ছোট বেলায় যে অভ্যাস তৈরি হয় তার রেশ রয়ে যায় বড় জীবনের বাকি সময়টুকুতে। তাই ভালো কোনো অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে শৈশবই মোক্ষম সময়।
যেমন সাকিব আহমেদের কথা বলা যায়। তিনি বই পড়তে ভালোবাসেন। তার সংগ্রহে হয়তো বেশি বই নেই তবে তার এই বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে ছোট বেলায় মায়ের প্রচেষ্টার মাধ্যমে। সাকিব বর্তমানে একজন ব্যবসায়ী।
সাকিবের ভাষ্যে তার মা যা করেছেন তা একটি শিশুকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। আজকের লেখা এই প্রসঙ্গেই।
শিশুর আশেপাশে বই রাখা:
সাকিবদের ছিলো তিনটি রুম। প্রতিটি রুমেই কয়েকটি করে বই ছড়ানো ছিটানো থাকতো। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল কার্টুন চিত্রসম্বলিত বই। দেখা যেত এই কার্টুন সম্বলিত বইগুলোর প্রতি আলাদা আকর্ষণ তৈরি হতো।
সাকিব পড়তে না পারলেই এই বইগুলো নাড়াচাড়া করতো। এটিই বইয়ের সাথে শিশুর প্রথম পরিচয়। একেকটি পৃষ্ঠায় একেকটি ছবি।
প্রশ্ন হলো কখন থেকে বইয়ের পরিচয় শুরু হওয়া উচিত?
"গবেষনা কি বলে তা জানি না, তবে একদমই পড়তে পারে না তখন থেকেই খেলনার মতো করে বই সামনে রাখা উচিত," বললেন সাকিব।
শিশুকে নিয়ে বই পড়তে হবে
সাকিব বললেন তার মনে পড়ে মায়ের সাথে গল্পের বই পড়ার কথা। তিনি তখন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র।
তিনি বলেন, "মা-বাবার সাথে বই পড়লে সম্পর্ক ভিন্ন মাত্রা পায়। এটি শুধু সুন্দর একটি মুহূর্ত নয় বরং শেখার প্রক্রিয়া।"
গবেষণা বলে, মা-বাবা সন্তানকে বই পড়ে শুনালে সন্তানের নিজে পড়ার আগ্রহ বাড়ে। এজন্যই হয়তো সিনেমায় দেখানো হতো ঘুমানোর আগে গল্প শুনানোর দৃশ্য। আমাদের গ্রাম বাংলায়েও এটি প্রচলিত। দাদি-নানিরা গল্প শুনিয়ে থাকেন তবে সেটি বই ছাড়া।
বই পড়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা
অভ্যাস তখনই হয় যখন কোনো কিছু প্রতিদিন করা হয়। তাই প্রতিদিন বই পড়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় করে দিলে বই পড়া শিশুর অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
সাকিবের মনে আছে যে তিনি রাতে আর ছুটির দিনে সন্ধ্যার পর নিয়ম করে বই পড়তেন। বৃষ্টি হলে হরর ও থ্রিলারধর্মী বই পড়তেন।
তিনি বলেন, "আমার অভ্যাস এভাবেই হয়েছিল যে খাবারের পর আমাকে নিয়ে বই পড়তে বসতেন মা। কখনো তিনি পড়তেন, আমি তাকে দেখে শিখেছি।"
তবে সাকিবের মতে শিশুভেদে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। কারণ অনেক শিশুই আছে নির্দিষ্ট সময় করে বই পড়তে বললে পড়তে চাইবে না। উল্টো আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।
"আমার ভাইবোনদেরদেখতাম তারা রাতে বই পড়তে চায় না, দিনে পড়ে। এতে করে অনেকে বইই পড়েনি। কারো সেই অভ্যাসও নেই।" বললেন, সাকিব।
যেহেতু স্কুলের পড়া, বাসায় পড়া ইত্যাদি অনেক চাপ থাকে তাই নির্দিষ্ট সময়ের থেকে কিছুটা এদিক-সেদিক করে হলেও শিশুদের জন্য বই পড়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে মনে করেন সাকিব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজে বই পড়া
"আমার মা নিজেই প্রচুর বই পড়তেন। তার সংগ্রহে বই ছিল নানা রকমের। তাকে দেখেই আমারও শখ জাগা।"
শিশুরা দেখে দেখে শিখে। অনুকরণ করে। তাই ওদেরকে সামনে রেখে বই পড়লে ওরাও বই পড়তে চাইবে। নিজে বই পড়ার সাথে ছোট্ট সোনামণির কাছেও একটি বই রাখতে হবে যেন সে আপনাকে দেখে নিজেও বই নাড়াচাড়া করে।
শব্দ করে পড়া
শব্দ করে গল্প পড়লে শিশু আরো দ্রুত পড়তে পারে। পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ে। এতে শিশুর শব্দ সম্পর্কে ধারনা আরো পাকাপোক্ত হতে থাকে।
ছোটখাটো হলেও বইয়েরতাক তৈরি করা
সাকিব বলেন, "আমার বাসার ছোটরা শুধু এজন্যই বই পড়ে কারণ তারা জানে আমারে রুমের শোকেজে কিছু বই আছে। অথচ তাদের কেউ বই পড়তে বলেনি।"
ঘরে ছোট্ট করে হলেও বুকশেলফ বা বই রাখার এইটি টেবিল হলেও চলে। তাহলে ওই বাসার যে শিশুরা রয়েছে তারা কিছু না কিছু নিয়ে পড়তে চাইবে।
এখন বাচ্চাদের বইয়ের থেকে দূরে থাকার দায় সম্পূর্ণ শিক্ষা আর পরিবারের। পরিবার যদি চায় অনন্ত এটুকুও করলেও বই পড়ার পরিবেশ পাবে একটি শিশু। শিশুরা তখন মোবাইল ফোন আর ট্যাবের থেকে নতুন বইয়ের মলাটে হাত বুলিয়ে আনন্দ পাবে বেশি।
মো: ইমরানবর্তমানেঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়েরগণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতাবিভাগেঅধ্যয়নরত।
imran.tweets@gmail.com
