নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলেই একেবারে গেইটের সাথে লাগানো দক্ষিণ পাশে প্রথমেই যে স্থাপনাটি চোখে পড়ে সেটি হল মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাণ উৎসর্গকারী তিন মহান ব্যক্তিত্বের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। যাঁদের স্মরণে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভ তাঁরা এই স্কুলেরই কৃতি শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁরা হলেন শহীদ বুদ্ধিজীবি ড. ফজলুর রহমান খান, শহীদ দবির উদ্দিন আহমেদ ও শহীদ আনোয়ারুল আলম খান চৌধুরী কামাল। এই বিদ্যালয়েরই কৃতি শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস-এর পরিচালনা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব সাজ্জাদুল হাসানের বিশেষ উদ্যোগে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য শুধু যে গৌরবের তাই নয়, এটি সবার জন্য অনুপ্রেরণারও একটা বিষয়।
এই স্মৃতিস্তম্ভটি জনাব সাজ্জাদুল হাসানের অন্যতম প্রিয় একটি স্থাপনা। মোহনগঞ্জে এসে তিনি পাইলট স্কুল না দেখে চলে গিয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত যেমন বিরল, তেমনি পাইলট স্কুলে এসে স্মৃতিস্তম্ভটি না দেখে চলে গেছেন এমন দৃষ্টান্তও বিরল। বরং সৃতিস্তম্ভটি নিয়মিত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয় কিনা, নিয়মিত যত্ন নেওয়া হয় কিনা, এর সামনের টবের ফুলগাছগুলো ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি বিষয়ের খোঁজ খবর না নিয়ে কখনও যান না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব হিসেবে কর্মরত থাকার সময় জনাব সাজ্জাদুল হাসান ২০১৮ সালের মহান শহিদ বুদ্ধিজীবি দিবসে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়িত এই স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। আর ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী এই স্মৃতিস্তম্ভের ফলক উন্মোচন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মাননীয় মন্ত্রী জনাব আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক এমপি।
শহীদ বুদ্ধিজীবি ড. ফজলুর রহমান খান (২মার্চ ১৯৩১- ২৬মার্চ ১৯৭১) নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার কাজিয়াটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল হাকিম খান ও মাতার নাম ফিরোজা খাতুন। তিনি মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে আইএসসি পাশ করেন। অত্যন্ত মেধাবী এই মানুষটি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে যথাক্রমে বিএসসি ও এসএসসি পাশ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রভাষক পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভের পর একই বছরের ১৫ আগষ্ট তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র প্রভাষক পদে উন্নীত হন। শিক্ষক হিসেবে তিনি অত্যন্ত সুনামের অধিকারী ছিলেন।
একাত্তরের মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমান জহুরুল হক হল) পাশের আবাসিক শিক্ষক ভবনের তিন তলার ২৩/ক ফ্ল্যাটটিতে থাকতেন। ২৬মার্চ প্রথম প্রহরে হাজার বছরের স্রেষ্ঠ বাঙালী মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আর ২৬মার্চের শেষ রাতে হানাদার বাহিনী ড. ফজলুর রহমান খান ও তাঁর ভাগ্নে কাঞ্চনকে ঐ ফ্ল্যাট বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্যাতন করার পর গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। ২৭মার্চ কারফিউ শিথিল হলে মরহুমের মামাতো ভাই তৎকালীন আওয়ামীলীগের প্রচার সম্পাদক (পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় মন্ত্রী) আবদুল মমিন মহোদয়ের বাসায় মরদেহ আনা হয়। পরে আজিমপুর কবরস্থানে দাপন সম্পন্ন করা হয়।
পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতায় এভাবে তাঁর জীবন প্রদীপ আপাতত নিভে গেলেও ইতিহাস থেকে তাঁর নাম চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। বরং এদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মনিকোটায় তিনি বেঁচে থাকবেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে। তিনি শুধু এখন মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুল বা মোহনগঞ্জবাসীর গৌরবের পাত্র নন। বরং তিনি এখন সারা দেশের মানুষের কাছে অনুপ্রেরণারও উৎস।
মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ দবির উদ্দিন আহমেদ (১৯৪৬--২২অক্টোবর ১৯৭১) ছিলেন মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন কৃতি খেলোয়াড় এবং ঢাকা ব্রাদার্স ইউনিয়নের তালিকাভুক্ত একজন স্বনামধন্য ফুটবলার। ফুটবল, দৌড় প্রতিযোগিতা, জাম্পিং ইত্যাদি নানা প্রতিযোগিতায় পারদর্শী ছিলেন তিনি। ছিলেন সাহসী ও প্রাণবন্ত একজন মানুষ। ফলে সহজেই মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতেন তিনি।
হাজার বছরের স্রেষ্ঠ বাঙালী মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারা দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন তিনি। তাঁর মা ছিলেন নাটক সিনেমার মাদেরকে হার মানানো এক মহীয়সী নারী। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সময় তাঁর মা নিজের আংটিটি ছেলের হাতে পরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, "দেশের জন্য, মায়ের জন্য স্বাধীনতা আনতে যাচ্ছো, এই স্মৃতিটুকু রাখো, অদম্য সাহস-বল তোমাকে সঙ্গ দিবে।" দবির উদ্দিন আহমেদও ছিলেন মায়ের যোগ্য ছেলে। মায়ের কাছে স্বাধীনতা আনার অঙ্গীকার করেই যুদ্ধে গেলেন তিনি। যুদ্ধের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যেমন গোপন তথ্য আদান-প্রদান, গোলাবারুদ বহন ইত্যাদি কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তিনি। এক পর্যায়ে ২০ অক্টোবর বর্বর পাক হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পরেন তিনি। তাঁর উপর চলে নির্মমতম নির্যাতন। অবশেষে ২২অক্টোবর সকালে খোলা ট্রাকে করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নেত্রকোণার চল্লিশায় নদীর পাড়ে। আর সেখানেই গুলি করে তাঁকে ফেলে দেওয়া হয় নদীতে। প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে গিয়ে এভাবেই নিজেকে উৎসর্গ করে গেলেন অসীম সাহসী এক বীর যোদ্ধা।
বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে শহীদ দবির উদ্দিন আহমেদের প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে হয়ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের পৈশাচিক উন্মাদনা প্রকাশ করতে পেরেছিল। কিন্তু তাঁর প্রাণের স্পন্দন যে স্বাধীনতা সেটা তারা কেড়ে নিতে পারেনি। একজন শহীদ দবির উদ্দিন আহমেদ স্বাধীনতার লাল সূর্য নিয়ে তাঁর মায়ের কাছে ফিরে আসতে না পারলেও লাখো দবির উদ্দিন আহমেদকে পাকিস্তানিরা দমিয়ে রাখতে পারেনি। স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনে হানাদারদের অত্যাচার আর পৈশাচিকতার দাঁতভাঙা জবাব তাঁরা ঠিকই দিয়েছেন। শহীদ দবির উদ্দিন আহমেদের রক্তে রাঙা স্বাধীনতার লাল সূর্য যতদিন থাকবে ততদিন তিনিও থাকবেন এদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়।
শহীদ আনোয়ারুল আলম খান চৌধুরী (কামাল) (১৯৫২---২১অক্টোবর ১৯৭১) একজন। তাঁর পিতা মরহুম মোফাজ্জল হোসেন খান চৌধুরী (ছদ্দু মিয়া) ও মাতা হোসনে আরা খানম। নেত্রকোণার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামে তাঁর পৈতৃক নিবাস হলেও পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই তাঁর বাবা পরিবার নিয়ে মোহনগঞ্জে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শহীদ কামালের জন্মও মোহনগঞ্জেই। মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর পরিবার ভারতের মহেশ খলায় আশ্রয় নেয়। মাতাপিতার অনুমতিক্রমে তিনি বিএলএফ-এ রিক্রুট হয়ে হাফ লং ট্রেনিং সেন্টারে চলে যান। ট্রেনিং চলাকালে রক্ত আমাশয়ে আক্রান্ত হন। যুদ্ধে অংশগ্রহনে বিরত রাখা হতে পারে এই ভয়ে তিনি আমাশয়ের সংবাদ কাউকে জানতে দেননি। নাক-মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণে জটিল অবস্থা ধারণ করলে তাঁকে নিউ জলপাইগুড়ি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ১৯৭১সালের ২১ অক্টোবর তিনি মৃত্যুর সুশীতল কোলে ঢলে পড়েন। ভারতে অবস্থানরত পিতা-মাতার নিকট ২১দিন পর এই সংবাদ পৌঁছে।
