শতবর্ষের তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে, “আজি হতে শতবর্ষ আগে”


মোঃ ইমরান খান | Published: July 01, 2021 19:33:12 | Updated: July 02, 2021 11:06:57


শতবর্ষের তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে, “আজি হতে শতবর্ষ আগে”

শিক্ষার্জনে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, শিক্ষার অধিকার সবার। এ দর্শনের জন্যই হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নির্দিষ্ট প্রবেশদ্বার নেই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জন্ম হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, যার এই মুমূর্ষু করোনাকালে কোনো উদযাপন ছাড়াই শতবর্ষ পূর্ণ হলো।

অলিগলি রাজপথ

ঢাবির নিউক্লিয়াস টিএসসি বা ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো স্থানকে কেন্দ্র করে এত আবেগ ও স্মৃতি তৈরি হয়েছে কি না, বলা দায়। টিএসসিকে আড্ডার রাজধানী বললেও ভুল হবে না। ঢাবির শিক্ষার্থী বা বহিরাগত, সবাই এই জায়গাটিতে আড্ডায় মেতে ওঠেন। এই এলাকাটিকে ঢাবির সংস্কৃতিকেন্দ্রও বলা চলে। এর বক্রাকার লাল ছাউনি যেন পরম স্নেহে শিক্ষার্থীদের আগলে রাখে। পরীক্ষার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, জন্মদিন পালন, প্রেম কিংবা নবীনদের কন্ঠে স্পন্দিত গানের আসর, সবকিছু জোয়ারের মতো জড়ো হয় এই প্রিয় স্থানে।

এক ঝাঁক তরুণের আড্ডা কিংবা একাকী বসে থাকা বন্ধুহীন কেউ, টিএসসি সবার। শত বর্ষের বিশ্ববিদ্যালয় আর প্রায় ষাটের এই টিএসসি কখনো বুড়ো হয় না। একজন ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিও টিএসসির প্রাঙ্গণে এসে হয়ে ওঠেন টগবগে তরুণ।

টিএসসি অতিক্রম করলে, লাল কংক্রিটের যে রাজপ্রাসাদটি লক্ষ করা যায়, সেটি কার্জন হল। বাংলাদেশের আকর্ষণীয় স্থাপত্যে নিদর্শনগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। লাল কংক্রিটের দালান, আঁকাবাঁকা করিডোর, বড় বড় কাঠের দরজা, কাঠের সিঁড়ি মনে করিয়ে দেবে বহু বছর আগে ফেলে আসা স্মৃতির দুয়ারে থাকা আমাদের সোনালী অতীতের কথা।

একসময় বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে কবি-সাহিত্যিকদের পদচারণা থাকলেও বর্তমানে সেলফি তোলার জন্য মন্দ জায়গা নয় এই কার্জন হল। কার্জনের আশেপাশে আরো কয়েকটি হল রয়েছে। এর মধ্যে পেছনের হলটি হলো শহীদুল্লাহ হল, যার পাশেই রয়েছে একটি পুকুর। কিছুদিন আগে অবধি পুকুরপাড়ে তরুণদের ধুন্দুমার আড্ডা চললেও শেষবারে গিয়ে শোনা গেল, পুকুরপাড়ে ছেলে-মেয়ে একসাথে বসা নিষেধ। তবে কর্তৃপক্ষ দয়ালু, ছেলেমেয়ে বসতে না পারলেও দাঁড়াতে পারবে- এরকম নির্দেশনা আছে। পুকুর অবশ্য এখন নোংরা ও মৃত। মসজিদের এক কোণে তাই অভিমান করে শুয়ে থাকেন ভাষাবিদ শহিদুল্লাহ।

কার্জন থেকে আগত কেউ টিএসসি অতিক্রম করলে কলাভবনে এসে পৌঁছাবেন। প্রাণকেন্দ্র টিএসসি আর ঐতিহ্য কার্জন হলে, কলাভবন হলো বৈচিত্র্যের নিদর্শন। এটি একইসাথে শিক্ষার্থীদের প্রাণকেন্দ্র, শিক্ষাকেন্দ্র, আন্দোলন ও সমাবেশ কেন্দ্র এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। এ রাস্তা ধরেই রয়েছে শ্যাডো, বটতলা, অপরাজেয় বাংলা, ডাকসু ক্যান্টিন। পেছনে রয়েছে মধুর ক্যান্টিন, লেকচার থিয়েটার এবং সামাজিক বিজ্ঞান ভবন। কলাভবন বিশাল। গোলকধাঁধার মতো। যে কেউ তার অলি-গলিতে হারিয়ে যেতে পারে।

