ঝকঝকে প্রিন্টের আধুনিক প্রযুক্তির চাকচিক্যময় সিনেমার যুগে এসেও সাদাকালো সিনেমার যুগের আবেদন কাটিয়ে উঠতে পারা যেন বেশ কষ্টসাধ্য চলচ্চিত্রপ্রমীদের কাছে। রুপালি পর্দার স্বর্ণালি সময়ের নায়ক-নায়িকাদের অভিনয় ও পর্দার উপস্থিতি যে চিরসবুজ হয়ে বেঁচে আছে বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কোটি দর্শকের ভালোবাসায় বেঁচে থাকা সেইসব স্বর্ণালি দিনের নায়িকাদের মুগ্ধকরা অভিনয় ও পর্দায় উপস্থিতির আখ্যানও রূপকথার মতোই শোনায়।
ষাটের দশকে পুরোদমে চলতে শুরু করে বাংলাদেশের সিনেমাজগত, যদিও তখনো পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান ছিল একসাথেই, চলচ্চিত্র মুক্তিও ঘটত প্রায় একসাথেই। দশকের শুরুতে হারানো দিন দিয়ে পর্দায় আসেন নন্দিতা বসাক ঝর্ণা, পরবর্তীতে যিনি শবনম নামে সমগ্র পাকিস্তান, বাংলাদেশেও বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। শবনম অভিনীত প্রচুর সিনেমা সেসময় ব্যবসাসফল হয়েছিল, যা ষাটের দশকের মাঝামাঝি তাঁকে অন্যতম সফল নায়িকা বানিয়ে তোলে। তাঁর অভিনীত আরো কিছু আলোচিত চলচ্চিত্র হলো হারানো সুর, রাজধানীর বুকে, রাজা সন্ন্যাসী, জোয়ার ভাটা।
বাংলা চলচ্চিত্রের মিষ্টি মেয়ে হিসেবে খ্যাত কবরী (মিনা পাল) পর্দায় আসেন মাত্র ১৪ বছর বয়সে, সুভাষ দত্ত পরিচালিত সুতরাং (১৯৬৪) দিয়ে। বাংলা সিনেমার সোনালি সময়ের তুমুল জনপ্রিয় এই নায়িকা আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত সারেং বৌ ছবিতে নবীতুন চরিত্রে অভিনয় করে অর্জন করেছিলেন সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। কবরী অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে তিতাস একটি নদীর নাম, অবাক পৃথিবী, সাত ভাই চম্পা, বাহানা, দুই জীবন, পরিচয়, সুজন সখী প্রভৃতি। চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মতে ও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রজগতের অন্যতম সেরা জুটি ছিল রাজ্জাক-কবরী, যে কথার সাথে দ্বিমত পোষণকারী খুঁজে পাওয়া ভার। ২০২১ সালের ২১ এপ্রিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি চিত্রনায়িকা।
ষাটের দশকে চকোরী (১৯৬৪) সিনেমা দিয়ে একক নায়িকা হিসেবে পর্দায় আসেন শাবানা। অভিনয়জীবনে প্রায় তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মুকুটবিহীন এই সম্রাজ্ঞী। সাবলীল অভিনয়ের জন্য অল্প সময়ে দর্শকের হৃদয়ে স্থান করে নেন তিনি। শাবানার অভিনীত চলচ্চিত্র মুক্তি পেলেই প্রেক্ষাগৃহ ভরে উঠতো দর্শকে, প্রায় ৩০টি বছর ঢাকার চলচ্চিত্রকে তিনি সমৃদ্ধ করে তুলেছেন বৈচিত্র্যময় সব চরিত্রে অভিনয় করে।
রুপালি পর্দায় নায়িকাদের মাঝে শাবানাই সর্বাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর অভিনীত অজস্র চলচ্চিত্রের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- আনাড়ি, জীবনসাথী, আক্রোশ, ভাত দে, মাটির ঘর, লুটেরা, কালিয়া ইত্যাদি। রুপালি জগতকে বিদায় জানান তিনি ১৯৯৭ সালে, কিছুটা আকস্মিকভাবেই। তারপরও হাজারো মানুষের মুখে স্বর্ণালি যুগের সিনেমার নায়িকাদের মুখপাত্র হিসেবে শাবানা নামটাই যেন প্রথম আসে।
ষাটের দশকের শেষের দিকে আসেন ববিতা, ১৯৬৮ সালে। ফরিদা আখতার পপি নামের যশোরের এই নায়িকা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সত্তরের দশক পুরোটাই দাপিয়ে রাখেন তাঁর অভিনয়প্রতিভায়। অভিনয় জীবনের শুরুতেই তিনি পরিচালক জহির রায়হানের জ্বালতে সুরজ কে নীচে চলচ্চিত্রে কাজ করেন, তবে এ ছবি শেষমেষ মুক্তির আলো দেখতে পায়নি। ১৯৬৯ সালে শেষ সংসার চলচ্চিত্র দিয়ে নায়িকা হিসেবে ববিতা নাম দিয়ে যাত্রা শুরু করেন রুপালি পর্দায়। এভাবে যাত্রা শুরু বাংলা চলচ্চিত্রের একজন কিংবদন্তি ববিতার, যিনি একের পর এক হিট সিনেমা দিয়ে দর্শক-হৃদয় জয় করে নেন।
তিনি একমাত্র বাংলাদেশি অভিনেত্রী, যিনি সত্যজিৎ রায়ের সাথে কাজ করার সুযোগ পান। অশনি সংকেত চলচ্চিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে অনঙ্গ বউ চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি প্রথম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেন। ববিতা অভিনীত উল্লেখযোগ্য আরো কিছু চলচ্চিত্র হলো- অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, আলোর মিছিল, গোলাপী এখন ট্রেনে, টাকা আনা পাই, রামের সুমতি ইত্যাদি।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কিছুটা ভিন্ন ঘরানার চরিত্রে আসেন সুচরিতা। অভিনয় জীবনের শুরুটা শিশুশিল্পী হিসেবে হলেও ১৯৭৭ সালে যাদুর বাঁশি চলচ্চিত্র দিয়ে তিনি শক্তভাবে ভিত গাড়েন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে। ব্যবসায়িক ঘরানার ছবিগুলোতে সুচরিতার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তাঁর অভিনীত উল্লখযোগ্য কিছু চলচ্চিত্র হলো- জীবন নৌকা, দোস্ত দুশমন, সোনার হরিণ, হাঙ্গর নদী গ্রেনেড, এখনো অনেক রাত ইত্যাদি।
অঞ্জনা সত্তর দশকেরই আরেকজন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা ছিলেন। সুপারহিটের তালিকায় এই দশকে যে কয়েকজন নায়িকা আছেন, তিনিও তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর অভিনীত দর্শকপ্রিয় কিছু সিনেমার মধ্যে রয়েছে- অশিক্ষিত, সেতু, রূপালি সৈকতে, শাহী কানুন, রজনীগন্ধা, গুনাই বিবি ইত্যাদি। আরো ছিলেন চিত্রনায়িকা অলিভিয়া, ববিতার পর যিনি কলকাতার ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। বহ্নিশিখা নামক এই চলচ্চিত্রে তাঁর সাথে ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। ১৯৭২ সালে ছন্দ হারিয়ে গেল ছবি তাঁকে চলচ্চিত্রজগতে জায়গা করে দেয়। এরপর প্রায় ৫৩টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৯৫ সালে দুশমনি দিয়ে চলচ্চিত্রযাত্রা শেষ করেন এই নন্দিত অভিনেত্রী।
১৯৭৬ সালে রোজিনা জানোয়ার নামক সিনেমার মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গণে পা রাখেন। রোজিনা তাঁর গ্ল্যামারাস ইমেজ ও চলচ্চিত্রে সুঅভিনয়ের জন্য বেশ প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা পান। ১৯৮০ সালে কসাই; ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব-অভিনেত্রী ও ১৯৮৮ সালে জীবনধারা চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। এছাড়াও তৎকালীন ব্যবসায়িক ছবিগুলোতে তিনি অভিনয় করতেন, এদের মাঝে আছে চম্পা চামেলী, যুবরাজ, আনারকলি, দ্বীপকন্যা, রাজনন্দিনী ইত্যাদি। বর্তমানে তিনি সিনেজগত ছেড়ে প্রবাসে আবাস গেড়েছেন।
বাংলাদেশের সিনেজগতের সোনালি যুগে যেসব অভিনেত্রীদের আবির্ভাব হয়, তাঁদের বেশিরভাগই কালের পাতা থেকে হারিয়ে গেছেন। ষাট-সত্তরের দশকে চিত্রজগত ছিল পুরুষ-প্রধান, নারীচরিত্র মানেই পোষাকি, সজ্জা বা সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সমাজের প্রচলিত ট্যাবুগুলো চুরমার করে অভিনয়জগতে নাম লেখান এই নারীরা। শুরু করেন বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে নারীদের অংশগ্রহণের দিন, যা ধীরে ধীরে শুরু করে নতুন দিনের পালাবদল। তাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এই স্বর্ণালি দিনের রুপালি পর্দার নারীমুখগুলোকে ডেকে আসছে মিষ্টি মেয়ে হিসেবে, তাঁদের অভিনয়ের জাদু এখনো সেই স্বর্ণালি দিনগুলো ভাসিয়ে তোলে চোখের তারার ঝলকানিতে।
তাহসীন নাওয়ার বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
amipurbo@gmail.com