Loading...

শিশুকে অন্ধ করতে পারে আরওপি: বাংলাদেশে বাড়ছে প্রকোপ

| Updated: December 05, 2021 16:28:29


আরপিও হওয়া একটি শিশুর চোখ পরীক্ষা করা হচ্ছে—ছবি: www.cehjournal.org আরপিও হওয়া একটি শিশুর চোখ পরীক্ষা করা হচ্ছে—ছবি: www.cehjournal.org

বাংলাদেশে শিশুদের চোখের মারাত্মক ব্যাধি রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচিউচরিটি বা আরওপি-র প্রকোপ বাড়ছে। রোগের শুরুতেই এবং যথাযথ চিকিৎসা করা না গেলে এ রোগ শিশুকে সারাজীবনের জন্য অন্ধ করে দিতে পারে।  নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে এবং কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের মধ্যেই এ রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। দি ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাথে সাক্ষাৎকারে এ সব কথা জানান ঢাকার লায়ন্স আই হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এবং রেটিনা বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি শামসুদ্দোহা। তিনি এর আগে বারডেম হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন।

এ সংক্রান্ত নানা জরিপের বরাত দিয়ে শামসুদ্দোহা আরো জানান,আগের তুলনায় ২৩ থেকে ৫৩ শতাংশ এ রোগের প্রকোপ বেড়েছে বলে আশংকা করা হচ্ছে। দেশের সব স্থানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় জরিপ সঠিক হচ্ছে না। এ রোগের সঠিক প্রকোপ নির্ণয় করার জন্য দেশব্যাপী চিকিৎসা জরিপের প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁর এ বক্তব্যে থেকে উঠে আসে।

ডা. এ বি শামসুদ্দোহা

একটি শিশুর মায়ের গর্ভে থাকার মেয়াদ ৩৭ সপ্তাহ থেকে শুরু করে ৪২ সপ্তাহ পর্যন্ত ধরা হয়। এই মেয়াদের আগে, (সিজারের মাধ্যমে বা সিজার ছাড়া) জন্ম নেওয়া শিশুকে অপরিণত বা প্রিম্যাচিউর শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ছাড়া, নবজাতক শিশুর মান-ওজন ধরা হয় দুই হাজার গ্রাম থেকে দুই হাজার পাঁচশ গ্রাম বা দুই কেজি থেকে আড়াই কেজি। এরচেয়ে কম হলে নবজাতকটি কম ওজনের শিশুর তালিকায় পড়ে। যদি  শিশু একাধারে অপরিণত এবং কম ওজনের পর্যায়ে পড়ে তবেই নবজাতকের আরওপি-র শিকার হওয়ার আশংকা থাকে। সে সময় তার চোখ পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

এ ছাড়া তৃতীয় আরেকটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে।  তা হলো যদি জন্মের পর নিউ নাটাল ইনটেন্সিভ কেয়ার ইউনিট বা এনআইসিইউ-তে রেখে অনেকদিন অক্সিজেন দিতে হয় তবে সে নবজাতকেরও আরওপি হওয়ার আশংকা থাকে। তার চোখও চিকিৎসকের পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। অবশ্য, শিশুকে কয়েক ঘণ্টার জন্য অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন পড়লে তাতে এমন আশংকা বাড়ে না।

আরওপির কথা

জন্মের পরপরই শিশুর সাধারণভাবে আরপিও হয় না। আরওপির আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস অনুয়ায়ী পাঁচ পর্যায় রয়েছে। তবে কোনো কোনো শিশুর বেলায় আরওপি এ সব পর্যায় মানে না। তাদেরকে অ্যাগ্রেসিভ পোস্টেরিওর আরওপি বা এপি আরওপি বলা হয়। এ ধরনের আরওপি হঠাৎ করেই হানা দেয়।

আরওপি-তে আক্রান্ত হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য জন্মের ২০ দিন এবং ৩০ দিনের মাথায় শিশুর চোখ পরীক্ষা করতে হবে।  জন্মকালে যে সব শিশুর ওজন মান-ওজনের তুলনায় অনেক কম, ১৫০০ গ্রামের নিচে, তাদের চোখ ২০ দিনের মাথায় পরীক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ ২৮ সপ্তাহের আগে ১৫০০ গ্রামের কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা এ পর্যায়ে পড়বে। ২৮ থেকে ৩৫ সপ্তাহের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী ১৫০০ গ্রামের বেশি ওজনের শিশুদের চোখ পরীক্ষা করতে হবে জন্মের ৩০ দিনের দিন।

সাধারণভাবে শিশুর চোখ দেখার সময়ে যদি আরওপি-র লক্ষণ প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে বলে শনাক্ত করা যায় তবে চিকিৎসার দরকার পড়বে না। রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। এমন শিশুর বৃদ্ধির হার ভালো থাকলে, বড় হওয়ার সাথে সাথে আরওপি প্রাকৃতিক ভাবেই বিদায় নেয়। অন্যদিকে তৃতীয় পর্যায়ে থাকলে অবস্থা অনুযায়ী, ইনজেকশান দেওয়া হয় বা শিশুর চোখে লেজার চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু শিশুরোগীর আরওপি যদি চার বা পাঁচের পর্যায়ে থাকে তখন তার রেটিনা ভিটেক্টটমি সার্জারি করতে হয়।

