লোটাস সিল্ক: পদ্মফুল থেকে বিশ্বের অন্যতম দামি সুতা


মোজাক্কির রিফাত | Published: January 29, 2022 17:23:27 | Updated: January 29, 2022 19:26:50


একটি ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি

পদ্ম ফুলকে বলা হয় জলজ ফুলের রানি। পদ্ম বা লোটাসকে লোকে চেনে তার সৌন্দর্যের জন্যই। কিন্তু পদ্মের মহিমা শুধু এই রূপেই নয়। পদ্ম থেকেই তৈরি হয় বিশ্বের সবচেয়ে দামি সিল্ক সুতাও!

মায়ানমার, থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার হ্রদ থেকে পদ্ম সংগ্রহ করা হয়। এ পদ্ম থেকে আহরিত তন্তু হাত দিয়ে কাটা হয়।

তারপর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তন্তু বানানো হয় যা প্রাণীজ রেশমের মতই, ক্ষেত্রবিশেষে আরো উন্নত। এই বিশেষ সুতার কাপড় লোটাস সিল্ক নামে পরিচিত। লোটাস সিল্ক বিশ্বের প্রথম উৎপাদিত মাইক্রো ফাইবার এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব কাপড়।

পদ্ম ফুলের শাখা থেকে তন্তু সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯১০ সাল থেকে। মায়ানমার এবং কম্বোডিয়াতে সর্বপ্রথম এই তন্তু উৎপাদন শুরু হয়। মায়ানমারের মুয়াং তাই রাজ্যের কেন্দ্রে অবস্থিত ইনলে লেকে লোটাস ফাইবার প্রথম সংশ্লেষিত হয়।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এ লেক সংলগ্ন কেয়াংখান গ্রামে ইন্তা নৃ গোষ্ঠীর সাও নামে একজন নারী পদ্ম বুনন উদ্ভাবন করেন। তৎকালীন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পরিধানের জন্য লোটাস সিল্ক ব্যবহার করত। এ সূত্র ধরে কাপড়টির জনপ্রিয়তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

লোটাস ফাইবার দিয়ে নির্মিত কাপড় পরিধানের জন্য খুবই আরামদায়ক। পদ্মের শাখা এবং কান্ড ব্যবহার করে একটি বর্জ্যকে কাপড়ে পরিণত করা হয়। এই সময়ে কোনোরকম রাসায়নিক দ্রব্য এবং কৃত্রিম রঞ্জক ব্যবহার করা হয় না। এজন্য এই কাপড়কে সর্বাধিক পরিবেশবান্ধব কাপড় বলা হয়।

বেশ কয়েকটি ধাপে পদ্ম থেকে সুতা সংগ্রহ করে কাপড় প্রস্তুত করা হয়। প্রথমেই পদ্মের অনেকগুলো শাখাকে একত্রিত করা হয়। শাখাগুলোকে একসাথে কেটে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ২০ থেকে ৩০টি ভাগে ভাগ করা হয়। তারপর এই ছোট অংশগুলোকে রোলিং প্রক্রিয়ায় সুতায় পরিণত করা হয়। সুতা আলাদা করার পর সুতার জটকে বাশের তৈরি ঘূর্ণনযন্ত্রে ঘোরানো হয়।

সুতাগুলো পেঁচিয়ে যাওয়ার ভয় থেকে প্রতি ৪০ মিটার অন্তর বিরতি দেয়া হয়। আবার নতুন সুতা নিয়ে চরকা কাটার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। পরে এই সুতা দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রস্তুতকৃত লুম নামে এক ধরনের যন্ত্রে বোনা হয় কাপড়।

প্রতিটি কাপড়ের প্রশস্ততা হয় প্রায় ২৪ ইঞ্চি। একখন্ড পরিপূর্ণ কাপড় তৈরিতে ১,২০,০০০ পদ্ম ফুলের শাখার প্রয়োজন হয়। পুরো কাজটি হাতে করা হয় বলে অনেক সময় লাগে আবার উৎপাদনের পরিমাও হয় কম।একখন্ড লোটাস সিল্কের কাপড়কে ধরলে মনে হবে লিনেন এবং সিল্কের মিশ্রণ; হলুদাভ সাদা রঙ।

উচ্চ পদমর্যাদার বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বৌদ্ধমূর্তিকে লোটাস সিল্কে সাজানোর প্রাচীন ঐতিহ্য আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু স্থানে। একচেটিয়া উৎপাদন কষ্টসাপেক্ষ বলে এসব রীতিসিদ্ধ ব্যাপারের বাইরে এখন লোটাস সিল্কের ব্যবহার খুব বেশি চোখে পড়ে না।

ইউরোপের অভিজাত বাজারগুলোতে পদ্মতন্তুর তৈরি জ্যাকেট পাওয়া যায় তবে তা সংগ্রহের জন্য রুচিশীলতার সাথে থাকা চাই সামর্থ্যও। ইউরোপের বাজারে একটি লোটাস সিল্ক জ্যাকেটের বিক্রয়মূল্য গড়ে ৫,৬০০ ডলার!

তবে অনেক প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য অনুসরণের পাশাপাশি লোটাস সিল্কের বাণিজ্যিকীকরণে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সংযোজন করছে। কম্বোডিয়ার সামাতোয়া লোটাস টেক্সটাইলস কোম্পানিতে গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রস্তুতপদ্ধতিকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে।

যন্ত্রসহযোগে সেখানে কাপড় তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। বাজারের সাথে সাথে এর পরিবেশবান্ধবতাও একে বর্তমানে আভিজাত্যের এক অনন্য অনুষঙ্গ করে তুলছে বিশ্বজুড়ে।

মোজাক্কির রিফাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

anmrifat14@gmail.com

Share if you like