জগতের পাঠ গুটিয়ে বিদায় নিলেন নাইটিঙ্গেল অফ ইন্ডিয়া, লতা মঙ্গেশকর, যার গান বেজে আজও শুরু হয় অনেক সংগীত প্রেমীর সকাল।
কাল যখন সুরের দেবী সরস্বতীর বন্দনা চলছিল , তখন মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে জীবনের শেষ ক্ষণ গুনছিলেন সংগীত অঙ্গনের এই ধ্রুবতারা। ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা ১২ মিনিটে অসীম আকাশে পাড়ি জমিয়েছেন সুরের পাখি।
ওগো আর কিছু তো নয়,বিদায় নেবার আগে তাই/তোমারি নয়নে পাওয়া/ তোমারি সুরে গাওয়া/ এ গানখানি রেখে যাই।
রেখে গিয়েছেন বিভিন্ন ভাষায় হাজার হাজার গান।
'আজিব ছি দাস্তা হ্যায়,' 'এক পেয়ার কা নাগমা,' 'আজা পিয়া,' 'ইয়ে রাত ভিগি ভিগি,' 'লাগ যা গালে,' 'পারদেশিয়া,' 'সালামে ইশক মেরি জান,’ 'মেরে খোয়াবো মে জো আয়ে' এমনই সব গান হৃদয় কেড়েছে শ্রোতাদের ।
তার পূর্বনাম ছিল হেমা। শৈশবে 'ভাববন্ধন' নাটকের লতিকা চরিত্রকে জীবন্ত করে ফেলেছিলেন অসাধারণ নৈপুণ্যে। বাবা তখনই নাম বদলে দিলেন লতা, লতা মঙ্গেশকর।
ছিল জন্ম অর্জিত সঙ্গীত প্রতিভা , মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পিতা দীননাথ মঙ্গেশকরের সঙ্গীত নাট্যে একটি কঠিন রাগে গলা মিলিয়ে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। মারাঠা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই কন্ঠ দিতে শুরু করেন !
শুধু সঙ্গীত নয় , ৮টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছিলেন অভিনয়শিল্পী হয়ে। কিন্তু পরবর্তীতে গানকেই ধ্যান জ্ঞান করে নেন । প্রস্তাব পেয়েও রাজ কাপুরের সত্যম শিবম সুন্দরম ছবিতে অভিনয়ের বদলে শুধু গলা দিয়ে সুপারহিট করে দিয়েছিলেন।
বলিউডের সঙ্গীত জগৎ যখন ভাসছিল নূর জাহান এবং শমশেদ বেগমের সুরে , তখন ইন্দোরের ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা লতা এলেন বোম্বের প্রযোজক শশধর মুখার্জির কাছে । মুখার্জি বাবু জানালেন, মেয়ের গলা বড্ড সরু যে, ও চলবে না।
লতার সাথে আসা গুলাম হায়দার উত্তর করলেন, একদিন এই কণ্ঠে গান গাওয়াবার জন্যে পিছনে লেগে থাকবে সব।
বাবার মৃত্যু পরে সংসারের হাল ধরেছিলেন লতা। বোন মিনা ,আশা , উষা আর ভাই হৃদয়নাথের জন্যে উৎসর্গ করেছেন গোটা ক্যারিয়ার। হায়দারই তাকে গান রেকর্ডের সুযোগ দিয়েছিলেন ১৯৪৮ সালে। প্রচুর আলোচনা-সমালোচনার পর প্রথম হিট গান 'আয়েগা আনেওয়ালা' বের হয় পরের বছর।
গুলাম হায়দারের সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল। তার জাদুকরী কন্ঠ পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্ব দরবারে। প্রথম ভারতীয় হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেছিলেন লন্ডনের রয়েল আলবার্ট হলে, ফ্রান্সের সরকার তাকে দিয়েছিল 'অফিসার দে লা লিজিয় দ্য' সূচক সম্মান।
লতা মঙ্গেশকর ৩৬টি ভাষায় গান করেছেন। বিশ্ব সংগীতের মঞ্চে ২৭ হাজার গান রেকর্ড করেছেন তিনি। কিন্তু মন ভোলানো সুরের জাদুকর কখনোই নিজের গাওয়া গান শুনতেন না। তিনি বলতেন, "আমার গানে আমি হাজারো ত্রুটি খুঁজে পাই !"
লতার কণ্ঠের সুর মানুষের আবেগ দ্রুত প্রভাবিত করে ফেলে। ১৯৬৩’র ভারত চীনের সীমান্ত যুদ্ধে নিহতের স্মরণে তার গান 'ইয়ে মেরে ওয়াতন কে লোগো' চোখ ভাসিয়েছিল লক্ষ শ্রোতার। এমনকি কেঁদেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। সর্বশেষ গান 'সুগান্ধ মুঝে ইস্ মিট্টি কী' রেকর্ড করা হয়েছিল ২০১৯ সালের মার্চে , সেটিও ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বাংলা ভাষায় কাজ করেছেন ১৮৫টি গানে। প্রথম বাংলা গান আকাশ প্রদীপ জ্বলে। তার কিছু গান একই সুরে বাংলা হতে হিন্দি অনুবাদ হয়ে চলত। বাংলায় কাজের সাথে আপন করে নিয়েছেন বাংলার মানুষকে।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর কিশোর কুমারকে রাঁখি পরিয়ে দিয়েছিলেন ভাই বলে। সলিল চৌধুরীর সাথেও ছিল বেশ ভালো সম্পর্ক। 'রাতো কে ছায়ে' গানের রেকর্ডিং রিহার্সেল এ হঠাৎ থেমে গিয়েছিলেন। মাথা নিচু করে বসে। একটু পরে দেখা গেল তার চোখে জল। তখন সলিল বাবু নিজে এসে অন্তরা ধরলেন লতার সাথে।
ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ছিল প্রচুর। শোনা যায় নেপথ্যের কারণ ক্রিকেটার রাজপুত্র রাজসিং দুঙ্গারপুরের প্রণয়।
রাজপরিবার মেনে নিতে পারছিল না একটি সাধারণ ঘরের মেয়েকে পুত্র বধূ করতে। কথার বরখেলাপি করেননি কেউ। চিরকাল অবিবাহিত থেকে গিয়েছিলেন দুজনেই। প্রেম এভাবে একবারই লতার জীবনে এসেছিল নীরবে।
নিজেকে লুকিয়ে কাজ করতেন, আত্ম প্রচারণা মোটেই ভালোবাসতেন না। 'আনন্দঘন' ছদ্মনামে কাজ করেছেন মারাঠা চলচ্চিত্রে, যা ছিল সবার অজানা। স্টেজে নামটি ডাকবার পরেই যখন সব নীরব হয়ে পড়ত, তখন সবার প্রিয় লতা দিদি সেই পুরস্কার নিতেন।
ভারতরত্ন হতে শুরু করে অসংখ্য পুরস্কার তার হাতে উঠেছে। সাতটি দশক ধরে মুগ্ধ করেছেন বহু গানপ্রেমীকে। পোস্ট-কোভিড নিউমোনিয়া প্রাণ হরণ করলেও তিনি যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন লক্ষ লক্ষ অনুরাগীর প্রাণে।
সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করছেন।
susmi9897@gmail.com
