Loading...

শান্তির সহযাত্রী না রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাথী?

| Updated: October 01, 2021 14:04:50


শান্তির সহযাত্রী না রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সাথী?

[পরিচিত পৃথিবীর দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে বিশ্বমারি করোনা। অভূতপূর্ব পরিস্থিতির চাপে বৈশ্বিক রূপবদলের পালা এখনো ফুরায়নি। বিশ্বমারি করোনা না গেলেও এ পালা চলতে থাকবে। কিন্তু এরপরও দুনিয়ার বদলে যাওয়া চালচিত্রের প্রকৃতি নিয়ে বই প্রকাশ চলছে। আমেরিকার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এবং ইউরোপীয় ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক অ্যাডাম টুজের বইয়ের নাম শাটডাউন। অন্যদিকে মার্কিন দুই পণ্ডিত কলিন কাহল এবং থমাস রাইটের লেখা বই হলো অ্যাফটারশকস। করোনাকাল চলে গেলেও এ দুই বই পাঠযোগ্যতা হারাবে না- এমনটাই মনে করছেন সমালোচকরা।]

আমেরিকার বাসিন্দা টুজ তাঁর বইয়ে দেশটির কথাই স্বাভাবিকভাবে বেশি বলেছেন। আটলান্টিকের দুই তীরের মতাদর্শগত পার্থক্য এবং ভণ্ড নীতিমালার প্রতি শ্যেন নজর আছে তাঁর। রাষ্ট্রাচারে কঠিনভাবে নিষিদ্ধ জরুরি পরিস্থিতির ধকল সামাল দিতে এমন পদক্ষেপকেও সযত্নে কার্যক্ষেত্রে ঠাই দেওয়ার ঘটনা চিহ্নিত করেছেন তিনি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রাচারে দেখেছেন তিনি। সর্বজনীন বেকার বিমা কর্মসূচিকে সদর্পে প্রত্যাখ্যান করেছে আমেরিকা। বিশ্বমারির প্রকোপকালে, ২০২০’এ সেই দেশই হঠাৎ করেই কেয়ারস অ্যাক্ট প্রণয়ন করল। এক লাখ কোটি ডলার বিলিয়ে দিল দেশটির বিপন্ন পরিবার এবং ব্যবসা জগতকে। এর মধ্যে টুজ দেখতে পেলেন বৈপ্লবিক অমিত সম্ভাবনার স্বরূপ।

"অমিত সম্ভাবনা" হয়ে ওঠে গুরুত্বের তকমা লাগানো শব্দ-গুচ্ছ। জরুরি পরিস্থিতিকে পরিবর্তনের কোনো সুসংহত কৌশল থাকে না। টুজ লিখেছেন, "আপাত দৃষ্টিতে ধারণা জন্মাতে পারে উদার ভাবে তহবিল গড়তে আর্থিক ও মুদ্রানীতির শক্তিশালী সংশ্লেষ একতালে কাজ করছে। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে তাকালেই দেখা মিলবে সংশয়ী এবং অঙ্গ-বৈকল্যের এক দানবকে। বর্ণালীবীক্ষণের আওতায় নেওয়া হলে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এবং জেকিল ও হাইড চরিত্রের মাঝামাঝি কোনো অবস্থানে আবিষ্কৃত হবে এ নীতি আলেখ্য।"

এ সব কাহিনি থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, জরুরি পরিস্থিতির তাড়না নয় বরং নীতিভিত্তিক টেকসই এবং যথার্থ পরিবর্তনের নিয়ামক হতে পারে যথাযথ সময় এবং সঠিক কাল। রাজনৈতিক শক্তির প্রতিফলন এবং জনমানস গড়ে তোলায় তার আবর্তনের ওপরই বর্তায় যে কোনো পরিবর্তন। অমিত সম্ভাবনা এবং চিন্তা ধারার প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যাবে না তবে কেবল এই দুইয়ের মিলনই পরিবর্তন ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট হতে পারে না।

বিশ্বমারির প্রতি আরো বৃহত্তর আঙ্গিক থেকে নজর দিলে তার প্রকৃতি ভালো ভাবে উপলব্ধি করা যায়, শুধু দেশীয় নীতিমালার চত্বরের মধ্যে আবদ্ধ থেকে নজর বুলালে চলবে না। ২০০৮ সালের মার্কিন-ইউরোপীয় আর্থিক সংকট বিশ্লেষণ করতে যেয়ে ক্রাশড নামে বই লিখে টুজ প্রশংসায় ভেসেছিলেন। তার সেই অভিজ্ঞতা এবারেও কাজে লেগেছে। টুজ মনে করেন, "২০২০কে নব্যউদার যুগের বিস্তৃত এক সংকটের প্রেক্ষাপটে দেখা হলে – এর পরিবেশগত নীতি-আচ্ছাদন, এর গার্হস্থ্য সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ভিত্তিমালা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিয়ে অবস্থান- আমাদেরকে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে।"

তিনি ঠিকই বলেছেন যে বিশ্বমারি সংকটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং পরস্পরকে শক্তি যুগিয়ে চলেছে আরো তিন সংকট। চলমান এ তিন সংকট হলো: পরিবেশ,  ভূরাজনৈতিক এবং সরকারের প্রতি আস্থার সংকট। তারপরও ঐতিহাসিক তাৎপর্য পরিবেশন করতে যেয়ে তিনি জানান, "নব্য উদারবাদ" এ ক্ষেত্রে অজানা। ২০২0র সংকটের সূচনা হয়েছে এমন এক দেশে যে দেশ "অ-নব্য উদারবাদী" বা নব্য উদারবাদের বাইরে থাকার সিদ্ধান্তে অবিচল। কিন্তু চীনে সৃষ্ট এ সংকট সকল মূল্যবোধের দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলেছে। "নব্য উদারবাদ" যদি শুধুই একটি চমকপ্রদ নাম হতো তা হলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের এ যুগে এর একটি অর্থ দাঁড়াত। আদর্শকে যদি বাদ দেওয়া হয় এবং তা বদলে ক্ষমতার দিকে মনোযোগ দেই তবেই আমাদের ঐতিহাসিক তাৎপর্য গুলো আরো ভালো ভাবে পরিবেশন করা যায়।

দুই

আফটারশকে মার্কিন দুই চিন্তাশীল, ঐতিহাসিক মননশীল এবং দ্রুত একের পর এক বিশ্লেষণে পারঙ্গম লেখক এ কাজই করেন। মার্কিন শিক্ষাবিদ কলিন কাহল জো বাইডেনের সরকারে প্রতিরক্ষা আন্ডার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন। থিংক ট্যাংক ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনে সিনিয়র ফেলো থমাস রাইট। বিশ্বমারির বিকাশ এবং বিভিন্ন দেশের সরকার এ সংকটের মোকাবেলায় কেমন সাড়া দিয়েছেন সে ধারাবিবরণীও দিয়েছেন উভয়ই। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশ্বমারি সৃষ্ট সংকটের উন্মোচন এবং সংকট বৃদ্ধির বিষয়গুলো থেকেছে তাদের মনোযোগের কেন্দ্রতে।

কলিন কাহল

কোভিড-১৯'র মতো বৈশ্বিক হুমকি দেশ, মতাদর্শ বা জাতির মধ্যে কোনো ভেদাভেদই করেনা। এমন হুমকি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোকে একযোগে কাজ করতে উৎসাহ যোগায়। কিংবা বাধ্য করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বরং বিপরীতটাই ঘটেছে। এটি হয়ে ওঠে পদ্ধতিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার। ২০০৮'এর অর্থনৈতিক সংকটের উল্টোটাই ঘটেছে। সহযোগিতার অভাব দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য ভাবেই।



থমাস রাইট

কহল এবং রাইটের লেখা বইটি সুলিখিত। এতে নথিভুক্ত হয়েছে অনেক কিছু। এই বইয়ে তুলে ধরা হয় যে বিশ্বমারি-পূর্ব পরিস্থিতি নতুন করে গতি পেয়েছে। আমেরিকা ও চীনের মধ্যে পারস্পরিক বৈরিতা অনেক দশক ধরেই বাড়ছিল। দুই পক্ষই নিজ নিজ বিন্যাস-ব্যবস্থাকে আরো জোরাল করে নিজ নিজ কর্মসূচি নিয়ে এগোতে থাকে। প্রতিষ্ঠা করতে থাকে নিজ নিজ বিধিবিধান। এরপরও দুপক্ষের মধ্যে কেবল প্রয়োজন নয় বরং সহযোগিতার সম্ভাবনাও বিরাজ করছে।


আফটারশকস বইয়ের প্রচ্ছদ

গত ৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে। এ সত্ত্বেও কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বড়ই গরিবি হালে রয়েছে। উভয় রাজধানীর নীতির তাড়নায় দেশদুটির অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। দেশদুটির প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকট হয়ে উঠেছে। চীনা ভাষায় বর্ণিত "মধ্য সাম্রাজ্যের" মতোই নিজ নিজ নিয়মে, টিকা বিতরণ, ঋণ দেওয়া এবং অর্থ ব্যয়ের তৎপরতার মধ্য দিয়ে পৃথক পৃথক শক্তিমান নক্ষত্রপুঞ্জ হয়ে উঠেছে। একপক্ষ অন্য পক্ষের তোয়াক্কা করছে না।

আমেরিকা এবং চীনের এর বিভাজনের উদ্বেগ দেখিয়েছেন টুজি। প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো "কেন্দ্রীভূত বহুমুখীতা"র মতো অভিনব অভিধার টোপর পড়িয়েছে। কহল এবং রাইটের ভাষ্যে, বিশ্বমারির মাঝে বসে থেকেও এখন যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে ফলপ্রসূ শক্তি হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বমারিকে কতো দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায় তা নির্ধারণ করা হবে এরই ভিত্তিতে। সরকারি ঋণের মতো বিশ্বমারি পরবর্তী ধকল সামলাতে আমাদের সাড়া কতোটা কার্যকর হবে তা নির্ধারণ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সংকট কতোটা আন্তরিক ও গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবেলা করব সে কর্মপন্থাও ঠিক করবে। শান্তি আমাদের সহযাত্রী হবে নাকি যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী পাদচারণা চলবে তাও নির্ধারিত হবে। দীর্ঘ মেয়াদের প্রভাব বলয় এর চেয়ে আরো মৌলিক কখনোই হয়ে ওঠেনি।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]

আরো পড়ুন: কোভিড এবং নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা

Share if you like

Filter By Topic