Loading...

শাড়ির সাতকাহন

| Updated: February 24, 2022 18:33:52


শাড়ির সাতকাহন

সুদক্ষিণা সাধারণ একজন গৃহবধূ। কিন্তু শাড়ির প্রতি তার ভালোবাসা অগাধ। নেশার মতো করে দেশের বিভিন্ন স্থানে শাড়ি সংগ্রহে ছোটেন। এই নিয়ে পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনায়। শেষমেশ স্বীকৃতি পায় তার শাড়ি সম্বন্ধে জ্ঞান। এমন একটি গল্প নিয়েই নির্মিত ওপার বাংলার টালিউডের একটি চলচ্চিত্র ‘সুদক্ষিণার শাড়ি’ যার নাম ভূমিকায় ছিলেন অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র।

সত্যি বলতে এমন সুদক্ষিণা লুকিয়ে বাংলার সব মেয়ের মধ্যে। শাড়ি কে না ভালোবাসে! বাঙালি মেয়ের কাছে শাড়ি শুধু পরার পোশাক নয়, শাড়ি একটি আবেগ। মেয়েরা তাদের এই ভালোবাসাকে সযত্নে তুলে রেখেছে আলমারিতে।

বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে গড়ে উঠেছে নানা শাড়ির নিজস্ব বয়নকেন্দ্র। শাড়ির প্রতি বাঙালির চিরন্তন আকর্ষণই সেসব শাড়ির ঐতিহ্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।

জামদানী

জামদানি বঙ্গের হারিয়ে যাওয়া মসলিনের উত্তরসূরি। শীতলক্ষ্যার আর্দ্র পাড়ে জন্ম নেওয়া জামদানি ২০১৬ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক জিআই পণ্য রূপে খ্যাত হয়। ঢাকাই জামদানি তার অনন্য নকশা ও বুনটের জন্যে ভুবন বিখ্যাত। এই নকশাগুলোর নাম ভারী বিচিত্র।

টানা পরেনের সাথে মাকুর ওঠানামায় আশফুল, পুঁই লতা, আম মৌর, জুঁই বুটি, বাঘ নলি বুটি, ইয়ারিং ফুল, নিমপাত, আঙ্গুল তেরছি জমিনে ফুটে নয়ন জুড়ায়। আর পাড়ের ভেতর শোভা পায় চালতা পাড়, করলা পাড়, নিমপাত জাল, বেলপাতা পাড়, চন্দ্র পাড়, ঝাউ পাড়, শাল পাড়।

অনেকেই আসল জামদানি শাড়ি চিনতে পারেন না। জামদানি শাড়ির মান নির্ভর করে সুতার কাউন্টের উপর। যে সুতার কাউন্ট যত বেশি সেই কাপড় তত বেশি মিহি। ৮০ থেকে ১০০ কাউন্টের জামদানি চলতি সময়ে সর্বোত্তম বলা চলে। তবে মেশিনে বোনা জামদানির সুতি সূক্ষ্মতা ও নকশা দুটিতেই বিস্তর ফারাক রেখে চলেছে।

বেনারসি কাতান

বেনারসির উৎপত্তি উত্তর ভারতের বেনারসে। এই শাড়িটি দেশীয় না হয়েও বাঙালি সংস্কৃতির সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান একে ছাড়া কল্পনা করা যায় না।

বেনারসের সিংহভাগ তাঁতি ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের। ১৯৪৭ এর দেশভাগের পরে ৪০০ এর মতো তাঁতি পরিবার নিজ ভূখন্ড ছেড়ে নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়েন । তাদেরই কেউ কেউ আশ্রয় নেন ঢাকার মিরপুরে।

গড়ে ওঠে বেনারসি পল্লী। আজ  স্বাধীন বাংলার বুকে সগৌরবে চলছে বেনারসির বুনন। গ্রাফ মাস্টাররা পুরোটা নকশার তদারকি করেন। কাঁচা রেশমি সুতায় স্বর্ণজরির সুতা জড়িয়ে জটিল প্রক্রিয়ায় বেনারসি ও কাতান উৎপাদিত হয়। এসব শাড়িতে ব্যবহৃত রেশমি সুতা খুব উচ্চমূল্যের যা মূলত ভারত ও পাকিস্তান হতে আমদানিকৃত। দামে কম বলে কোনো কোনো তাঁতীরা চাইনিজ সিল্ক থ্রেড ব্যবহার করছেন।

