চীনে এবারে ঘটতে চলেছে নজিরহীন ঘটনা। তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পথে আছেন শি জিনপিং। পাশাপাশি বিদেশি আত্মগোপন করে থাকা চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধেও জোরদার হয়েছে অভিযান। দুর্নীতি দমনের অভিধায় ভূষিত হয়েছে এ সব অভিযান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহিষ্ণুতার আদলে এ সব অভিযান শুরু
চোখ ঝলসে দেওয়ার মতো দ্রুত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে চীনের হাইনান দ্বীপ হয়ে ওঠে অবকাশ যাপনের বিলাসবহুল কেন্দ্র। উন্নয়নের বছরগুলো ভালোভাবেই ভোগ করেন স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির মাতব্বর ঝং কুই। সুদিন ফুরালে কী করতে হবে তাও বিলক্ষণ জানা ছিল তার। সে পরিস্থিতির হিসাবও কষে রেখেছে আগেভাগেই।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির দুর্নীতি দমন সংস্থা সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশনের নামে ভয় পায় না দলে এমন কোনো সদস্য নেই। ২০১৯-এর কথা। এক ব্যবসায়ী বান্ধব গোপনে খবর দিলো, ঝাং-এর খোঁজে আসছে ওরা। হিসাবের পথই ধরল সে। মোটেও দেরি করল না ঝাং। পরের দিনই কানাডার বিমান চড়িয়ে দিল তার সাবালক ছেলেকে।
উন্নয়নের হাওয়ায় পাল তুলে তার পরিবার কোটি কোটি ডলার কামিয়েছে। এ অর্থের কোনো বৈধ উৎস নেই। পরের কয়েক মাস ধরে ঝাংকে সে বিষয়ে জেরায় জেরায় জেরবার করে ছাড়ল দুর্নীতি দমন সংস্থাটি। জেরার মুখে ডিগবাজি খেলো ঝাং। ছেলেকে রক্ষা করার যে হিসাব কষে রেখেছিল আর সে পথ ধরল না। বরং ছেলের কাছে বার্তার পর বার্তা পাঠাতে থাকল। কাকুতি-মিনতি করল, চীনে ফিরে ছেলেটি যেন সেন্ট্রাল কমিশন ফর ডিসিপ্লিন ইন্সপেকশনের কর্তাদের সাথে কথা বলে।
বাপ হয়ে ছেলেকে দুর্নীতি দমন সংস্থার হাতে তুলে দিতে চাইছে- ঝাংয়ের এ কাহিনি চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে সাড়ম্বরে প্রচার হলো। শি জিনপিং-এর দুর্নীতি দমন অভিযানের মুখে কীভাবে অসহায় হয়ে পড়ে দুর্নীতির রাঘব বোয়ালরা এতে সেটিই তুলে ধরা হয়।
ক্ষমতা সংহততরণ: ২০১২-তে ক্ষমতায় বসেন শি। প্রথম থেকেই লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঘোষণা করেন “বাঘ থেকে মাছি।” রাঘব বোয়াল থেকে চুনোপুঁটি অর্থাৎ শীর্ষ স্থানীয় সরকারি কর্তা ব্যক্তি থেকে নিম্নপদস্থ কর্মী অবধি কাউকেই দুর্নীতি করলে ছাড় দেওয়া হবে না। এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো এ অভিযান ঘিরে রয়েছে দুটো উদ্দেশ্য। প্রথমটি হলো, দুর্নীতি দূর করা আর দ্বিতীয়টি হলো শি’র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করা।
এক দশক শেষ হয়েছে, কিন্তু এ অভিযান শেষ হওয়ার কোনো নাম-গন্ধও এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে, আর মাত্র কয়েকটা মাস। তারপরই চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। শি নজিরহীন ভাবে তৃতীয় দফা দায়িত্ব পালনের তৎপরতা শুরু করবেন বলেই সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা। চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছে। আর শেষ হবে আগামী হেমন্তে পার্টি কংগ্রেসের বৈঠক দিয়ে। দলীয় প্রধান এবং প্রেসিডেন্টের পদের জন্য অদূর ভবিষ্যতে শি-র সঙ্গে কেউ দৌড়ে নামবেন না বলেই সাধারণ ভাবে ধরে নেওয়া হয়েছে। শি-র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ছবি পাওয়া যায়নি এখনো। তবে আভাস-ইংগিত থেকে বোঝা যাচ্ছে যে দুর্নীতি দমন অভিযান চলছে, চলবে, আরো জোরসোরে।
প্রথম বছরগুলোতে অভিযানের লক্ষ্য ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা। বর্তমানে এ পার্টির সদস্য সংখ্যা সাড়ে নয় কোটি। দুর্নীতি বিরোধী এ অভিযানকে আরো ব্যাপক করার মূল কাজগুলো এরমধ্যে করেছেন শি। চীনের বেসরকারি খাত এবং উদ্যোক্তারা দেশটির অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধির তৎপরতায় সবচেয়ে বেশি টাকা-কড়ি কামিয়েছেন। এবারে তারাও রক্ত খেকো বাঘের ডাক শুনতে পাচ্ছেন। হুমকিতে পড়ছেন।