বিএলএফ-এর ঢাকা বিভাগের সহ অধিনায়ক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহম্মদের সহযোগিতায় তাঁকে নিউ জলপাইগুড়ির সাহেব বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জনাব কামালের মৃত্যুর পর ভারতের মেঘালয়ের তূরায় আয়োজিত দোয়া মাহফিলে যুদ্ধকালীন মহেশখলা ক্যাম্প ইনচার্জ, পরবর্তীতে গণপরিষদ সদস্য ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ অংশগ্রহন করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিএফএল-এর একজন সহযোদ্ধা শহীদ কামালের রক্তমাখা একটি শার্ট ও সৈয়দ আহম্মদ সাহেবের লিখিত পত্র মোহনগঞ্জে তাঁর নিজ বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। উক্ত পত্রে আনোয়ারুল আলম খান চৌধুরী (কামাল)-এঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ ছিল।
উল্লিখিত তিন শহীদের মধ্যে একজন মাত্র সংসার জীবন শুরু করেছিলেন। দুইজন সংসার জীবন শুরুই করতে পারেননি। আমরা যদি সারা দেশের বীর যুদ্ধাদের দিকে লক্ষ্য করি দেখব তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন যুবক বয়সী। অধিকাংশই ছিলেন কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, অনেকেই ছিলেন স্কুল পড়ুয়া দুরন্ত কিশোর যাঁরা প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে নিজের আপনজনদেরকে একেবারেই অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে বঙ্গবন্ধুর ঢাকে এক অসম শক্তির যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে ছিলেন। অনেকেই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, অনেকেই নিজে বেঁচে ফিরলেও হারিয়েছেন ঘর-বাড়ি-সম্পদ, হারিয়েছেন বাড়িতে রেখে যাওয়া প্রিয়জনদের। তাঁদের রয়েছে কত দুঃখ আর বেদনার ইতিহাস। তাঁদের ভারাক্রান্ত হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস কতটুকু স্পর্শ করে আমাদেরকে?
মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তিন শহীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি বীর যোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটু প্রয়াস মাত্র। আর এই শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগটা করে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস-এর বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব সাজ্জাদুল হাসানকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এই স্মৃতিস্তম্ভটি না থাকলে আমার পক্ষে হয়ত এই মহান তিন শহীদ সম্পর্কে জানা সম্ভব হতো না। এর মাধ্যমে স্কুলের নতুন প্রজন্ম তাদের স্কুলের পূর্বসূরিদের বীরত্বের কথা যেমন জানতে পারবে তেমনি তারা এইসব বীরদের জীবনকাহিনী থেকে দেশপ্রেমের প্রেরণা পাবে। আমাদের উচিত নতুন প্রজন্মের কাছে বীর যোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথা সঠিকভাবে তুলে ধরা।
মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুলের তিন শহীদসহ বাংলাদেশের জন্য যুগে যুগে যাঁরা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের সবার প্রতি আমি স্কুলের বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের পক্ষ বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁদের সবাইকে যোগ্য পুরস্কার দান করুন। আমিন।
[তথ্য সূত্রঃ মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তিন পাইলটিয়ান শহীদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে লেখা শহীদদের সংক্ষিপ্ত জীবনী।]
লেখক মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)