মিরপুর ১০, ১১ ও ১২- মিলে শতাধিক বেনারসির দোকান রয়েছে, যেখানে ২০ হতে ৩০ প্রকার ডিজাইনের শাড়ি পাওয়া যায়। ডিজাইনভেদে শাড়ির দাম কয়েক হাজার হতে লাখ টাকার ঘরে ঠেকে।

সিল্ক

বাংলাদেশে সিল্ক বা রেশমের শাড়ির পীঠস্থান বৃহত্তর রাজশাহী। তুঁত গাছের পাতা খেয়ে বেড়ে ওঠা বোমবিক্স মোরি নামের সিল্ক ওয়ার্ম হতে সংগৃহীত হয় রেশম সুতা। সেরিকালচার করে প্রাপ্ত সোনালি এই সুতা অনেক সূক্ষ্ম ও কোমল, তাই জনপ্রিয়।

রাজশাহীতে রেশম কুঠি ব্রিটিশ আমলে গড়ে উঠেছিল এবং বেঙ্গল সিল্ক নামে এর ব্যাপক বাণিজ্য ছিল। সেই ঐতিহ্যের সূত্র ধরে রাজশাহী সিল্ক এখন বাংলাদেশের জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন্স) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল। বিশ্বব্যাপী তাই এর চাহিদা ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। বর্তমানে রাজশাহী সিল্কের তিনটি ধরন পাওয়া যায় - এর, মালবেরি ও তুষার সিল্ক।

তাঁতের শাড়ি

পাবনা, টাঙ্গাইল আর সিরাজগঞ্জ বয়নশিল্পে বহু প্রশংসা কুড়িয়েছে, এককথায় শাড়ি শিল্পের শিরোমণি। এসব অঞ্চল বিখ্যাত তাঁতের শাড়ির জন্যে। এ দেশের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় একদম খাপে খাপ এই শাড়ি। এই শাড়ির নকশাতেও আছে দেশীয় প্রকৃতির ছোঁয়া।

আগে দেশীয় ঠকঠকি তাঁতে শাড়ি বোনা হলেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতায় সে স্থান দখল করেছিল জাপানি তাঁত। এখন চাহিদার নাগাল পেতে সমবায়ভিত্তিক পাওয়ারলুমে শাড়ি বানানো হয়। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমে পুরানো কাপড়ের সাথে নতুন সুতা মিলিয়ে যে খেশ শাড়ি তৈরি হয়, সেটিও এখন টাঙ্গাইল অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে। টাঙ্গাইলের শাড়ি তার সূক্ষ্ম বুনটের জন্যে বিখ্যাত। তবে নকশায় তারতম্য থাকলেও সুলভ মূল্যের জন্যে পাবনার শাড়ি বেশি জনসমাদৃত।

কাঁথা স্টিচ/নকশী শাড়ি

নকশী কাঁথার জন্যে বরাবরই বিখ্যাত যশোর জেলা। কিন্তু এখানে কাঁথার পাশাপাশি তৈরি হয় নজরকাড়া কাঁথা স্টিচ তথা নকশি শাড়ি। নারী শ্রমিকদের হাতে সুচে করে ফুটে ওঠে ফুল, পাতা, পাখি, গাছ। ঘন কাজের জন্য এই শাড়ির জন্যে গুণতে হতে পারে এক হাজার হতে দশ হাজার টাকা।

সুতির শাড়ি

সকল শাড়ির ভেতর সবচেয়ে আরামদায়ক ও কোমল সুতির শাড়ি। প্রায় সকলেই এতে স্বাছন্দ্য বোধ করেন। সাধারণ হ্যান্ডলুম থেকেই আসে সুতির সব শাড়ি। ফ্যাশন বৈচিত্র্যে এখন সুতির শাড়িগুলো সেজে ওঠে স্টিচ, কাঠব্লক, স্ক্রিন প্রিন্ট, প্যাচ ওয়ার্ক, হ্যান্ড পেইন্টিং কিংবা এপ্লিকের কাজে আর সিল্কের বা হাফ সিল্কের শাড়িতে হয় কারচুপি বা জরির কাজ। আরামের দিকটি মাথায় রেখে দেশীয় ফ্যাশন হাউস গুলি সুতির শাড়ির প্রতি যত্নবান হচ্ছে।

