Loading...

শিথিল লকডাউনে ঈদের ব্যবসা-বাণিজ্য

| Updated: July 18, 2021 15:46:26


ফাইল ছবি ফাইল ছবি

ঈদ-উল-আযহার কথা বললেই প্রথমে আমাদের মনে যে কথাটি আসে, সেটি হলো পশু কুরবানি করা। এসময় মাংস দিয়ে হরেকরকম মুখোরোচক খাবার তৈরি থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন, কিংবা পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বিভিন্ন স্বাদের খাবার পাঠানো- এ সবকিছুতেই ফুটে ওঠে ভোজনরসিক বাঙালিদের বাঙালিয়ানার স্পষ্ট ছাপ। আর তাইতো বিভিন্ন স্বাদের মশলাপাতি ও জিভে জল আনা খাদ্য উপকরণের সমাহারে এসময় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠে বাঙালির রান্নাঘর।

অনলাইনে বেচাকেনা

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে মানুষ যেহেতু আগের থেকে বেশি ঘরে অবস্থান করছে, সেহেতু দেশে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারও কয়েকগুণ বেড়েছে। দেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে বিলাসবহুল পণ্য, এমনকি কোরবানির পশুও এখন অনলাইনের সাহায্যে ক্রয়-বিক্রয় করা হচ্ছে। আমাদের দেশে পশুর হাটগুলোতে অনেক লোকের সমাগম হয় বিধায় সেখানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি থাকে। অন্যদিকে অনলাইনে পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি না থাকায় ক্রেতারা এই মাধ্যমটির দিকে ঝুঁকছেন।

গ্রামে এ হার কিছুটা কম হলেও শহরাঞ্চলে এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে ক্রতাদের ভালো সাড়া পাওয়ায় খুশি বিক্রেতারাও। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর গবেষণামতে, মহামারির এই সময়ে অনলাইনে বিক্রি বেড়েছে ৭০-৮০ শতাংশ। এছাড়া বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ই-ব্যবসায়ের সংখ্যা প্রায় ১৩০০টি।

কোরবানির প্রধান আকর্ষণ পশু ক্রয় ছাড়াও এসময় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। আর এসব পণ্যের মধ্যে মশলার চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। এ বছর ঈদের আগে কঠোর লকডাউন থাকলেও ঈদ উপলক্ষে সেটি কিছুদিনের জন্য শিথিল করা হয়। ফলে, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকানগুলোতে এসময় ক্রেতাদের ভিড় লক্ষ করা যায়। আবার স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করায় এসময় অনেক দোকানিকে জরিমানা গুণতে দেখা যায়।

তবে শেষমুহূর্তে বেচা-কেনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিক্রেতারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে চট্টগ্রামের মুদি ব্যবসায়ী কায়সার খান বলেন, “লকডাউনে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় আমাদের দোকানপাট খোলা রাখার বিধান ছিল। তবে সেসময় ক্রেতার সংখ্যা অন্য সময়ের চেয়ে কিছুটা কম হওয়ায় বিক্রির পরিমাণও কিছুটা কম ছিল। অন্যদিকে এখন লকডাউন শিথিল হওয়াতে আবার নতুন করে আশার আলো দেখছি।”

লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে পোশাকের ব্যবসা। বিপণিবিতানগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে এ ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। বিক্রেতাদের অভিযোগ, খাদ্যদ্রব্য অথবা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রে ক্রেতারা অনলাইনে ক্রয়ের দিকে ঝুঁকলেও পোশাক ক্রয়ের ক্ষেত্রে এ হার কিছুটা কম। কারণ, ক্রেতারা দোকানে এসে নিজ চোখে দেখে পোশাক কিনতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে দিনের পর দিন ব্যবসায়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।

ঈদ-উল-আযহায় ইলেকট্রনিক্স পণ্য, বিশেষ করে ফ্রিজ, প্রেশার কুকারসহ আরো কিছু পণ্যের  চাহিদা অন্য সময়ের থেকে বেশি থাকে। তাই, ক্রেতাদেরকে আকৃষ্ট করতে এসময় কোম্পানি কর্তৃক বিভিন্ন ধরনের অফার প্রদান করা হয়। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পণ্য ক্রয় এবং বিনামূল্যে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা রাখলেও বিক্রেতাদের অভিযোগ, একের পর এক লকডাউন, মহামারিতে ক্রেতাদের আয় কমে যাওয়া, অনেকের চাকরি হারানোসহ আরো নানাবিধ কারণে তাদের পণ্য বিক্রয়ের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকার একটি ইলেকট্রনিক শোরুমের ম্যানেজার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “লকডাউন শিথিল হলেও ইলেকট্রনিক্স শোরুমগুলোতে ক্রেতার সংখ্যা এখনও অনেক কম। মহামারির আগের বছরগুলোর এই সময়টিতে শোরুমে ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও করোনা মহামারিতে সেটি নেই বললেই চলে।”

ঈদে অন্যান্য দ্রব্যের পাশাপাশি আসবাবপত্রের চাহিদাও বেশ বৃদ্ধি পায়। এসময় মানুষ বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক আসবাবপত্র দিয়ে সাজিয়ে রাখতে চায় তাদের পছন্দের বাসস্থানটি। কিন্তু এ বছর এই ব্যবসাতেও চলছে মন্দা। লকডাউনে বেচা-বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকলেও বর্তমানে ঈদ উপলক্ষে লকডাউন শিথিল হওয়ায় আবার নতুন করে আশায় বুক বাঁধছে এ ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা।

লকডাউনে যে ব্যবসাটি কিছুটা হলেও ভালো অবস্থানে ছিল, সেটি হল খাবারের ব্যবসা। ফুড পান্ডা, উবারসহ বেশ কিছু অনলাইন ডেলিভারি ব্যবস্থার সুবাদে এসময় মানুষ ঘরে বসেই বিভিন্ন রেস্তোরাঁর খাবার উপভোগের সুযোগ পায়। তবে ঈদ উপলক্ষে দেশে চলমান লকডাউন কিছুটা শিথিল হওয়ায় বিক্রয়ের পরিমাণ আগের থেকে আরো বৃদ্ধি পাবে, এমনটাই এখন প্রত্যাশা বিক্রেতাদের।

শিথিল লকডাউনে কেনাকাটা প্রসঙ্গে ক্রেতাদের মধ্য থেকে কথা হয় চট্টগ্রামের হারুনুর রশীদের সঙ্গে। তিনি বলেন, “লকডাউন শিথিল হলেও আয় কমে যাওয়ায় ক্রয় প্রবণতা এখন আগের চেয়ে কম। তাছাড়া করোনা-আতঙ্কে এখন ঘর থেকেও কম বের হওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কিছু পণ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়াতে এটি আমাদেরকে পণ্য ক্রয়ে নিরুৎসাহিত করছে।”

করোনাভাইরাসের কারণে গত প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মন্দা যাচ্ছে দেশের বেশিরভাগ ব্যবসায়। তবে এই মহামারি থেকে রক্ষা পেতে সরকার কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যক্তি সচেতনতাও। সকলের যৌথ প্রচেষ্টায় খুব দ্রুত এই অদৃশ্য শত্রুকে পরাজিত করে আবারও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে দেশের অর্থনীতি, এমনটাই প্রত্যাশা এখন সকলের।

তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। tanjimhasan001@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic