ট্রেনের সিটে বসে আছে লাল। বললেন, “আমার মা বলতেন জীবন গোল গাপ্পার মতো, পেট ভরলেও মন কখনো ভরবে না।” লাল সিং চাড্ডা সিনেমায় আমির খান যখন এই কথাটি বলেন তখন আমাদের স্মৃতি চলে যায় বাসের জন্য অপেক্ষারত ফরেস্ট গাম্পের কাছে যিনি চকলেটের বক্স হাতে নিয়ে বলেন “মা বলতেন জীবনটা হলো একটা চকলেটের বক্স, তুমি জানো না কখন কোনটা হাতে আসবে।”
দুইটা সংলাপ খেয়াল করলে দেখা যায় চকলেট আর বাস স্টেশনের জায়গায় ট্রেন আর গোল গাপ্পার কথা বলছে লাল সিং চাড্ডা।
বাহ! কি চমৎকার সৃজনশীলতা, তাই না? পরীক্ষায় বন্ধু উত্তর কপি করার সময় যখন নামটা শুধু ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, ঠিক তেমন। একদম জীবন থেকে নেয়া, বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাচ্ছি লাল সিং চাড্ডায়।
আইসক্রিমের ডিব্বায় পেঁয়াজ বাটা, রসুন রাখার মতো অভিনব সব আইডিয়া নিয়ে তৈরি লাল সিং চাড্ডা ফরেস্ট গাম্প থেকে কতটা আলাদা একটু দেখে নেয়া যাক।
শিখ ধর্মাবলম্বী লাল
প্রথমে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো ফরেস্ট গাম্পে টম হ্যাঙ্কসকে একজন প্রতিবন্ধীর ভূমিকায় দেখা যায়। লাল সিংয়েও তাই। এখানে পার্থক্য কোথায়?
ফরেস্ট গাম্পে টম হ্যাঙ্কসকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা যায় না। আরেকটু গুছিয়ে বলতে এমন কোনো অঞ্চলের অধিবাসী যাদের ভিন্নভাবে দেখা হয়। লাল সিং চাড্ডায় আমিরের চরিত্রে তা দেখা যায়। ভারতীয় সিনেমায় পাঞ্জাবী শিখদের বেশিরভাগই হাস্যরসাত্বক এবং বোকা হিসেবে দেখানো হয়। এমন পাঞ্জাবি যিনি সব সময় কম বোঝেন বা দেরিতে বোঝেন, যাকে সহজে সবাই বোকা বানাতে পারে, যিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।
উদাহরণস্বরূপ সিং ইজ কিং, গুড নিউজ, কাভি খুশি কাভি গাম, নামাস্তে লন্ডন এরকম অসংখ্য সিনেমার কথা বলা যায়। এসব সিনেমাতে শিখ হিরো হলেও তাদেরকে দিয়ে গুরুগম্ভীর চরিত্রায়ন হয়নি। পাঞ্জাবিদের নিয়ে বলিউড যে নির্দিষ্ট ছক আঁকে বরং সেটাই পাকাপোক্ত হয়। কোনো পার্শ্ব চরিত্র যে সবসময় হাসিখুশি থাকে তিনি হন একজন পাঞ্জাবি। বাজারে ‘সান্তা-বান্তা আর সরদার জি’ নিয়ে কৌতুক আরো আগে থেকেই প্রচলিত।
শুধু পাঞ্জাবি নয়, দক্ষিণের সবাইকে তামিলিয়ান হিসেবে দেখায় বলিউড যারা সবাই লুঙ্গি পরে আর ইডলি, ডোসা ও সাম্বার খায়। তাদের গায়ের রং কালো ও বেশ মেধাবী।
আমির খানের লাল সিং চাড্ডা বলিউডের এই গতানুগতিক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। ফরেস্ট গাম্পে আর যাই হোক টম হ্যাঙ্কস কোনো ‘বিশেষ গোষ্ঠীভুক্ত’ নন। লাল ব্যতিক্রম বটে!
যুদ্ধ
ফরেস্ট গাম্পে যেহেতু যুদ্ধের দৃশ্য আছে লাল সিং কী করে যুদ্ধ ছাড়া থাকতে পারে? এর ওপর দেশ যেহেতু ভারত যার প্রতিবেশী পাকিস্তান সেখানে যুদ্ধের তো কমতি থাকার কথা না।
তাই ভিয়েতনাম যুদ্ধকে এখানে পাক-ভারত যুদ্ধে রূপ দেয়া হয়েছে। কথা হলো পাক ভারতের কবেকার যুদ্ধ এটি? সম্ভবত ‘৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ। রাষ্ট্রপতি কে. আর নারায়ণ লালকে মেডেল পরিয়ে দেয়ার দৃশ্যটি এটি প্রমাণ করে।
ফরেস্ট গাম্প সিনেমায় যুদ্ধকালীন বন্ধুকে কাঁধে নিয়ে দৌড়ান টম হ্যাঙ্কস। আমির খানকে এখানে ‘পিকে’ চরিত্রের মতো দৌড়াতে দেখা যায়। ফরেস্ট গাম্প থেকে ব্যতিক্রম কীভাবে হলো বোঝা গেল?
একপাক্ষিক ভালোবাসা
১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমায় ফরেস্টের ভালো লাগা শুরু হয় স্কুলের বাসে। লাল সিং এখানেই ভিন্নতার পরিচয় দেয়। তাদের বন্ধুত্ব শুরু স্কুলের বেঞ্চে।
জেনির চলে যাওয়ার মতো রূপাও লালের সাথে থাকতে চায় না। ‘আমাদের মাঝে সম্ভব নয়’ রূপার কথায় সাদা কালো যুগের সিনেমার কথা মনে পড়ে যায়। কি অদ্ভুত ভিন্নতা দুটি সিনেমায়!
তবে লাল সিং চাড্ডা একদিক থেকে সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রম। তা হলো সনু নিগামের কন্ঠে গাওয়া ‘মে কী কারা’ গানে।
ফরেস্ট গাম্পে গান নেই। যদি থাকতো তবে সনুর গাওয়া ‘মে কি কারা’ জেনির পথে চেয়ে থাকা আদুরে ফরেস্টের নিষ্পলক চাহনির সাথে এক হয়ে হয়তো রূপালী পর্দায় জাদু তৈরি করতো।
ট্রেইলার দেখে এরকম আজগুবি অনেক মিল-অমিল পাবেন লাল সিং চাড্ডায়। তারপরেও নিন্দুকেরা বলবে সিনেমাটি পেপসির বোতলে কোকের ছিপি দেয়ার মতো নকল।
নকল কিনা জানি না, তবে বলতে চাই ‘জীবন কাচ্চির মতো আনন্দের। কখন এলাচে কামড় লাগে কেউ জানে না!’ আর হ্যাঁ, কথাটি কিন্তু মা বলেননি!
মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
imran.tweets@gmail.com