প্রকৃতির পথে

ঢাবির রয়েছে গাছপালায় পরিপূর্ণ বৃহত্তর এক প্রাকৃতিক পরিবার। যে পরিবারের অধিকাংশ সন্তানেরা মল চত্বর ও তার আশপাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে। পরিবারের বাবার মতো ঢাবির ছায়া হয়ে আছে ভিসি চত্বরের রেইন ট্রি গাছটি। শাখা-প্রশাখা তার দুপ্রান্ত বিস্তৃত পাখির ডানার মতো। ঝড় বা প্রখর রোদে, ডানার নিচে পাখির বাচ্চার মতো আশ্রয় নেয় ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা। বর্ষার মৌসুমে চুঁইয়ে পানি পড়ে বাতাসে পাতার থর্থর্ কম্পনে। গ্রীষ্মের দুপুরে মল চত্বরে কোনো এক গাছের ছাউনিতে ঘুমিয়ে থাকে ক্লান্ত রিকশাওয়ালা। প্রাকৃতিক পরিবারের এই সন্তানদের অনেকেই এখন আর নেই। আধুনিক সৌন্দর্যবর্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কারণে তাদের কেটে ফেলা হয়েছে। শতবর্ষী বিদ্যাপীঠের প্রকৃতির ছায়াইয় রিকশাওয়ালাদের ঘুম সম্ভবত এখন ভেঙেছে।

রসনার বিস্তার

ঢাবির হলগুলোতে খাবারের আয়োজন কম নয়। ভাত, মাছ-মাংস, সবজি। সাথে নানা পদের ভর্তা হরহামেশাই এখানে পাওয়া যায়। মায়ের হাতের রান্না থেকে বঞ্চিত দূর প্রান্তের এই শিক্ষার্থীদের সকাল-দুপুর-রাতে পেট ভরে খাওয়া হয় ক্যান্টিনগুলোর বদৌলতে। জসীমউদ্দিন হলের হাঁস, মুহসীন হলের মাংস, জগন্নাথের লুচি কিংবা সন্ধ্যার পর হাকিম চত্ত্বরে হালিম, বহিরাগত বা স্বঢাবি- সকলের কাছে এগুলো প্রিয়।

পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা জুড়ে রাস্তার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ফুচকা-ভেলপুরি। ভিনদেশী চেরি কিংবা স্ট্রবেরি কোনোটাই রেহাই পায় না এখানে এসে টক-ঝালের ভর্তা হতে।

কয়েকটি কুকুর সারিবদ্ধ হয়ে ঘুরে বেড়ায় ফুচকা-ভেলপুরির মামাদের পা ঘেঁষে। কাজের ফাঁকে শিক্ষার্থী থেকে কর্মচারী সবাই আসে এক বাটি ফুচকার জন্য, কারো কারো চলে ঝাল বাড়িয়ে দেয়ার আবদার। খাবারের সাথে মিশে থাকে টক-ঝাল-মিষ্টি সম্পর্কের অনুভূতি।

স্মৃতির আঁকিবুঁকি

হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ঠিকানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে এর বাসিন্দাদের স্মৃতির কমতি নেই। মানুষের সাথে রাস্তা, ডিপার্টমেন্টের করিডোর, খটখটে কাঠের বেঞ্চির আঁকিবুঁকি, সবকিছুর সাথে রয়েছে অটুট সম্পর্ক।

ঢাবি, বন্ধু-বান্ধব, অগ্রজ-অনুজ এবং শিক্ষক কেন্দ্রিক অনেক স্মৃতি রয়েছে অতীতের, নতুন যুগেও অভাব নেই ঢাবিতে।

অনুভূতির বয়ানে

ভালোলাগা ও ভালোবাসা- এই শব্দ যুগলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে নিজের আবেগ ব্যক্ত করেছেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রুমানা নওশিন খান। তবে প্রিয় প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কাছে আবদার হিসেবে ক্যান্টিন ও হলগুলোর সু্যোগসুবিধা বৃদ্ধি করা হোক, এটি তার ইচ্ছে।

ইসলামিক স্টাডিজের ছাত্র, ওয়ালি খান রাজু এই ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ হতে পেরে গর্বিত। তবে তিনি মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেক দিকেই পিছিয়ে আছে‌। মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ, সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রশাসনিক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ হলো তার দাবি।

শতবর্ষে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পুরনো হয়ে যায় না, একটি বর্ষীয়ান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য যেন এটিই তারুণ্যের সময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো তরুণ, না কি বার্ধক্যে নুয়ে পড়েছে তার কাঁধ? এ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত ঢাবির সন্তানদের হাতেই। এ প্রতিষ্ঠানের বাণীতে শিক্ষাই যেহেতু আলো, সেখানে আশা করা যায়, একদিন সত্যের জয় হবে সুনিশ্চিত। শততম জন্মদিনের শুভেচ্ছা, বাংলাদেশের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার অন্যতম পীঠস্থান- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com

Share if you like