Loading...

লকডাউনে শাপেবর

| Updated: June 13, 2021 14:26:43


লকডাউনে শাপেবর

"প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থাই ভালো"- বিশ্ব জুড়ে মরণঘাতী কোভিড ১৯ এর যখন কোনো প্রতিকার ব্যবস্থাই নেই, তখন এ রোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে লকডাউনকে অস্বীকার করা যায় না। বিশেষত আমাদের যেখানে তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে অপ্রতুল ভ্যাকসিন এবং তুলনামূলক দূর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে মারাত্মক ভাইরাসটির বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে হচ্ছে। বাইরে গিয়ে কাজ করা সম্ভব না হওয়ায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য লকডাউন নেমে এসেছে অভিশাপের মতো।

করোনা অতিমারীর সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যেহেতু প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করা; তাই মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সর্বোপরি সবার মারাত্মক দুর্ভোগের পরেও লকডাউনের কোনো বিকল্প উঠে আসছে না। ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ রাখতে হবে, এমন দিন হয়তো কারো কাম্য ছিল না। তবে হতাশাজনক হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ লাভ করতে শুরু করেছে লকডাউনের ইতিবাচক দিকটি। এসময়ে বেশিরভাগ মানুষের জীবনেই এসেছে আমূল পরিবর্তন।

পরিবারের সাথে শক্তিশালী বন্ধন, স্বাস্থ্যের গুরুত্ব, প্রকৃতির দেয়া স্বাভাবিক আশ্রয়ের তাৎপর্য, পরিবেশ দূষণের বিপরীতে প্রকৃতি কতটা শক্তিশালী হতে পারে- ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নিত্যনতুন সব উপলব্ধি। 'নিউ নরমাল'- এ ভালো থাকার তাগিদে নিজস্ব প্রয়াসে লকডাউনও হয়ে উঠতে পারে ভালো কিছু। আর আজকের এ লেখায় সে দিকটি নিয়েই হবে আলোচনা।

বই পড়া

উৎসাহী পাঠকদের জন্য লকডাউনের এই অবসর হতে পারে সেরা সময়। যাদের বিশ্বাস, "বই মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু"; কিন্তু প্রাত্যহিক কাজের চাপে সে বন্ধুর কথা মনে করার উপায় নেই, তাদের জন্য এই অবসরের চেয়ে ভাল সময় আর কী-ইবা হতে পারে? জানালার পাশে, এক কাপ কফি হাতে (হয়তো হালের জনপ্রিয় ডালগোনা কফি!) বসে পড়তে পারেন প্রিয় বইটি নিয়ে। নির্মল বাতাস বা বৈশাখের বৃষ্টি সাথে একটি চমৎকার বই- এসবের যুগলবন্দি মনকে করবে প্রফুল্ল ও বিকশিত।

লোকে কেমন কী পাঠক ভাবলো না ভাবলো দেখে পড়তে পারেন এমন সব বই, যা নিজের হৃদয় ভরিয়ে তুলবে, নিজের আগ্রহ পূরণ হবে। যাতে কিছুটা হলেও ভালো থাকবেন এই কঠিন সময়ে। পুরনো কবিতা, রোমান্টিক উপন্যাস, এমনকি চাইলে আপনার পাঠ্যক্রমের বইও কেন নয়!

পড়তে পারেন যা নিজেকে আনন্দিত করে, পড়তে পারেন যা নিজেকে সেরা জ্ঞানের সাথে সমৃদ্ধ করে।

নতুন কিছু শেখা

এই ব্যস্ত জীবনে পড়া বা কাজের চাপে নিজের জন্য সময় কোথায়! কিন্তু লকডাউনের অবসরে কোনো অজুহাত ছাড়াই কিছু সময় নিজেকে উৎসর্গ করতেই পারেন। হতে পারে সেটা আঁকাআঁকি, যোগব্যায়াম, নতুন কোনো ভাষা শেখা, গিটার শেখা, বেকিং, এমনকি নিজের ছবির অ্যালবামটি সাজানো। দেখে ফেলতে পারেন দেশ-বিদেশের অসাধারণ সব সিনেমা বা ক্ষেত্রবিশেষে নিজের পছন্দের 'সাধারণ' কিছুই। সময় কাটতে পারে গাছের রোপণ বা পরিচর্যায়।

ঘরে, ছাদে, উঠোনে বা বাগানে জায়গা থাকলে বিভিন্ন খেলাধুলায় সময় কাটিয়ে নিজের শৈশব জাগিয়ে তোলা যেতে পারে। যে কাজগুলো মন চেয়েছে সবসময় করতে, কিন্তু ব্যস্ততার জন্য তা আর করা হয়ে ওঠেনি- সেসকল কাজের জন্য রয়েছে এখন অখণ্ড অবসর।