চীনের কথিত “সোনালি যুগে” ঘটে যাওয়া ব্যাপক দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা হবে। এ কথা অহরহ বলছেন শি এবং তাঁর মিত্ররা। বিশেষ করে গত তিন দশকের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময়ে ঘটে যাওয়া দুর্নীতির মূল উপড়ে ফেলা হবে। এ সময়ে সম্পত্তির লোভনীয় ব্যবসা করে বেসরকারি খাতে উপচে পড়া ধন-দৌলত সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো সরকারি কর্তারাও এ ভাবে হাত করেছে অঢেল সম্পদ।
চীনের ইতিহাসে শি-র আগে কেউ এমন ব্যাপক এবং এতো দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি দমন অভিযান চালায়নি। সবদিক থেকেই এ অভিযান হয়ে উঠেছে বে-নজির। এতে গত ১০ বছরের বেশি সময়ে আটক হয় ২০ লাখ সরকারি কর্তা। ২০১৪-তে শুরু হয় অপারেশন ফক্স হান্ট। এর এক বছর পর শুরু হয় স্কাই নেট। এই দুই অভিযানের মাধ্যমে ১২০ দেশ থেকে ১০ হাজার চীনাকে স্বদেশে ফেরত আনা হয়েছে। এরা কেউই নিজের ইচ্ছায় ফিরে আসেনি।
দু’বছর আগে প্রকাশিত ‘চায়নাজ গিলডেড এজ : দ্যা প্যারাডক্স অব ইকনমিক বুম অ্যান্ড ভাস্ট করাপশন’ বইয়ের লেখক এবং চীনা রাজনীতির বিশেষজ্ঞ ইয়ুয়েন ইয়ুয়েন অ্যাং বলেন, শি-র আগে, ১৯৮০ দশক থেকে চীনে দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত পাঁচ দফা বড় অভিযান চলেছে।
এ সত্ত্বেও মাও যুগের পরই শি-র দুর্নীতি দমন লড়াই “সবচেয়ে দীর্ঘতম, ব্যাপক এবং (সমাজের) সবচেয়ে গভীরে ঢুকে পড়া অভিযানে” রূপ নিয়েছে। “পূর্বসূরিদের চালানো অভিযানের সঙ্গে শি-র অভিযানের বড় অমিল হলো তাদের (জিয়াং জেমিন এবং হু জিনতাও) যুগে স্থিতিশীলতা, ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থাকে ধরে রাখা হয়। আর সে ক্ষেত্রে শি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিচ্ছেন…...চীনের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে পুনর্নির্মাণের শি-র উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে এ সব অভিযান। ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের ‘সমাজতান্ত্রিক আধুনিকীকরণ’ বাস্তবায়নের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হিসাবে এ সব দেখা উচিত। এ সব কারণেই অভিযানের পর অভিযান চলছে।”
বিচার মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া: পশ্চিমি সরকারি কর্তারা মনে করেন, শি-র দুর্নীতি দমন অভিযানগুলো বিদেশে পালিয়ে যাওয়া রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসা জগতের অভিজাত সম্প্রদায় এবং তাদের পরিবারবর্গকে চীনে ফিরতে বাধ্য করার নীতি অনুসরণ করছে।
বিদেশে বসবাসরত চীনা নাগরিকদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনার যে তৎপরতা বেইজিং চালাচ্ছে তা পশ্চিমি সরকারগুলোর কাছে ক্রমবর্ধমান মাথা ব্যথা হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমি দেশগুলোতে আশ্রয় নেওয়া চীনা নাগরিকদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর পরই গোপন ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা মুখে পড়ে তারা। এ বিচার ব্যবস্থা আটক রাখা, নির্যাতন, বলপ্রয়োগ করে স্বীকারোক্তি আদায়ের মতো কাজে সিদ্ধহস্ত হিসেবে কুখ্যাতির মুকুট পড়েছে। অন্যদিকে এই ব্যবস্থার আওতায় বিচারে প্রায় শতভাগই দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে।

তারপরও ‘চায়নাজ গিলডেড এজ : দ্যা প্যারাডক্স অব ইকনমিক বুম অ্যান্ড ভাস্ট করাপশন’ বইয়ের সূচনাই স্বীকার করা হয়, “চীন নিয়ে সত্যিকার অসাধারণ বিষয়টি হলো, অনুরূপ দুর্নীতিগ্রস্ত কোনো দেশই এ দেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের কাছাকাছি মাত্রায়ও পৌঁছাতে পারেনি।”
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]