প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে শিশুর দৃষ্টিশক্তির কোনো ক্ষতি হয় না। তৃতীয় পর্যায়ের শিশুর চোখের কেন্দ্রের দৃষ্টিক্ষমতা ঠিক থাকে। তবে দুই পাশের দৃষ্টি বা পেরিফিরাল ভিশন ঠিক নাও থাকতে পারে। চতুর্থ পর্যায়ের শিশুর কিছুটা দৃষ্টিক্ষমতা থাকতে পারে। কিন্তু পঞ্চম পর্যায়ে শিশুর দৃষ্টিশক্তি থাকার বিষয়ে আশা করা যায় না। এ অবস্থাকে আরওপি-র শেষ পর্যায়ে বা এন্ড স্টেজও বলা হয়। আর এপি আরওপি ধরা পড়লে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই অপারেশনে যেতে হয়।  না হলে রেটিনা ছিঁড়ে শিশু দৃষ্টি হারাবে।

আরওপি প্রতিহত করা

প্রতিকারের চাইতে প্রতিহত উত্তম – প্রবাদের এ কথা আরওপির বেলায় পুরোপুরি খাটে। প্রথমেই গর্ভবতী মায়ের দিকে সহানুভূতি এবং দরদের সাথে নজর দিতে হবে। মেয়াদ বা টার্মের আগে যেন শিশু না জন্মে তা নিশ্চিত করার জন্য এটাই দরকার। গর্ভবতী মায়ের পরিচর্যা সঠিক হলে মেয়াদের আগে শিশু হওয়ার আশংকা কমে। মা ঠিক মতো পুষ্টি বা বিশ্রাম না পেলে বা মা অসুস্থ হলেই মেয়াদের আগে শিশু জন্মানোর প্রবণতা দেখা দেয়। বা এ প্রবণতা বাড়ে।

তারপর অপরিণত বা মেয়াদের পূর্বে জন্ম নেওয়া শিশুর চোখ রেটিনা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। রোগের সূচনায় ধরা পড়লে আরওপি-র চিকিৎসা এবং নিরাময় সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এনআইসিইউ বা নবজাতকের জন্য ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে থাকার সময় যতদূর সম্ভব, অপরিণত শিশুকে হাইফ্লো অক্সিজেন দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে আরওপির শিকার হওয়ার আশংকা কমে। অপরিণত এবং কম ওজনের শিশুর ব্যাপারে গাইনি, শিশু বিশেষজ্ঞ এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞকেও সতর্ক হতে হবে।

ডা. হজরত আলী

আরওপি বাড়ছে কেনো?

এমন প্রশ্নের জবাবে, বাল্য বিবাহ, অতি গরিব মা এবং সমাজের উচ্চ শ্রেণির মায়েদের মধ্যে বেশি বয়সে বাচ্চা নেওয়ার প্রবণতাকেই দায়ী করলেন এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বেশি বয়সে মা হওয়ার জন্য চিকিৎসার নানা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে অনেক সময়ই জন্ম নেয় যমজ সন্তাব। যমজ সন্তাদের মধ্যে আরওপির প্রকোপ বেশি দেখতে পাওয়া যায়।

এনআইসিইউ বা নবজাতকের জন্য ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের ব্যবস্থা বেড়েছে। আগে অনেক সময়ই মেয়াদে পূর্ব এবং কম ওজনের শিশু হওয়ার পর তাকে বাঁচানোর উপায় ছিল না। এখন এ পদ্ধতির আশ্রয়ে তাদের প্রাণ বাঁচছে কিন্তু আরওপির হুমকির মুখে পড়ছে। গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় ক্যান্সারের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার কথাও এখানে তুলে ধরা যেতে পারে।

আরওপির চিকিৎসায় এখন সবচেয়ে বড় বাঁধা হলো প্রশিক্ষিত জনশক্তি। জনশক্তিকে হতে হবে রেটিনা স্পেশালিষ্ট বা অপথ্যালমোলজিস্ট বা চক্ষু বিশেষজ্ঞ। তবে, আরওপির চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইনকেজশন এবং লেজারের ব্যয় সহনীয় বলেই ধারণা করা হয়।

আরওপি চিকিৎসায় এগিয়ে রাজধানী ঢাকা

ঢাকা ময়মনসিংহ এবং চট্টগ্রাম ছাড়া বর্তমানে আরওপির চিকিৎসা দেশের অন্য কোথাও শুরু হয়নি। রংপুরেও সম্ভবত এ রোগের চিকিৎসা সম্প্রতি শুরু হয়েছে। দেশের কোথায় কোথায় আরওপির চিকিৎসা করা সম্ভব সে কথা পৃথক সাক্ষাৎকারে ব্যক্ত করেন বারডেমের চক্ষু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. হজরত আলী। বারডেমে আরওপির চিকিৎসা হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডা. তারেক রেজা আলী এবং প্রফেসর ডা. নুজহাত চৌধুরী এ রোগের চিকিৎসা করেন। এর চিকিৎসা করেন ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটে ডা. দীপক নাগ। বেসরসকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে হারুন আই হাসপাতালে আরওপির চিকিৎসা হয়। এ ছাড়া ধানমন্ডির বাংলাদেশ আই হাসপাতালে নিয়াজ আবদুর রহমান এ চিকিৎসায় নিয়োজিত আছেন। আরওপি-র চিকিৎসা হয় ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলির বিএনএসবি হাসপাতালে আরওপির চিকিৎসা হয়।

ডা. শামুসদ্দোহা আরওপি-র চিকিৎসার বিষয়ে সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী ও প্রসুতি রোগের চিকিৎসায় জড়িত চিকিৎসকরা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করতে পারেন। মেয়াদের আগে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়া ঠেকান গেলেই আরওপির প্রকোপ কমবে।

syed.musareza@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic