বেদে সম্প্রদায়ের কথা শুনলেই মাথায় আসে স্থায়ী আবাসহীন একটি ভাসমান শ্রেণীর কথা। নৌকা ও নদীর উপর ভিত্তি করেই চলে তাদের জীবন। তবে দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও নাগরিক সুবিধার কতটুকু পায় এ জনগোষ্ঠী?- এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খায় অনেকের মনে।
বাংলাদেশে বসবাসকারী বেদে জনগোষ্ঠীর আদি নিবাস ছিল মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে। পিতৃপ্রধান পরিবার হলেও এখানে বিয়ের পর ছেলেকে কনের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হয় এবং কনেকে তখন স্বামী এবং সন্তানদের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হয়।
বেদে জনগোষ্ঠীর লোকেরা পরিশ্রমী প্রকৃতির হয়ে থাকে। তাদের পেশার মাঝে সাপের খেলা দেখানো, তাবিজ-কবজ দেওয়া, সিংগা দিয়ে শরীরের ব্যথা বা বিষ নামানো, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। প্রায় প্রত্যেকটি বেদে পরিবারেরই একটি করে নৌকা থাকে।
কয়েকটি নৌকা নিয়ে একটি দল, কয়েকটি দল নিয়ে একটি বহর, আর কয়েকটি বহর নিয়ে হয় একটি উপগোত্র।
বহরের দলপতি সর্দার নামে পরিচিত। এছাড়াও থাকে উপগোত্রীয় ও গোত্রীয় সর্দার যাদের নির্বাচন করেন বহরের সর্দাররা। ধর্মীয়ভাবে মুসলিম হলেও বেদেদেরকে রাম-লক্ষ্মণ-বিক্রমাদিত্য ইত্যাদি দেব-দেবীর গুণকীর্তন করতে দেখা যায়।
বেদেদের জীবনব্যবস্থা লক্ষ্য করলে দেখা যায় সংগ্রামের এক কঠোর চিত্র। সকাল থেকেই একদল বেদে মহিলা দল বেঁধে বিভিন্ন গ্রামে কিংবা মহল্লায় ঘুরে বেড়ান, স্থানীয়রা যাকে বলা হয় গাওয়াল। এ গাওয়াল দলের প্রধান কাজ হচ্ছে মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া। বুনো লতাপাতা ও শেকড় দিয়ে ঔষধ বানিয়ে তারা তাদের চিকিৎসাকার্য চালিয়ে থাকেন। এছাড়া ঝাড়ফুঁক এবং মালিশও তাদের পেশার অংশ।
বেদে পুরুষরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সাপের খেলা দেখিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে শহরের চেয়ে গ্রামে তাদের জনপ্রিয়তা বেশি। সাপের খেলা দেখার বিনিময়ে কেউ টাকা অথবা কেউ চাল দিয়ে দেন তাদের।
তবে বর্তমান আধুনিক সমাজে বেদেদের গ্রহণযোগ্যতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। শহর তো বটেই, গ্রামের মানুষজনও এখন আর বেদে চিকিৎসায় ভরসা করেন না। সাপের খেলার জনপ্রিয়তাও কমেছে আগের চেয়ে। তাই বাধ্য হয়ে অনেক বেদে পরিবার এখন তাদের পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশা গ্রহণ করছেন।
তবে বেদে জীবনেও এখন তথ্য প্রযুক্তির সুবাতাস লেগেছে। অনেক বেদে পরিবার এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। পাশাপাশি দেশের কিছু স্থানে বেদেরা এখন স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তুলেছে। এরমধ্যে ঢাকার অদূরে সাভারের বংশী নদীর তীরে বেশ কিছুদিন ধরে বাস করে আসছে কিছু বেদে পরিবার। এমনকি কিছু পরিবারে এখন সৌরশক্তি চালিত বাতির ব্যবহারও দেখা যায়।
সমাজের মূল জনগোষ্ঠী থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হলেও তারাও কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। সে অর্থে অন্য নাগরিকদের মতো তাদেরও রয়েছে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের অধিকার। কিন্তু প্রাপ্য সেই সুবিধার সিংহভাগের সাথেই তাদের যোগ নেই বললেই চলে।
তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে বেদে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। বাংলাদেশে ২০১২-২০১৩ অর্থবছর হতে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর পর্যন্ত বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি একসাথে পরিচালিত হতো।
তবে ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে এ কর্মসূচি ‘বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন’ কর্মসূচি নামে আলাদাভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে যেখানে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৬৬ লক্ষ টাকা, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে এসে তার পরিমাণ হয় ৯ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা।
