বিভিন্ন মজার মজার গেমস খেলতে এবং গেমের ভুবনে হারাতে ভালবাসে না এমন কিশোর-কিশোরী আজকাল পাওয়া কঠিন. কিন্তু কেমন হতো যদি কেউ নিজের মনের মতো করে একটি গেম তৈরি করে নিতে পারতো?
শুনতে অসম্ভব কিছু মনে হলেও এই গেম তৈরি করা ও অন্যকে খেলার সুযোগ করে দেওয়ার কাজটি অনেক সহজ করে দিয়েছে যে প্ল্যাটফর্মটি সেটি হলো রোবলক্স।
গেম নির্মাণ ছাড়াও রোবলক্সে অন্য নির্মাতাদের তৈরি মজার মজার সব গেম খেলা যায়৷ একইসাথে অনেক বন্ধুরা মিলে একটি গেম খেলা এবং গেমের মধ্যেই একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করার মতো অনেক ফিচার রয়েছে এই প্ল্যাটফর্মটিতে।
রোবলক্সের প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও ডেভিড বাসজুকি ওয়েবসাইটটিতে জানান, প্রতি মাসে এই ওয়েবসাইটে ৪.৭ মিলিয়ন মানুষ আসে যারা অন্য ব্যবহারকারীদের তৈরি করা ভিডিও গেমগুলো খেলে থাকেন।
এই প্ল্যাটফর্মটি বিনামূল্যে ডাউনলোড ও ব্যবহার করা যায়। তবে গেমের মধ্যেই বিভিন্ন সামগ্রী টাকার বিনিময়ে কেনার উপায় রয়েছে।
রোবলক্সে যেকোন কিছু কিনতে হয় 'রোবাক্স' নামক মুদ্রার মাধ্যমে। এই রোবাক্স আবার কিনতে হয় সত্যিকার মুদ্রার বিনিময়ে। আর কোনো একটি গেম হতে কিছু কেনা হলে বা গেমটি নিয়মিত খেলা হলে নির্মাতারা এর থেকে অর্থ আয় করে থাকেন।
বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় গেম ‘জেলব্রেক’। ২০১৮ সালে এই প্ল্যাটফর্ম হতে আয় করেছে প্রায় ৩০ লক্ষ ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৬ কোটি টাকা। তবে রোবলক্স থেকে এমন অর্থ উপার্জনের ইতিহাস আরো পুরনো।
রবার্ট নে নামে এক ১৪ বছর বয়সী বালক ২০১১ সালে ‘বাবল বল’ নামে একটা গেম তৈরি করেছিলো যেটি দুই সপ্তাহে দুই মিলিয়ন বারের বেশি ডাউনলোড হয়। শুধুমাত্র এই গেম থেকে রবার্ট সেসময় ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলো। এভাবেই রোবলক্স অনেক ফ্রিল্যান্স গেম নির্মাতাদের আয়ের একটি উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোবলক্স প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৬ সালে। তবে করোনা মহামারীর প্রকোপের মাঝে হঠাৎ করেই বিশ্বে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। রোবোলক্সের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে পুরো বিশ্বে এটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৬ কোটির বেশি।
করোনাকালীন লকডাউনে বহুসংখ্যক শিশু-কিশোর ঘরের বাইরে যেতে না পেরে রোবলক্সের মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে গেম খেলে, যোগাযোগ করে সময় পার করতে শুরু করে। রোবোলক্সের একটি জরিপে দেখা যায়, আমেরিকার ৯ থেকে ১২ বছর বয়সীদের মধ্যে চারজনের তিনজনই রোবলক্স ব্যবহার করে।
রোবলক্সের বেশিরভাগ জনপ্রিয় গেমগুলোই বেশ মজার। গেমের গ্রাফিকস খুব বেশি জোড়ালো নয়, তবে গেমগুলো সহজবোধ্য। এছাড়া রোবলক্সে গেমের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি যেমন নিজের 'অ্যাভাটার (অবতার)’ এর সাজসজ্জা, পোশাক-আশাক তৈরিতে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটানোর সুযোগ থাকে।
বর্তমানের রোবোলক্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় গেম জেলব্রেকে খেলোয়াড়রদের একদল আসামী ও অন্যদল পুলিশ হয়ে খেলে। আসামীদের কাজ হলো পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে জেল হতে পালানো, অন্যদিকে পুলিশের কাজ আসামীকে চিহ্নিত করে পাকড়াও করা। গেমটি বেশ মজার এবং অনেক বন্ধুরা একসাথে মিলে এটি খেলা যায়।
আরেকটি জনপ্রিয় গেম হলো ‘এডপ্ট মি’। এখানে বিভিন্ন প্রাণী পোষার জন্য কিনতে হয়। এই প্রাণীদের দেখভাল, খাবার দেওয়া ইত্যাদি সব দায়িত্ব পালন করতে হয়। অন্য খেলোয়াড়দের সাথে নতুন ও আরো ভালো পোষা প্রাণী পাবার আশায় নানা সামগ্রী বিনিময় করা যায়।
তবে রোবলক্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। রোবলক্স বেশ মজার একটি গেমিং প্ল্যাটফর্ম হলেও এটিতে আসক্ত হয়ে যাওয়ার প্রবণতাও ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রকট।
এর অন্যতম কারণ ছোট বয়সীদের যেকোনো গেমে আসক্ত হয়ে পড়ার হার বড়দের তুলনায় অনেক বেশি। আর রোবলক্স এর অধিকাংশ গেমগুলি সাত বছরের বাচ্চাদের থেকে শুরু করে সকলের জন্য উপযুক্ত।
অতিরিক্ত গেম খেলার ফলে ছোট শিশুদের মনোযোগ ও বুদ্ধির বিকাশ ব্যহত হয়। তাই, ছোটদের রোবলক্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে আসক্ত না হয়ে পড়ার বিষয়ে অভিভাবকদের আরো সতর্ক থাকা উচিত।
বর্তমানে অনেক অসাধু নির্মাতা এবং ব্যবহারকারীরা লোভনীয় বিভিন্ন অফারের নামে মানুষের আর্থিক ক্ষতি করছে। যেমন ‘বিনামূল্যে রোবাক্স মুদ্রা পেতে এখানে ক্লিক করুন’ - এ ধরনের অনেক ভুয়া লিংক ছড়িয়ে প্রতারণার ঘটনাও কম ঘটছে না।
তাই ব্যবহারকারীদের উচিত এমন সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক না করা। রোবলক্স ব্যবহারকারী যেহেতু বেশিরভাগই ছোট ছেলেমেয়েরা, তাই অভিভাবকদের উচিত ছোটদেরকেও এসব সন্দেহভাজন অফার ও লিংক সম্পর্কে সতর্ক করা।
এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, রোবলক্স কী শুধুই শিশু-কিশোরদের জন্য?
আসলে রোবলক্সের বেশিরভাগ গেমগুলো সহজবোধ্য এবং ছোট-বড় সকল বয়সীদেরই খেলার উপযুক্ত। তাই বড়রাও এসব গেমে আনন্দ পেতে পারেন। আবার গেম নির্মাতা হিসেবে প্রাপ্তবয়স্করাও এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পারেন।
নাফিসা ইসলাম মেঘা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
nfsmegha@gmail.com
