চীনের প্রযুক্তি খাতের শেয়ার থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি অর্থ এমন অভিযানের মুখে ঝরে যায়। ঝড়ের শিকার এরপর কে হবে? কোন কোম্পানি বা কোন ধনকুবের এবারে তুফানে পড়বে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। চীনের পুঁজি বাজারে এমন অনিশ্চয়তার দিকে আঙ্গুল তুলে অনেকেই এ সুযোগে বিতর্ক তুলছে- সত্যিই কী চীনে বিনিয়োগের পরিবেশ আছে?

চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজি বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলো পরবর্তী ঝড়ের মুখে পড়বে বলেই বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। এদিকে, ইউরোপীয় মানবাধিকার গোষ্ঠী সেফগার্ড ডিফেন্ডারস মনে করে এনএসসি কার্যত চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) দুর্নীতি দমন সংস্থা সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশন বা সিসিডিআইএর নতুন এবং বর্ধিত সংস্করণ। সিসিডিআইকে ভয় পায় না সিসিপিতে এমন কোনো সদস্য নেই। এনএসআই তৈরি করা হয় সিসিপির সদস্য নয় এমন ব্যক্তিদের মোকাবেলা করার জন্য। সেফগার্ড ডিফেন্ডারসের মতে, এনএসসি সৃষ্টি করে চীনে আইনের শাসনের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটি হানা হয়েছে।

সে যাই হোক,গত বছর চতুর্থ প্রান্তিক শুরুর পর চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক, তেল এবং তামাক গোষ্ঠী ও বিমা সংস্থাগুলোর উচুঁপর্যারের কর্তা আর নির্বাহীদের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে এই সিসিডিআই।

চীনের অভিজাত ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে শিএর সম্পর্ক বরাবরই টানাপড়েনের। দুর্নীতি দমন অভিযানের প্রাথমিক বছরগুলোতে বেসরকারি খাতের প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ টানাপড়েন আরো বাড়ে। ২০১৪তে চীনের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। চীন তার বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ নিয়ে গর্ব করার মতো অবস্থায় আছে। জরুরি পরিস্থিতি যেমন বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের দিনগুলোতে এ মজুদ চীন সরকারের নিরাপত্তার ঢাল হয়ে ওঠে। কিন্তু ২০১০এর দশকের মাঝামাঝি এসে এ মজুদ এক চতুর্থাংশ কমে যায়।

সান ডিয়াগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক ভিক্টর শি মনে করেন, বাজার থেকে ধারাবাহিক পুঁজি সরিয়ে নেওয়া হতে থাকে। এ টেউই প্রেসিডেন্ট শির মতো শক্তিশালী নেতার মোড় পরিবর্তন ঘটায়।

অধ্যাপক ভিক্টর শি বলেন, সে সময় থেকেই চীনা প্রেসিডেন্ট সত্যিকার ভাবে অভিজাত ব্যবসায়ী সমাজকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেন। এক বছরের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলার উবে যাওয়া চীনা নেতাদের জন্য বড় ধরণের আঘাতই। এ ভাবে বাজার থেকে পুঁজি সরে যাওয়ার তৎপরতায় জড়িত চীনা করপোরেটদের উঁচু পর্যায়ের অনেকেই স্বাভাবিক ভাবে প্রেসিডেন্ট শির ক্রোধের মুখে পড়েন। চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির কর্তৃত্ববাদী নেতাদের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের দহরম-মহরম কোনো পর্যায়ে যাবে তারই ইঙ্গিত দেয় এ ঘটনা। কিন্তু চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লাগাম ধরে রেখেছে এসব উদ্যোক্তারা।

চীনা ধনকুবের জিয়াও জিনহুয়াকে হংকংয়ের ফোর সেশনস হোটেল থেকে অপহরণ করে আনার ঘটনাকে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কাণ্ড হিসেবে তুলে ধরা যায়। ঘটনাটি ঘটে ২০১৭ সালে। এই ধনকুবেরের সঙ্গে বেইজিংয়ের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গভীর সম্পর্কের কথা সবাই জানতেন। তারপরও কানাডার নাগরিক জিয়াওকে ধরে আনা হয় চীনের মূল ভূখণ্ডে। দাবি করা হয়, তাকে অপহরণ করা হয়েছে। যাই হো্ক, এ কাহিনির মূল বার্তা হলো, কেউ নিরাপদ নয়, কেউ পালাবার পথ পাবেন পাবেন না।

বিপদ ঘিরে ধরেছে সবাইকে

শির কট্টর সমালোচকও স্বীকার করেন, চীনের দুর্নীতি দমনে দেশটির কর্তৃপক্ষের আরো কড়া কড়া তৎপরতা শুরু করা উচিত। দুর্নীতির রমরমা অবস্থা নিয়ে চীনের মানুষজন প্রকাশ্যেই ঝাল ঝাড়ে। এ ছাড়া, শাসক দলের জন্য এটি বৈধতার সংকটও সৃষ্টি করছে।

চায়নাজ গিলডেড এজ: দ্যা প্যারাডক্স অব ইকনমিক বুম অ্যান্ড ভাস্ট করাপশন বইয়ের লেখক এবং চীনা রাজনীতির বিশেষজ্ঞ ইয়ুয়েন ইয়ুয়েন অ্যাং দেশটির পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯ শতকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনা করেন। তিনি বলেন, উভয় ক্ষেত্রেই চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন এবং চরম বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। জন্ম নিয়েছে ধনদর্পী এবং দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদরা।

দুর্নীতি দমন অভিযানের পরের শিকার কে হবেন? এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ইয়ুয়েন ইয়ুয়েন অ্যাং বলেন, দুর্নীতি বা অবৈধ তৎপরতায় কতোটা জড়িত ছিল সে সংক্রান্ত আলামত পাওয়ার চেয়ে বরং রাজনৈতিক বিবেচনাই সচরাচর এ সব ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, কর্ম-মূল্যায়ন নয় বরং পৃষ্ঠপোষকতার ধরণের ওপরই পতনের বিষয়টি নির্ভর করে।

অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং গোপন বিচার প্রক্রিয়া চলে। কাজেই অভিযুক্ত ব্যক্তিনির্দোষ না দোষী বাইরের কেউই বুঝতে পারে না। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কতোটা সত্য একই ভাবে তাও বোঝা মুশকিল। বোঝা যায় না অভিযুক্ত ব্যক্তি কী সত্যিই দুর্নীতিবাজ নাকি রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের। অথবা উভয়ই।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]

আরো পড়ুন

শি জিনপিং ও চীনের দুর্নীতি দমন অভিযান

পালিয়েও রেহাই নেই: ধাওয়া করে চীনের দুর্নীতি দমন অভিযান

Share if you like