খাদি

১৯২১ সালে স্বদেশী পণ্য ব্যবহারের যে ডাক উঠেছিল, তার আজও সাক্ষ্য বহন করে কুমিল্লার খাদি। খাদি সম্পূর্ণ হাতে তৈরি হওয়ায় এটি তুলনামূলকভাবে ভারী ও মোটা হয়। স্বাদেশিকতার প্রামাণ্য বহন করা এই কাপড়টি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমানের বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ড। এই নিয়ে সবচেয়ে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন হালের খাদি ব্রান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ফাতেমা তুজ জোহরা। স্থাপত্য বিদ্যার শিক্ষার্থী হয়েও তিনি খাদিকে অনন্য উচ্চতায় তোলার স্বপ্ন দেখেন। নকশায় বিল্ট ইন টেকনিক খাটিয়ে তিনি খাদি কাপড়ের মান উন্নয়নে যথেষ্ট যত্নশীল।

মোম বাটিক শাড়ি

খাদি ছাড়াও কুমিল্লার আরেকটি বিখ্যাত শাড়ি মোম বাটিক। কাঠের প্লেটের সাথে বসে মোমের ব্লক। তাতে ন্যাচারাল ডাই দিয়ে ফুটে ওঠে রঙিন সুন্দর সুন্দর দাগ কাটা ডিজাইন। গ্রামে কুটির শিল্প পর্যায়ে পরম যত্নে তৈরি হয় এই শাড়িটি। সিল্ক ও সুতি দুটিতেই সমানভাবে বাটিক করা হয়।

মণিপুরি শাড়ি - সিলেট

মণিপুরী শাড়ির প্রস্তুতকারক সিলেটের নৃ-গোষ্ঠী মণিপুরী নারীরা। গাঢ় বা হালকা যে কোনো জমিনেই ফুটিয়ে তোলা হয় জামদানির মতো নকশা। তবে পাড়টি হয় সবসময় গাঢ় রঙে। পুরো শাড়িটাই তারা করেন নিজস্ব তাঁতে। এই শাড়ি চেনার উপায় এর পাড়ের নকশা থাকে ত্রিভুজাকৃতির।

জুম শাড়ি

জুম শাড়ি পাহাড়িদের তৈরি শাড়ি, কিছুটা নেট শাড়ির মতো দেখতে। বর্তমানে কারখানায় তৈরি শাড়িতে থাকে লিনেন সুতা ও সিল্ক সুতার মিশেল। তবে লিনেন সুতা কোরিয়া হতে আমদানিকৃত। এর সুতা বেশ ঠান্ডা ও আরামদায়ক অনুভূত হয়। গরমের জন্য মানানসই। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও শ্রীমঙ্গলে জুম শাড়ির অধিক বুনন হয়।

বাংলাদেশের শাড়িতে মিশে আছে মাটির গন্ধ আর আছে দেশীয় কারিগরের হাতের ছোঁয়ায় সাথে তাদের সংগ্রামী জীবনের গল্প। তবে ভারতীয় শাড়ির চাকচিক্যময়তায় ম্লান হচ্ছে আমাদের দেশীয় শাড়িগুলি। ক্রেতারা দেশি শাড়ির প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে ফ্যাশন হাউসগুলো বিপণি সাজাচ্ছেন তাদের চাহিদার শাড়িগুলি নিয়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় বস্ত্র বয়ন শিল্প। ইদানিংকালের বেশকিছু ফ্যাশন সচেতন তরুণীরা দেশীয় কাপড়ের দিকে ঝুঁকছে। তারা দেশীয় শাড়িকে প্রধান্য দিচ্ছেন। এনাদের মধ্যেই অনেকে শাড়ি ব্যবসায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে উঠে আসছেন।

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

susmi9897@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic