রাশিয়াকে সমালোচনার অধিকার দ্বিমুখী ইসরায়েলের নেই


জিডিওন লেভি | Published: March 01, 2022 21:23:49 | Updated: March 02, 2022 09:02:02


চলমান রুশ আক্রমণে  বিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের একটি ভবন

রাশিয়ার সমালোচনায় কাছা দিয়ে নামার সামান্যতম অধিকারও নেই ইসরায়েলের। আজ রাশিয়া যা করছে একই কাজ বছরের পর বছর ধরে করছে খোদ ইসরায়েল। ইসরায়েল ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে দখলদারিত্ব বজায় রেখেছে। সে কী করে মাত্র পাঁচ দিনের দখলদারিত্বের নিন্দায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে!

আগ্রাসনের পক্ষে রাশিয়া প্রচারণা চালাচ্ছে, মিথ্যা কাহিনি শোনাচ্ছে। দেখে শুনে মনে হচ্ছে, গাজা বা লেবাননে আগ্রাসন চালানোর সময় ইসরায়েল যে সব যুক্তি ব্যবহার করে, যে নিয়মনীতির কথা বলে ঠিক সে সব কথাই বলছে রাশিয়া। অর্থাৎ একই খাতা দেখে টোকা হয়েছে এ সব। সোজা বাংলায় নকল করা হয়েছে। আগ্রাসনের পক্ষে যুক্তিমালা সাজাতে যেয়ে তেল আবিব বারবার হুমকিতে পড়েছে বলে দাবি করে। একই কথাই বলছে মস্কোও। উভয় দখলকৃত ভূখণ্ডের অসহায় মানুষদের জাতীয় অধিকারকে সরাসরি নাকচ করে দিচ্ছে। ইউক্রেনবাসীরা মোটেও মনুষ্য পদবাচ্য নয়। একই ভাবে ফিলিস্তিনিরাও! জর্দান নদীর পশ্চিম তীরে বংশানুক্রমিক অধিকার রয়েছে ইসরায়েলের। ইউক্রেনের ওপরও একই অধিকার রয়েছে রাশিয়ারও। উভয়ের চোখে এ ক্ষেত্রে অন্যপক্ষের সার্বভৌমত্বের দাবিতে কোনো সারবস্তু নেই, গোটাটাই গাঁজাখুরি বা মিথ্যা। উভয়ই প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে আর গণ্য করছে না। ইউক্রেনবাসীদের বলা হচ্ছে নাৎসি। ফিলিস্তিনিদের বলা হচ্ছে সন্ত্রাসী। অথচ ইসরায়েল ও রাশিয়া -উভয়ের সব কথাই প্রচারণা এবং পুরোটাই মিথ্যা।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুতর লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়্যার ল্যাপিড। এর মধ্য দিয়ে আগ্রাসী এ যুদ্ধের মধ্যেও নির্ভেজাল কৌতুক প্রসব করেন তিনি। হতে পারে তাঁর লাজ-শরমের বালাই নেই। অথবা যতো লাজ দেখুন্তিরই হবে বলে বাংলা ভাষায় যে প্রবাদ আছে তা হয়ত মুখস্থ আছে ল্যাপিডের। কিংবা আত্ম-সচেতনতার অভাব। মুকুরে নিজদের মুখ না দেখার ফল । এ ভাবেই, আরো তুঙ্গে ঠেলে নেওয়া হলো ভণ্ডামি ও দ্বিমুখী নীতিকে?

যাই হোক না ইসরায়েলের চোখে আন্তর্জাতিক আইন খাদহীন সোনার মতোই বড়ই নমনীয়। ইউক্রেনে রুশ অভিযানকে দেখতে হবে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে। আর ১৮ বছর আগে লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অভিযানকে বলতে হবে আন্তর্জাতিক আইনের সেরা উদাহরণ! গাজায় ঘন ঘন ইসরাইলি হামলার মানে হলো আন্তর্জাতিক আইনকে রক্ষা করা! অন্য জনগোষ্ঠীকে ইসরাইল নিয়ন্ত্রণ করছে এবং গায়ের জোরে দশকের পর দশক ধরে দখলদারিত্ব বজায় রাখছে সে সময়ে আন্তর্জাতিক আইনের কথা বলা যাবে না। যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইসরায়েলের এ ভূমিকার বিরোধিতা করছে। কার্যত গোটা দুনিয়াই এর বিরোধিতা করছে।