বেদেরকে দেওয়া সরকারি অনুদানগুলোর মধ্যে শিক্ষা উপবৃত্তি, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষন ও বিশেষ বয়স্ক ভাতা, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের পর তাদেরকে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
বেদে সম্প্রদায়কে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে শিক্ষামূলক যেসব বৃত্তিগুলো দেওয়া হচ্ছে সেগুলো তাদের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের যে বৃত্তি দেওয়া হয় সেটি ৪ স্তরে বিভক্ত। প্রাথমিক স্তরের একজন শিক্ষার্থী বৃত্তি হিসেবে মাসিক ৭০০ টাকা করে পেয়ে থাকেন। আর মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষার স্তরের একজন শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক এ বৃত্তির পরিমাণ যথাক্রমে ৮০০ টাকা, ১০০০ টাকা এবং ১২০০ টাকা করে।
বৃত্তি গ্রহণকারীর সংখ্যা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে শিক্ষা উপবৃত্তিভোগীর সংখ্যা ছিল ৮৭৫ জন। পরবর্তী অর্থবছরে এ সংখ্যা বেড়ে হয় ২,৮৭৭ জন যা ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরেও একই ছিল। পরবর্তী চারটি অর্থবছরে সেটি বেড়ে হয় যথাক্রমে ৮,৫২৬ জন, ৮,৫৮৫ জন, ১০,৭৩২ জন এবং ১৯,০০০ জন। আর ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে পরবর্তী তিনটি অর্থবছরে এর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রত্যেক অর্থবছরে ৩,৯৯২ জন করে।
আবার কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিটি ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছর থেকে শুরু হয়। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে এ কর্মসূচীর আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ছিল ৫০০ জন।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে দেখা হয় একটি বেদে পরিবারের সাথে। সে পরিবারের কর্তা মোহাম্মদ বদর আহমেদ বলেন, “আমদের সম্প্রদায়টি সমাজে খুবই অবহেলিত। সরকার কর্তৃক কিছু সুবিধা দেওয়া হলেও সেগুলোর পরিধি আরো বাড়ানো উচিত। আর করোনার আগে আমরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে বিভিন্ন চিকিৎসা সেবা দিতে পারতাম। কিন্তু এখন আমাদেরকে অনেকেই গ্রামে ঢুকতে দেন না করোনার ভয়ে। ফলে আর্থিকভাবে কষ্টে আছি আমরা।”
“আমাদের কোনো স্থায়ী আবাস নেই। আর স্থায়ী আবাসই যদি না থাকে তাহলে উপবৃত্তি পেলেও ছেলেমেদের পড়ালেখা করাবো কি করে? তাই এ সমস্যাটির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান চাই আমরা।”
এ বিষয়ে সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট এন্ড হিউম্যান ডেভলপমেন্ট এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ফিলিপ গেইন বলেন, “বেদেদেরকে বর্তমানে সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদেরকে যদি স্থায়ী আবাসন সুবিধা দেওয়া না যায় তাহলে এসব সুবিধা খুব বেশি কাজে আসবে না।”
“বর্তমানে সরকার কর্তৃক দেশের গৃহহীনদের ঘর করে দেওয়া হচ্ছে। এ সুবিধার আওতায় যদি বেদেদেরকে বৃহৎভাবে নিয়ে আসা যায় তাহলে এটি সম্প্রদায়টির জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান কীভাবে আরো উন্নত করা যায় সে প্রসঙ্গে মতামত দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাকিয়া শারমিন। তিনিও বেদেদের জন্য সরকার কর্তৃক স্থায়ী আবাসন সুবিধা প্রদানের উপর জোর দেন।
“বেদে জনগোষ্ঠীকে সরকার যে শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে সেটি খুবই প্রশংসনীয়। তবে অর্থের পরিমাণ আরো বাড়ানো উচিৎ। কারণ যে পরিমাণ বৃত্তি দেওয়া হয় সেটি একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাব্যয় মেটাতে সবসময় পর্যাপ্ত না-ও হতে পারে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কর্মসূচীর আওতায় এ জনগোষ্ঠীভুক্ত মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাহলে এ জনগোষ্ঠীটিকে ভবিষ্যতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিতভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”
তানজিম হাসান পাটোয়ারী বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
tanjimhasan001@gmail.com
