রূপালী পর্দায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ড: মেন ফ্রম সেভেন্টি টু


সিরাজুল আরিফিন | Published: August 01, 2022 16:22:30 | Updated: August 01, 2022 19:52:04


ছবি: ইউটিউব

১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাস। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে সদ্য স্বাধীনতার তকমা নিয়ে বিশ্বের বুকে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। চারদিকেই তখন অরাজকতার কালো থাবা, মানুষের হাতে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। এমনই এক সময়ে অস্ত্রের বদলে গিটার হাতে তুলে নেয়া পাঁচ তরুণের হাত ধরে গড়ে উঠলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রক ব্যান্ড, আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস। আর যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশের এই ব্যান্ডকে নিয়েই ২০১৭ সালে নির্মিত হয় তথ্যচিত্র মেন ফ্রম সেভেন্টি টু ।

আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসের লোগো ছবি: আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসের ফেসবুক পেজ

ডকুমেন্টারিটির নির্মাতা ইমতিয়াজ আলম বেগ বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতে এক অত্যন্ত পরিচিত মুখ। ব্যক্তিগত জীবনে ইমতিয়াজ ফটোগ্রাফির মানুষ; ছবি তোলেন এবং মানুষকে ছবি তুলতে শেখান। দেশের প্রথিতযশা ব্যান্ডের ছবি, অ্যালবামের কভারের জন্য ছবি, কনসার্টের ছবি ইত্যাদির সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকা এই মানুষটির হাত ধরেই সংরক্ষিত হলো বাংলাদেশের প্রথম ব্যান্ডের ইতিহাস।

আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস গড়ে ওঠে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে। ওমর খালিদ রুমি (লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল), সাজ্জাদ আলী (গিটার এবং ভোকাল), সালাহউদ্দিন খান (বেস গিটার এবং ভোকাল), শাহেদুল হুদা (ড্রামস এবং ভোকাল) ও দস্তগির হক (লিড ভোকাল) - এই ছিল লাইনআপ। মজার বিষয় হলো, তৈরি হওয়ার প্রায় ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও পাল্টে যায়নি ব্যান্ডটির লাইনআপ।

বাম থেকে দস্তগীর, রুমি, সাজ্জাদ, সালাহউদ্দিন, শাহেদুল (ছবি: মেন ফ্রম সেভেন্টি টু)

১৯৭২ এর মার্চে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কনসার্ট হয়েছিল হোটেল পূর্বাণীতে, আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসের হাত ধরেই। শুরুতে বিটলস, বব ডিলান, ডিপ পার্পল, স্যান্টানা প্রভৃতি জনপ্রিয় বিদেশী ব্যান্ডের গান গাইতো আন্ডাগ্রাউন্ড পিস লাভারস। ধীরে ধীরে ইংরেজি এবং বাংলায় বেশ কিছু মৌলিক গান নিয়ে উঠে আসে ব্যান্ডটি, হয়ে ওঠে সেসময়ের অন্যতম পরিচিত মুখ।

ঢাকায় আগত বিদেশীদের কাছেও ব্যান্ডটি ছিল জনপ্রিয় (ছবি: মেন ফ্রম সেভেন্টি টু)

বাংলাদেশ তখন যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠে আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। এরই মধ্যে রক মিউজিক নিয়ে নিয়মিত চর্চা করা আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসের গানগুলো মুগ্ধ করতে থাকে সবাইকে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে নিয়মিতই বাজাচ্ছেন, গান করছেন। ব্যান্ডটির গায়কী এতো বেশি মোহিত করে ফেলে মানুষকে যে সেখানে আগত বিদেশী অতিথিরা প্রায়ই জানতে চাইতেন ব্যান্ডটি কোন দেশের। উই আর জাস্ট অ্যা লোকাল ব্যান্ড, এমন উত্তর শুনে তাই বিদেশীদের চমকে ওঠাটাও স্বাভাবিক।

স্যার ক্লিফ রিচার্ডের সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস (ছবি -আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসের ফেসবুক পেজ)

পুরো সত্তরের দশক জুড়েই দাপটের সাথে গান করে গেছে আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস। তাদের দেখানো পথ ধরে পরবর্তীতে স্পন্দন, উচ্চারণ সহ আরো অনেক ব্যান্ড আসলেও প্রথম ব্যান্ডের তকমাটা আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসেরই। ধীরে বহে মেঘনা সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রের আবহ সঙ্গীতে কাজ করে ব্যান্ডটি। ১৯৭৪ এ যখন দেশজুড়ে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন ব্যান্ডটি এগিয়ে এসেছিল কনসার্ট থেকে সাহায্য তোলার লক্ষ্যে। ১৯৭৫ এর পর রুমি বাদের বাকি সদস্যরা চলে যান দেশের বাইরে।

সত্তরের দশকে একটি ক্লাবে গান করছে আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস (ছবি: উইকিপিডিয়া)

১৯৭২ এ গড়ে ওঠা এই ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবামের দেখা পেতে লেগেছে অনেক বছর। ব্যান্ডের সদস্যরা বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলেও ব্যান্ডটি ভেঙে যায়নি একেবারে। ২০১১ সালে এসে হঠাৎ করেই সবাই আবার একত্র হয়ে গুলশান ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন। তখনই তাদের মাথায় আসে অ্যালবাম বের করার কথা। এরপর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ব্যান্ড তৈরির ৪৫ বছর পর ২০১৭ সালে এসে মুক্তি পায় পিস লাভারস নামের তাদের প্রথম অ্যালবাম।

আবারও ফিরে এসেছে আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারস (ছবি: মেন ফ্রম সেভেন্টি টু)

আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসের প্রথম অ্যালবামে বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে রয়েছে মোট ১৩ টি গান। এতো বছর পরেও একটি পরিবারের মতো বন্ধন ধরে রেখে একসাথে কাজ করে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করেন ব্যান্ডের সদস্যরা। একটি অ্যালবামেই শেষ না করে, আরো নতুন নতুন গানের অ্যালবাম মানুষকে উপহার দিতে চান তারা।

আন্ডারগ্রাউন্ড পিস লাভারসের কনসার্ট (ছবি: মেন ফ্রম সেভেন্টি টু)

মেন ফ্রম সেভেন্টি টু ইতিহাসের এক অন্যতম দলিল হয়ে থাকবে, এমনটা আশা করেন বাংলাদেশের ব্যান্ড ফটোগ্রাফির অন্যতম পথিকৃৎ ইমতিয়াজ আলম বেগ। তার এই ডকুমেন্টারির মাধ্যমে তিনি রেখে যাচ্ছেন সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে নতুন কিছু করতে চাওয়া একদল উদ্যমী তরুণের স্বপ্নের গল্প যা অনুপ্রাণিত করবে তরুণ প্রজন্মকে। ১৯ মিনিটের ডকুমেন্টারিটি পাওয়া যাবে জি-সিরিজের ইউটিউব চ্যানেলে।

সিরাজুল আরিফিন বর্তমানে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

sherajularifin@iut-dhaka.edu

Share if you like