ইউক্রেনে রণ-অভিযানের বিরোধিতা করছে বিশ্ব। হতবাক হয়েছে। একইভাবে ইসরাইলের দখলদারিত্বের বিরোধিতাও করছে এবং এতেও কম হতবাক হয়নি দুনিয়া। তারপরও অহরহই আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়া দেখিয়ে চলেছ ইসরাইল। তেলআবিব যে কাজ সর্বদা করছে সে রকম কাজ মস্কো করলে তার প্রতি সমালোচনার বাণ ছোঁড়ার অধিকার নেই ইসরায়েলের। তবে মস্কো ও তেলআবিবের বেলায় বড় একটা তফাৎ রয়েছে। রাশিয়া দৃশ্যত একঘরে অবস্থায় পড়েছে। তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞার কঠোর জোয়াল। আর আগ্রাসনের দায়ে কখনোই কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়েনি ইসরায়েল। বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্তকে কাঁচকলা দেখানোর জন্য বা গ্রাহ্য না করার দায়ে কোনো মূল্যেই দিতে হয়নি তেলআবিবকে। কোনো শাস্তির কোপানলে পড়েনি ইসরাইল কখনোই।

২০২১ সালের মে মাসে ইসরায়েলী হামলায় বিধ্বস্ত গাজা

ইসরাইলের ডানপন্থিরা আদা পানি খেয়েই পশ্চিমের সমালোচনা করছে। কিন্তু ইউক্রেনকে কোনো সহায়তা করার ঘোষণা দিচ্ছে না। ফিল্ড হাসপাতাল পাঠানো ছাড়া যুদ্ধরত কোনো দেশকে কী ইসরাইল কখনো কোনো সহায়তা দিয়েছে? কাজের কাজ যাই হোক না কেনো, এ সব হাসপাতাল বরং তেলআবিবের প্রচার মাধ্যমের প্রচারণা অভিযানের চমৎকার খোরাক হয়ে ওঠে। ইউক্রেনে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিতে লড়াইয়ে অংশ নিতে সেখানে তরুণদের পাঠানোর বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করবে কী কোনো ইসরায়েলি মা-বাপ বা নাগরিক? তা হলে একই আবদার কেনো আমেরিকা, ফ্রান্স বা জার্মানির মা-বাপের কাছে জানানো হবে?

দখলদারিত্বে প্রতি ইসরাইলের কথিত কঠোর বিরোধিতার আগাগোড়াই মোড়া আছে দ্বিমুখী অন্তঃসার শূন্য নীতিকথার রাংতায়। দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের মানুষের রুখে দাঁড়ানো কেবল বৈধতার স্বর্ণে মোড়া নয় বরং বীরত্বপূর্ণ। তরুণ ইউক্রেনীয় রুশ ট্যাঙ্ক লক্ষ্য করে মলোটভ ককটেল ছুঁড়লে কেউ সে কাজের সমালোচনা করার কথা কল্পনাও করতে পারে না। ইসরায়েলও সে ঘটনায় উল্লাসে ফেটে পড়বে। বলবে, এ সব সাহসী তরুণদের জন্য এটাই হবে প্রাপ্য। সে তরুণকে মুক্তকণ্ঠে, উচ্চস্বরে বলা হবে বীর এবং দেশপ্রেমিক। কিন্তু একই কাজ যে তরুণ ফিলিস্তিনি করবে তার সম্পর্কে কি বলা হবে? জবাব আসবে, তাকে অবশ্যই হত্যা করা উচিত, নিরীহ ইহুদিদের খুনের জন্যেই জন্মেছে সে। সে মানুষ নয় পশু, নিষ্ঠুর এবং ঘৃণ্য! কেন ইসরায়েলের হৃদয় ইউক্রেনের শরণার্থী এবং সেখানে ভীত আতঙ্কিত, ত্রাসের শিকার মানুষদের জন্য দরদে উথলে ওঠে? অন্যদিকে গাজার দুর্ভোগের ভারে নতজানু, ভয় ও আতঙ্কে শীর্ণ এবং নিজ ভূমি থেকে খেদিয়ে দেওয়া ভগ্নপ্রায় ফিলিস্তিনিদের জন্য উদ্বেল হয়ে ওঠে না?

রাশিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ইউক্রেন দখল করে রাখতে চায় না এবং কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করবে। এ সব কথা ভয়ঙ্কর ভাবে পরিচিত হিসেবে শোনাচ্ছে। ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণ করতে চাইছে এবং দেশটিতে শাসন ক্ষমতা বদলে দেওয়ার দাবি তুলছে। গাজার কাছেই একই দাবি করছে ইসরাইল। সেখানে শত শত নিরীহ, অসহায় শিশুকে, কথিত, অনিচ্ছাকৃত হত্যার আরেক দফা অভিযান শুরুর করার আগে ইসরায়েল কি ঠিক একই দাবি জানায় না? এমনকি রুশ গণমাধ্যমে যুদ্ধের প্রতি সমর্থনও আমাদের কিছু একটা মনে করিয়ে দেয় না। আর তা হলো এত কিছুর পরও বিশ্বের সাথে সুর মিলিয়ে কি রাশিয়ার নিন্দা করা উচিত ইসরায়েলের? কিন্তু কিভাবে?

[লেখক ইসরায়েলী সাংবাদিক। হারেৎস থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]

Share if you like