পরিবারের সাথে সময় কাটানো

অনেকেই আছেন, যাদের পড়ালেখা বা চাকরিজনিত নানা কারণে পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয় সারা বছর। বাবা-মা বুড়ো হতে থাকেন, কিন্তু তাদের পাশে থাকার সময় পায় না না সন্তানটি। আবার সন্তান দ্রুত বড় হয়ে যেতে থাকে, কিন্তু বাবা-মা সময় দিতে পারেন না তাকে। এই গৃহবন্দী সময়টি হতে পরিবারের সাথে আমাদের বন্ধন জোরদার করার।

পরিবারের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকতে পারে, প্রজন্ম-ব্যবধান নিয়ে সমস্যাও থাকতে পারে, থাকতে পারে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। তবে একে অপরের মতামতের প্রতি সম্মানবোধ রেখে আক্রমণাত্মক আচরণ থেকে দূরে থেকে যথেষ্ট বোঝাপড়ায় সম্পর্কগুলো সাবলীল রাখা যায়। কিছু সময়ের জন্য ফোনকে দূরে রেখে একসাথে বসে গল্প করা, পরিবারের সবাই একত্রে খাবার টেবিলে বসা, একসাথে বিশেষ কিছু রান্না করা, কোনো সিনেমা দেখা, কোনো খেলার আয়োজন করা বা হতে পারে সবাই একসাথে বসে প্রিয় সব গান গাওয়া- বিভিন্নভাবেই পরিবারের সাথে চমৎকার সব সময় কাটানো যেতে পারে এই লকডাউনে।

অনলাইন শিক্ষা

এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে অনলাইন কোর্স বা ওয়েবিনারের সুযোগ বেশ জরুরি একটি বিষয়। লকডাউনে বাইরের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনলাইনে তাদের বেশকিছু কোর্স করার সুযোগ এসে গেছে হাতের মুঠোয়। এমনকি স্বল্পব্যয়ে এমআইটি, হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডের মতো নামিদামি সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেকোনো কোর্স করে ফেলতে পারেন অনায়াসে। নতুন কিছু শেখা বা দক্ষতা অর্জনের প্রমাণস্বরূপ সাথে থাকছে সার্টিফিকেট। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয় সহজেই শেখা যাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে।

আপনার সিভির চেহারা আরো ভালো করতে ভূমিকা রাখতে পারে অলস সময় কাজে লাগিয়ে করে ফেলা এই অনলাইন কোর্সগুলোই। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এবং কিছুটা ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় শিক্ষার এ নতুন দিগন্ত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক শিক্ষার্থীই, তৈরি হচ্ছে প্রবল বৈষম্য।

মেডিটেশন বা ধ্যান

নিজেকে না জানলে, না বুঝতে পারলে জীবন হয়তো কখনো সম্পূর্ণ হয় না। নিজেকে বোঝার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে মেডিটেশন বা ধ্যান। এর মাধ্যমে আমরা আত্মোপলব্ধির পথ অনুসন্ধান করতে পারি। আত্ম-অনুসন্ধানের এ যাত্রার পাশাপাশি চাপ কমাতে, শক্তি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে মেডিটেশন।

ব্যস্ত এ জীবনের চাপ আর তার উপর নিশ্বাসের বাতাসে ঘুরছে মরণঘাতী ভাইরাস। সবমিলিয়ে আমাদের অনেকেরই মানসিক স্থিতি যেন গিয়ে আছে শূন্যের কোঠায়। এসময় মেডিটেশন দিতে পারে কিছুটা হলেও মানসিক স্বস্তি এবং শান্তি। কাজ করতে পারে আত্মার প্রশান্তি, বিকাশ এবং শক্তি হিসেবে।

ভয়াবহ অতিমারীর জন্যে জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে যাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের পরে হতাশা, একাকিত্ব এমনকি হতে পারে মানসিক ব্যাধিও। তাই ভাইরাস থেকে সতর্কতা অবলম্বন করার পাশাপাশি দরকার মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া ও একে অপরের পাশে দাড়ানো। নিউ নরমালে মানিয়ে নিয়ে নিজের ও আশেপাশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখার বিকল্প নেই। এই অবসরেই পছন্দসই ও চমৎকারভাবে সময়কে কাজে লাগিয়ে লকডাউনই হয়ে উঠতে পারে শাপেবর।

ফারিয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

fariasneho@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic